কাজি সাহেব চশমা ঠিক করে বললেন,
‘এই বিবাহে কারও কোনো আপত্তি থাকলে এখনই বলুন।’
এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর শেষ সারি থেকে একজন ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন।
হলঘর নিস্তব্ধ। বরের কপালে ঘাম। কনের বাবা হিসাব করতে লাগলেন—ক্যাটারিংয়ের অগ্রিম টাকা ফেরত পাওয়া যাবে কি না।
ভদ্রলোক বললেন,
‘আমার আপত্তি আছে।’
কাজী সাহেব গম্ভীর।
‘কারণ?’
‘কারণ এই হওয়া উচিত নয়।’
মুহূর্তেই ফিসফাস শুরু হলো। বর সাহস করে জিজ্ঞেস করল,
‘আপনি কে?’
ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘আমি... কনের প্রাক্তন নই। বরেরও কোনো আত্মীয় নই। আমি এমনকি পাশের বাসার লোকও নই।’
সবাই আরও বিভ্রান্ত।
‘তাহলে?’
ভদ্রলোক পকেট থেকে একটি কাগজ বের করলেন।
‘আমি পেশাদার আপত্তিকারী।’
হলঘর স্তব্ধ।
‘কী বললেন?’
‘হ্যাঁ। আমাকে ভাড়া করা হয়েছে। যেখানে বিয়ে, সেখানে গিয়ে আপত্তি তুলি। এতে বিয়েটা একটু নাটকীয় হয়।’ পরে সবাই বলে, ‘অনেক বাধা পেরিয়ে ওদের বিয়ে হয়েছে। দাম্পত্য জীবনে গল্প করার মতো একটা ঘটনা তো দরকার!’
বর ফিসফিস করে বলল,
‘কে আপনাকে ভাড়া করেছে?’
ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন,
‘যিনি সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন।’
সবাই একসঙ্গে কনের বাবার দিকে তাকাল।
তিনি চমকে উঠলেন।
‘আমি না! আমি তো শুধু বিল দিচ্ছি!’
সব চোখ এবার বরের দিকে।
বরও মাথা নাড়ল।
‘আমিও না।’
শেষ পর্যন্ত কনে ধীরে ধীরে হাত তুলল।
‘আমি।’
পুরো হলঘর হতবাক।
কনে বলল,
‘ছোটবেলা থেকে সিনেমায় দেখেছি, নায়িকার বিয়েতে একজন না একজন আপত্তি তোলে। আমার বিয়েটা এত সাধারণ হোক, সেটা চাইনি। তাই একজনকে ভাড়া করেছি।’
কাজি সাহেব হেসে বললেন,
‘তাহলে আপত্তি খারিজ?’
ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন।
‘না, আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি।’
তিনি বরের দিকে ফিরে বললেন,
‘বাকি টাকাটা দিন।’
বর বিস্মিত।
‘আমি কেন দেব?’
‘কারণ আমাকেও আপনি আলাদাভাবে ভাড়া করেছিলেন। যদি কনে সত্যিই অন্য কাউকে ভালোবাসে, তাহলে বিয়েটা থামিয়ে দেব—এই শর্তে।’
কনে আর বর দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। দুজনেই একই লোককে, ভিন্ন ভিন্ন কারণে, গোপনে ভাড়া করেছিল।
ভদ্রলোক খুশিমনে দুই দিকের পারিশ্রমিক গুনতে গুনতে বললেন,
‘পঁচিশ বছরের এই পেশায় আজ প্রথম দেখলাম, একটা বিয়ে বাঁচিয়ে আমি দুই পক্ষ থেকেই টাকা পেলাম!’
কাজি সাহেব বিয়ে পড়াতে পড়াতে বিড়বিড় করলেন,
‘বিবাহবন্ধন বুঝি এটাকেই বলে—যেখানে অবিশ্বাস দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত দুজনেরই প্রথম যৌথ বিনিয়োগ একই মানুষে গিয়ে মেলে।’