পাকস্থলীর প্রতিশোধ

আঁকা: আনিকা নাওয়ার ঈহা

ডান হাতটি পেটের ওপর রাখলাম, তারপর আলতো করে বোলাতে বোলাতে বললাম, ক্ষমা করো লক্ষ্মীটি! প্রতিশোধের কথা বললাম না, সে আমি মনে মনে শপথ নিলাম। ঘটনা হচ্ছে, আমার পাকস্থলী আজ দুটো মোরগ পোলাও খেতে চাইছিল, চিকিৎসার নামে সেদ্ধ সবজি-জাউভাত খেতে খেতে সে ক্লান্ত। অসুস্থ মানুষের কথা যেমন শুনতে হয়, অসুস্থ পাকস্থলীর কথাও শুনতে হয়, তাই পাকস্থলীকে নিয়ে গেলাম বাজারে। কিন্তু পোলাওর চাল, মুরগি, টমেটো ইত্যাদির দাম শুনে মনে হলো ডাক্তারই ঠিক বলেছেন, এইসব মোরগ পোলাও, মাংস, মসলাদার তৈলাক্ত রিচ ফুড এগুলো খাবার না, বিষ, স্রেফ বিষ। আমাদের সরকার জিনিসপত্রের দাম নাগালের বাইরে রেখে প্রতিনিয়ত আমাদের স্বাস্থ্যকর জীবন গড়তে সাহায্য করছেন বটে; কিন্তু তাতে অতৃপ্ত থেকে যাচ্ছে পাকস্থলীগুলো।

আমরা যে কত অসুস্থ একটা জাতি, সেটা ডাক্তারের চেম্বারে এলে বোঝা যায়। ওয়েটিং রুমে বসে আছি, সঙ্গে আরও শখানেক লোক, আমার সিরিয়াল ৮৮, এখন চলছে ১৩। এই ডাক্তার গ্যাস্ট্রোলজির বিরাট ওরফে দেশসেরা ডাক্তার। বহুদিন ধরে আমি পেটের ব্যারামে ভুগছি। নানা পদের ডাক্তার দেখিয়ে শুধু টাকাই গেল, পেট আর ঠিক হলো না। কেউ পরামর্শ দেয়, ভাই ইন্ডিয়া চলে যান, কেউ বলে, থাইল্যান্ড যান, কেউ বলে, পাকিস্তান যান। একজন কেপ ভার্দে যাওয়ার কথাও বলল। মোটামুটি বাংলাদেশে ছাড়া জাতিসংঘরে অন্তর্ভুক্ত সব দেশের ব্যাপারেই সাজেশন এসেছে। আমি গেলাম বন্ধু টিটন চক্রর কাছে।

সে বলল, তুই কুদরত-ই আশেক এলাহীর কাছে যা!

তিনি কে?

স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডাক্তার। প্রধানমন্ত্রীর চাইতে ভালো চিকিৎসা তো এ দেশের কেউ পায় না।

সত্য?

তাহলে ওনার কাছেই যা।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

কিন্তু ঝামেলা দুটো, খরচ বেশি আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে কমের মধ্যে এক বছর লাগবে। টিটন চক্রের লাইনঘাট থাকায় মাত্র এক মাসের মধ্যেই তিন হাজার টাকা ঘুষ দিয়েই পেয়ে গেলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডাক্তার কুদরত-ই আশেক এলাহীর টিকিট, দুঃখিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট। টাকা আরও দুহাজার বাড়িয়ে দিলে এক সপ্তাহের মধ্যে পাওয়া যেত।

রাত আনুমানিক ১২টা নাগাদ আমার ডাক এল, ওজন-প্রেশার-উচ্চতা ইত্যাদি আগেই তারা মেপে রেখেছিল। ভেতরে ঢুকে দেখলাম খোপ খোপ কাউন্টার, দেখে মনে হলো ব্যাংক, ফ্লোরেও অসংখ্য ব্যাংকার ঘুরে বেড়াচ্ছে, পরে জানলাম তাঁরা নাকি সবাই ডাক্তার। আমাকে ছোট্ট একটা কাউন্টার দেখিয়ে দেওয়া হলো, ভেতরের এক্সাইটমেন্ট লুকিয়ে রাখতে পারছি না। ভাবা যায় আমি বসে আছি স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডাক্তার বলে কথার সামনে। তিনি সব মন দিয়ে শুনলেন, শুনে এই রাত বারোটার সময় আমাকে পরামর্শ দিলেন, ডিসিপ্লিনে আসতে হবে বুঝছেন? প্রচুর অনিয়ম করেন। তেল–চর্বি একদম মানা, ঠিক সময় খেতে হবে, ঠিক সময় ঘুমাতে হবে।

জি, বাসায় গিয়েই ঠিক সময় খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব।

তিনি উত্তর করলেন না, আগের প্রেসক্রিপশন, রিপোর্ট পড়ে গজগজ করে প্রেসক্রিপশন লিখে বললেন, টেস্টগুলো করে আনবেন, আপাতত যে মেডিসিন আছে সেটা চলুক!

দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, থ্যাংক ইউ স্যার! বিগ ফ্যান স্যার, বিগ ফ্যান ফর ইউরস!

তিনি হাত বাড়াতে ভুলে গিয়ে বললেন, কেন?

ওমা! ডাক্তার কুদরত-ই আশেক এলাহীর ফ্যান হব না? কে না চেনে তাঁকে! স্বমাপ্রডাবক!

স্বমাপ্রডাবক!

মানে কী?

স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডাক্তার বলে কথা!

আমি ডা. জামসেদ আলী। কুদরত-ই আশেক এলাহী স্যার আমার স্যার। আজ উনি দেখবেন না।

শুনে আমার নড়বড়ে পাকস্থলীটা যেন ভেঙে পড়ল, আমি তো ওনার সিরিয়াল নিয়েছি, আপনি কেন দেখলেন?

দেখুন! প্রথমে আমরাই দেখি। তারপর পেশেন্টের যদি ক্রিটিক্যাল অবস্থা হয় তখন স্যার দেখেন।

মাথায় এবার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই ভেঙে পড়লেন। তিনি যদি শুধু ক্রিটিক্যাল পেশেন্টদেরই দেখেন, তার মানে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিস্থিতিও ক্রিটিক্যাল!

কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম জানি না, শুধু জানি মানি রিসিট দেখার পর দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে এল। চোখ খুলে দেখি চারপাশে অনেক মানুষ। কেউ মাথায় পানি ঢালছে, কেউ পা টেপাটিপি করছে। এর মধ্যে একজন অতি উৎসাহী নাকের কাছে জুতা শুঁকাচ্ছে। খেঁকিয়ে উঠলাম, এই মিয়া জুতা সরান।

সে একটা ক্যাবলা হাসি দিয়ে সবার উদ্দেশে বলল, বলছিলাম না মৃগী রোগী? চামড়ার গন্ধ পাইয়াই চোখ খুইলা ফেলাইছে…

আমি মৃগী রোগী না।

তাইলে কী?

আমি খদেঅ!

এইটা আবার কেমন রোগ?

খরচ দেখে অজ্ঞান।

সুস্থ হয়ে ক্যাশিয়ারের কাছে গিয়ে বললাম, একটু ডিসকাউন্ট দিয়ে দেন। ক্যাশিয়ার জানালেন, আপনাকে প্রায় সব টেস্টে ডিসকাউন্ট দিয়েছি, দেখেন।

দেখলাম তিন হাজার আট শ টাকা ডিসকাউন্ট দিয়েছেন। জিজ্ঞেস করলাম, অজ্ঞান হওয়ার জন্য ডিসকাউন্ট দিয়েছেন?

না! এই ডিসকাউন্ট আমরা সবাইকে দিই।

বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না, দেউলিয়া হয় চিকিৎসা করিয়ে। পকেটের সব অর্থ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দিয়ে বাসায় এসে আধা সেদ্ধ সবজি আর জাউভাত খেয়ে ভাবলাম ঘুমটা অন্তত রাজকীয় দিই। ঠিক তখনই কারেন্টটা গেল আর দরজায় টোকা পড়ল। দারোয়ান এসেছে কারেন্ট বিল নিয়ে। একি! কারেন্ট বিল নাকি বাংলাদেশের আয়তন লেখা! দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম, এত টাকা বিল কেন?

জানি না স্যার। সবাইর বিল বেশি বেশি আসছে।

কেউ কিছু বলল না?

রফিক সাহেব বলার আগে মাথা ঘুরায়ে পড়ে গেছেন, আর শফিক সাহেব খুব গালাগাল করছেন।

কাকে?

খুব সম্মাননীয় এক ব্যক্তিকে, আমি মুখে আনতে পারব না।

আমিও উত্তেজিত হয়ে কিছু বলতে যাব, ছেলে বলল, তুমি উত্তেজিত হয়ো না বাবা।

কেন উত্তেজিত হব না? আমার কি হার্টের প্রবলেম নাকি? আমার প্রবলেম পাকস্থলীতে।

কী যেন বলতে যাব, তখনই আসমান–জমিন ফাঁক করে পেটে ব্যথা উঠল। কাতরাতে কাতরাতে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, কারেন্ট বিল দেওয়ার জন্য কি ব্যাংক লোন দেয়?

