রসালাপ
মানুষের মগজ ডাউনলোড করা সম্ভব নয় —হানিফ সংকেত
উপস্থাপক হানিফ সংকেত, যিনি একজন নির্মাতা, একজন সমাজ সংস্কারক ও লেখক। তাঁর অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকে বিভিন্ন শিক্ষামূলক ও তথ্যনির্ভর বিষয় পরিবেশন করছে। কথার এই জাদুকর দেশের সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য সম্প্রতি পেয়েছেন স্বাধীনতা পদক। তাঁর এ পুরস্কারকে সময়োপযোগী ও প্রাপ্য স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন সবাই। এবার তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে রস+আলোতে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবির বকুল।
কেউ কেউ অবিরাম চুপিচুপি, চেহারাটা পাল্টে সাজে বহুরূপী। এই বহুরূপী কারা?
বলাই তো আছে, যারা চেহারাটা পাল্টে সাজে। সূচনা সংগীতটি তৈরি হয়েছিল আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে, তখন বহুরূপী মানুষগুলো চুপিচুপি চেহারাটা পাল্টাত। কিন্তু এখন প্রকাশ্যেই পাল্টায়। তাই তো টাইটেলের ভাষায় বলতে হয়, বোঝা তো যায় না তাদের মতিগতি!
আপনাকে দেখলে দর্শকদের প্রথম সংলাপ কী থাকে?
বলেন, ‘আপনাকে সেই ছোটবেলা থেকে দেখে দেখে বড় হয়েছি। আপনি একই রকম আছেন।’ তবে এই দর্শকদের কোনো বয়সের সীমা নেই। ভালোবাসা ও আবেগের কারণে আমার বয়স, দর্শকের বয়স এবং অনুষ্ঠানের বয়সটা অনেক সময় ঠিক থাকে না।
চমক, ভাইরাল—এই শব্দগুলো এখন অনেক কনটেন্টের আগে ব্যবহৃত হয়। আপনার অবস্থান কী?
এই শব্দগুলো যেন আমাকে স্পর্শ করতে না পারে, সেদিকে সতর্ক থাকি। আমি মান ও বিষয়বৈচিত্র্যে বিশ্বাসী।
প্রতিটি অনুষ্ঠানেই আপনাকে নতুন স্যুট পরতে দেখা যায়। এগুলো কি কেউ স্পনসর করে?
নিজের পোশাক অন্যের টাকায় পরব কেন? আপনি কি কখনো ‘ইত্যাদি’তে দেখেছেন পোশাক স্পনসর করেছেন অমুক প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি? নিশ্চয়ই দেখেননি!
এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সবাই সোচ্চার, আপনি চুপচাপ। কোনো স্ট্যাটাস দিতে দেখি না!
আমি ‘কথা কম, কাজ বেশি’ বাক্যটিতে বিশ্বাস করি। তাই সারা বছর অনুষ্ঠানে সব মিলিয়ে ঘণ্টা দুয়েক কথা বলি। তবে মাঝেমধ্যে দু–একটি পোস্ট দিই। যেমন সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন আমার মৃত্যুসংবাদ ছড়াল, তখন স্ট্যাটাস দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছে, আমি মরি নাই!
আজকাল তেলামি বা চাটুকারিতা ভাগ্যোন্নয়নের বড় যোগ্যতা, একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য কোনো কোর্স শুরু করা যায় না?
প্রয়োজন হবে না। কারণ, অনেকেই তেলশাস্ত্রে এখন পিএইচডি লাভ করেছেন। তাঁরা নিজেরাই একেকটি তেলপ্রতিষ্ঠান!
নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতির রূপকথার গল্প শোনায়। নির্বাচনের পরে সেগুলো কোথায় হারিয়ে যায়?
হারায় না। রিসাইকেল বিনে রেখে দেওয়া হয়। পাঁচ বছর পর আবার যখন নির্বাচন আসে, তখন বিন থেকে ওগুলো আবার সামনে হাজির করা হয়।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে এত হাজার হাজার দর্শককে কীভাবে সামলান?
ভালোবাসা দিয়ে!
ভয় করে না?
করে, যখন দেখি গাছের ডালে, টিনের চালে, বাড়ির ছাদে মানুষ। দূর থেকে মনে হয় দর্শকেরাই যেন গাছের পাতা! ভয় হয় যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে। কারণ, তেঁতুলিয়ায় টিনের চাল ভেঙে শতাধিক দর্শক পড়ে গিয়েছিলেন।
এত বছর ধরে দেখছি, সময় বদলালেও আপনার হেয়ার স্টাইল কখনো বদলায়নি, কেন?
চুলের স্টাইলের সঙ্গে মস্তিষ্কের কোনো সম্পর্ক নেই। হেয়ার স্টাইল বদলালে যদি বুদ্ধি বদলাত, তবে দেশের সব সেলুন একেকটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যেত।
ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ায় এআই দিয়ে আপনার ভয়েস নকল করে বিজ্ঞাপন বানানো হচ্ছে। দেখেছেন?
না, তবে শুনেছি। সোশ্যাল মিডিয়ায় কম ঢুকি। অনেক কিছুই নিতে পারি না। প্রতিনিয়ত প্রযুক্তিগত প্রতারণায় প্রতারকদের সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। কারণ, প্রযুক্তির যুক্তিহীন ব্যবহার কারোরই কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে, যতই নকল করা হোক না কেন, মানুষের মগজ ডাউনলোড করা সম্ভব নয়।
২০২৬ সালে এসেও আপনি ‘ইত্যাদি’ নিয়ে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ছুটে বেড়ান, এত এনার্জি পান কোথায়?
মানুষের ভেজালমুক্ত ভালোবাসায়। দেশের মানুষ যখন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ‘ইত্যাদি’র জন্য অপেক্ষা করেন, তাঁদের এই ভালোবাসা দেখে তখন শরীরের সব ক্লান্তি এমনিতেই চলে যায়।
মিডিয়ার কী করা উচিত এবং কী অনুচিত?
উচিত ও অনুচিত সূচিত হয় মানুষের রুচিগত পার্থক্যে। রুচি ঠিক তো সব ঠিক।
[এই সাক্ষাৎকারটি কাল্পনিক নয়!]