বিশ্বকাপে গোল হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গোলমাল হয়। তবে তাদের জন্য এত বড় বিশ্বকাপ লাগে না। চায়ের কাপের একটা সামান্য ‘টুং’ শব্দই যথেষ্ট!
কাপে একটা আয়েশি চুমুক দিয়ে লোকমান বলল, ‘…এ জন্যই আমি ব্রাজিলকে দেখতে পারি না।’
গোলগাল চেহারার অনিক চায়ে বিস্কুটটা চুবিয়ে কাউন্টার অ্যাটাক করল, ‘কারওয়ান বাজারের টংদোকানে বসে ব্রাজিলকে কীভাবে দেখতে পারবি? ব্রাজিল কি আকাশের চাঁদ?’
থতমত খেয়ে গেল লাউডস্পিকারখ্যাত লোকমান। কণ্ঠস্বর দুই পর্দা নামিয়ে বলল, ‘এ জন্যই আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাউকেও দেখতে পারি না। একটু সরে বস্ তো…।’
সোহেল মোবাইল থেকে চোখ তুলে বলল, ‘অনিক, তোর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নাকি?’
‘হ্যাঁ, কেন?’
‘বাহ্! ব্রাহ্মণবাড়িয়া বানান কর তো, শুনি।’
আড্ডার মাঠে আমি এবার রেফারির ভূমিকা নিলাম। সোহেলের দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে একটা কাল্পনিক কার্ড বের করলাম, ‘পুরান জোক মারার জন্য সরাসরি লাল কার্ড।’
সোহেল অবাক, ‘পুরান জোক মানে?’
‘মানে এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া বানান করতে গিয়ে অনিক বলবে—বয় র–ফলা আকার… তারপর যথারীতি বানান উচ্চারণ করতে না পেরে বলবে, ইয়ে, আমরা তো ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় থাকি…!’
‘ঠিক ঠিক। খুবই পচা জোক!’ অনিক সমর্থন দিল।
সোহেল এমন একটা চেহারা করল, যেন আমি রেফারি হয়ে নিজেই গোলমাল বাধানোর মতলব করছি।
ছোটবেলায় আমাদের পাড়ায় বন্ধুরা পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করতাম। যার বেশির ভাগই হতো ফুটবল মাঠে। নিজের পায়ে বল ছোঁয়াতে না পারলেও নিশানা থাকত বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়ের পা। এখন নিশানা স্ট্যাটাসের ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট, যা নিয়ে প্রধান দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে ফেসবুকজুড়ে গন্ডগোল হয়, তা নিয়ে দেশব্যাপী শোরগোল হয়, রাতে টক শোতে হট্টগোল হয়। পুরাই গোলকধাঁধা!
অনিক হুট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘জানিস, জীবনে অনেক ফুটবল খেলছি, কিন্তু একটা গোলও দিতে পারি নাই।’
লোকমানের কণ্ঠ হঠাৎ তিন পর্দা উঠে গেল, ‘ক্যান? তুই কি গোলকিপার ছিলি?’
‘তাতে সমস্যা কী?’ সোহেল বলল, ‘গোলকিপাররাও তো পেনাল্টি শটে গোল দিতে পারে।’
‘একবার সুযোগ পেয়েছিলাম।’ অনিক মাথা চুলকায়, ‘কিন্তু পেনাল্টি শট করতে গিয়েও ফাউল করে বসেছিলাম।’
‘পেনাল্টি শটে ফাউল!’ অবাক বিস্ময়ে আমরা প্রায় বাকরুদ্ধ।
অনিক লজ্জিত কণ্ঠে বলল, ‘আমার জুতার সাইজ একটু বড় ছিল। পেনাল্টি শট দেওয়ার পর দেখি, বল গোলবারের বাইরে আর জুতা গোলপোস্টের ভেতরে!’
সিরিয়াস ঝগড়াটা হুট করে ‘হাস্যকর’ হয়ে গেল!
‘অনিক, ছোটবেলায় তোর জীবনের লক্ষ্য, মানে জি–ও–এ–ল, মানে GOAL কী ছিল—গোল না খাওয়া?’ লোকমান ফ্রি–কিক দেওয়ার স্টাইলে বলল।
‘নাহ্! গোলপোস্টের ভেতরে বল ফেলা।’ অনিক মাথা নিচু করে বলল।
সোহেল কী বুঝল জানি না। অনিককে সান্ত্বনা দেওয়ার অভিনয় করে বলল, ‘শোন, ফুটবল মাঠে গোলকিপারের সফলতা নির্ভর করে বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের ব্যর্থতার ওপর।’
‘আবার পুরাতন জোক!’ বলতে গিয়েও আমি চুপ করে গেলাম। থাক, গোলযোগ না বাড়াই। আমি চাই না, আড্ডাটা পেনাল্টি শুটআউট কিংবা ইনজুরি টাইমে গড়াক। আজ যেহেতু আমি আনঅফিশিয়াল রেফারি, চায়ের টেবিল চাপড়ে ঘোষণা দিলাম, ‘জয়–পরাজয় বড় কথা নয়, গোলমালে অংশ নেওয়াটাই বড় কথা। আজ খেলা ড্র।’
সবাই একসঙ্গে দাঁত বের করে হাততালি দিল। সাইডলাইন থেকে চা–দোকানি বলল, ‘চমৎকার সিদ্ধান্ত, রেফারি মামা। তাইলে আজকের বিলটা আপনিই দেন।’
মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে মনে হলো যেন যুদ্ধের মাঠে পরাজিত এক নিঃস্ব সৈনিক। বুঝলাম, রেফারি হওয়া সহজ নয়। সারা মাঠ দৌড়ে নিজের শরীরের শক্তি আর আড্ডা শেষে নিজের আর মানিব্যাগের স্বাস্থ্য—দুটোই সমান হারে কমাতে হয়।
বিল পরিশোধ করতে করতে ভাবলাম, পৃথিবীটা আসলে দেখতে ফুটবলের মতো নয়, কমলালেবুর মতো গোল (স্বাদে টক) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া বানান করার মতোই কঠিন!