বার্থোল্ডি সিদ্ধান্ত নেন, এ খালের পাড়ে বাস্তবে রূপ দেবেন তাঁর স্বপ্নকে। মিসর সরকার ও সুয়েজ খালের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে তৈরি করে ফেলেন ভাস্কর্যটির নকশা—প্রজ্বলিত মশাল হাতে সুয়েজ খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। তিনি এ ভাস্কর্যের নাম দেন ‘ইজিপ্ট ক্যারিং দ্য লাইট টু এশিয়া’। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় সুয়েজ খালের নির্মাণকাজ শেষ করতে পার হয়ে যায় ১৫ বছর। এর নির্মাণকাজ শেষ হলে বার্থোল্ডি নকশা নিয়ে যান মিসরে। কিন্তু মিসর সরকার এ ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য ছয় লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করতে রাজি হয়নি।

কয়েক বছর আগে ফরাসি রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী এডওয়ার্ড ডে ল্যাবুলে বার্থোল্ডির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। মিসর থেকে প্রত্যাখ্যাত বার্থোল্ডির এ কথা মনে হতেই তিনি ছুটে যান ল্যাবুলের কাছে। নানা কারণে ল্যাবুলে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভক্ত। তাই বার্থোল্ডির প্রস্তাব তিনি লুফে নেন। দুজনের প্রচেষ্টায় গঠিত হয় ‘ফ্রাঙ্কো-আমেরিকান ইউনিয়ন’, শুরু হয় অর্থ সংগ্রহের কাজ। বার্থোল্ডি তখন আইফেল টাওয়ারের স্থপতি গুস্তাভ আইফেলের সঙ্গে পরামর্শ করে ভাস্কর্যটির গঠন ও আকার ঠিক করেন। ‘ফ্রাঙ্কো-আমেরিকান ইউনিয়ন’ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, মূল ভাস্কর্য তৈরির খরচ সংগ্রহ করা হবে ফ্রান্সের জনগণের কাছ থেকে। আর এর ভিত তৈরির খরচ সংগ্রহ করা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছ থেকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছ থেকে তেমন সাড়া মিলছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রে ভাস্কর্যটির অংশবিশেষ প্রদর্শনীর মাধ্যমে এবং মূল নকশার অনুকরণে ছোট ছোট ভাস্কর্য বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। বলা বাহুল্য, অনাগ্রহী জনগণের কাছ থেকে এভাবে সংগ্রহ করা অর্থের পরিমাণ ছিল একেবারেই নগণ্য। এমন সময় ‘নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড’ পত্রিকার সম্পাদক জোসেফ পুলিৎজার তহবিল সংগ্রহে সচেষ্ট হন। তাঁর পত্রিকায় ছাপা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি নিয়ে প্রতিবেদন। ফলে অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়। ফ্রান্সেও অর্থ সংগ্রহের জন্য নাটক প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এভাবেই রচিত হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি নির্মাণের ইতিহাস।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি নামে পরিচিত হলেও ভাস্কর্যটির মূল নাম ‘লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড’। ভাস্কর্যটির ডান হাতে আছে প্রজ্বলিত মশাল এবং বাঁ হাতে একটি বই, যার মলাটে রোমান অক্ষরে লেখা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার তারিখ—৪ জুলাই ১৭৭৬। স্ট্যাচু অব লিবার্টির মুকুটে আছে সাতটি কাঁটা, যা সূর্য, সাত মহাদেশ বা সাত সমুদ্রকে নির্দেশ করে। এর পায়ের কাছে পড়ে থাকা ভাঙা শিকল যুক্তরাষ্ট্রের দাসপ্রথা রহিতকরণের প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির মূল ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১৫১ ফুট। তবে বেদিসহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট। বিশাল এ ভাস্কর্যের নাকের দৈর্ঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর দুই কানের মধ্যবর্তী দূরত্ব ১০ ফুট। তামার তৈরি মূর্তিটির ওজন দুই লাখ কেজির বেশি। ১৮৮৬ সালের ২৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড ভাস্কর্যটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ১৯২৪ সালে একে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করে।