আরও পড়ুন

রিপোর্ট এসেছে, আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার অবস্থা বেশ ক্রিটিক্যাল, পাকস্থলীতে এমন একটা দুষ্ট ছিদ্র পাওয়া গেছে, যে ছিদ্র আমাকে নিয়ে যাবে ডাক্তার কুদরত-ই আশেক এলাহীর কাছে। কিন্তু আমার চিন্তা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর জন্য, যেহেতু ক্রিটিক্যাল, তাঁরও কি পেটে ছিদ্র? ডাক্তারকে সুযোগ বুঝে জিজ্ঞেস করতে হবে।

আমার সামনে এবার সত্যি সত্যি স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডাক্তার বসা। তিনি সব দেখে গম্ভীর মুখে জানালেন, জলদি অপারেশন করতে হবে। আপনি একটু ভাবতে থাকেন কবে অপারেশন করাবেন।

বলে তিনি কী কী যেন লিখতে থাকলেন। লেখা শেষে আমাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী সিদ্ধান্ত নিলেন?

সিদ্ধান্ত নিলাম আগে কারেন্ট বিল দেব!

অপারেশনের সঙ্গে কারেন্ট বিলের সম্পর্ক কী?

অপারেশন করালে সুস্থ অবস্থায় গরম আর অন্ধকারে থাকতে হবে, কারেন্ট বিল দিলে অসুস্থ অবস্থায় ফ্যানের নিচে আলোতে থাকতে পারব।

প্লিজ, অপারেশন কবে করাবেন সিদ্ধান্ত নেন।

কারেন্টের কথা বলতে একটা আইডিয়া এল। বলব?

বলুন।

আপনি কি লাইটওয়ালা জুতা বা লাইটওয়ালা পাঞ্জাবি দেখেছেন?

কী বলতে চান সরাসরি বলুন।

পাকস্থলীতে লাইট লাগাতে হবে। আলোকিত পাকস্থলী চাই।

ডাক্তার সাহেব শুধু তাকিয়ে থাকলেন, আমি বললাম, আমার ধারণা, পেটে একটা ৫ ওয়াটের লাইট জ্বালায়ে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। খাবারদাবারগুলো অন্ধকারে পথ ভুল করে পাকস্থলীর বদলে অন্যান্য জায়গায় চলে যাচ্ছে স্যার।

এবার তিনি আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না, প্লিজ, আপনি আসুন।

চেম্বার থেকে নেমেই তীব্র অপরাধবোধে আক্রান্ত হলাম। একবার ভাবলাম চট করে ডাক্তার সাহেবের কাছে গিয়ে সরি বলে আসি। কিন্তু সিরিয়াল ছাড়া তো তার সঙ্গে দেখা করা যায় না। ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু সময়মতো যদি ডাক্তারকে নিজের ভুলের কথা না বলি তাহলে দেশের বড় একটা ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। শুধু দেশমাতৃকার জন্য আবার টিটন চক্রকে ধরে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষে সিরিয়াল নিলাম, যাতে এক সপ্তাহর মধ্যে দেখা করতে পারি।

আমাকে দেখে ডাক্তার কুদরত-ই আশেক এলাহী চমকে গেলেন। তাঁকে আশ্বস্ত করলাম, স্যার, আজকে আবোলতাবোল বলে বিরক্ত করব না।

দেখে মনে হলো তাঁর মন ভালো। বসার ইশারা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?

জি না স্যার

তাহলে?

সরি স্যার।

সরি বলছেন কেন?

সেদিন আপনাকে আমি মস্তবড় একটা ভুল কথা বলে ফেলেছি! তাই বলতে আসলাম, জানি না দেরি করে ফেলেছি কি না।

তিনি হাসতে হাসতে বললেন, দেরি হয়নি, বলে ফেলেন।

অনেক ভেবে দেখলাম, বুঝছেন।

কী?

লাইটের ব্যাপারটা!

ডাক্তার সাহেবের হাসিহাসি মুখটা কালো হয়ে গেল। আমি বলতে থাকলাম, সত্যি বলতে কি ডাক্তার সাহেব, পেটে লাইট লাগানোর আইডিয়াটা আসলে সুইসাইডাল। যে কারেন্ট বিল আসবে, বিল দিতে দিতে অ্যাকাউন্ট ফুটা হয়ে যাবে। আপনি যদি আবার প্রধানমন্ত্রীর পেটে লাইট স্থাপন করে ফেলেন, তিনিও তো ক্রিটিক্যাল… সে জন্য দেরি না করে পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে বলতে এলাম।

ডাক্তার সাহেব কিছু না বলে আমার দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলেন, আমি বললাম, ধন্যবাদ। তিনি অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ধন্যবাদ কেন? কারণ, যুক্তিবিদ্যার ভাষায় আমি টেবিল ছুঁয়েছি, টেবিল মাটি ছুঁয়েছে মানে আমি মাটি ছুঁয়েছি। আপনি তো স্বমাপ্রডাবক!