আমার বাবা কবিতা আবৃত্তি, নাটক, গান—এসব খুব পছন্দ করতেন। তাঁর দুই মেয়েকে (আমার বড় দুই বোন মমতাজ আহমেদ শিখু ও সুফিয়া হায়দার শেফু) মাস্টার রেখে গান শিখিয়েছিলেন। আমার বড় দুই বোন খুব সুন্দর গান গাইত, কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর আর কখনো গান গায়নি। আর নাটক বাবা নিজেই করতেন। তাঁর একটা টেপরেকর্ডার ছিল। সেটাতে প্রায়ই ভাইবোনদের নিয়ে নাটক টেপ করা হতো। যখন দাদাবাড়ি বেড়াতে যেতাম, সেখানেও বাংলা ঘরের বেড়া খুলে স্টেজ বানিয়ে নাটক করা হতো। বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদের মধ্যেও সেই ব্যাপার ছিল। সে–ও প্রায়ই টেপরেকর্ডারে নাটক টেপ করত। পাত্রপাত্রী সে আর মেজ বোন শিখু। সত্যি কথা বলতে কি, নাটকগুলো সত্যিই চমৎকার হতো।
মনে আছে, ১৯৬৯ সালে নিল আর্মস্ট্রং যখন প্রথম চাঁদে পা ফেলল, তখন বড় ভাই আর মেজ ভাই মিলে টেপরেকর্ডারে একটা পুরো সিকোয়েন্স তৈরি করল মানুষের চাঁদে যাওয়া নিয়ে, অডিও ডকুমেন্টারি টাইপ। সত্যিই সেটা অসাধারণ হয়েছিল। মোট কথা, এসব নাটক করার পাগলামো হয়তো বড় ভাই বাবার কাছ থেকেই পেয়েছিল।
অনেক পরে সে যখন বহুব্রীহি, এইসব দিনরাত্রি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি, শ্যামল ছায়া...এসব নাটক-সিনেমা করে বিখ্যাত পরিচালক হয়ে গেছে, তখন একদিন তার সিনেমা-নাটক করা নিয়ে পারিবারিক আড্ডা হচ্ছিল। একপর্যায়ে মা বললেন: তুই বিখ্যাত হওয়ার আগেই তোর বাবা মারা গিয়ে একদিকে বলা যায় ভালোই হয়েছে রে।
: কেন আম্মা, এ কথা বলছেন কেন?
: তোর বাবা যেমন নাটকপাগল মানুষ ছিলেন, বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই তোর কোনো না কোনো নাটক-সিনেমায় কোনো চরিত্রের রোল চেয়ে বসত অভিনয়ের জন্য, আর তুই রাজি হতি না। তখন লাগত ভেজাল...সেটা সামলাতে হতো আমাকে!
আমরা সবাই হেসে উঠলাম আম্মার কথা শুনে।
২
ছোট বোন শিখুকে নিয়ে বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ গেছে বাড়ির পাশের এক মেলায়। সেখানে একটা জায়গায় কেক বিক্রি হচ্ছে। ছোট বোন শিখু বলল: দাদাভাই, এটা কী?
: এটা কেক।
: এটা কী করে?
: এটা খেলে কেউ মরে না।
: সত্যি? তাহলে আমি খাব।
: কিন্তু ওরা এসব কারও কাছে বিক্রি করে না। বিক্রি করলে তো সবাই খাবে। তারপর কেউ আর মরবে না। পৃথিবী ভরে যাবে মানুষে।
হুমায়ূন আহমেদের জ্ঞানগর্ভ ব্যাখ্যা।
: তাহলে সাজিয়ে রেখেছে কেন?
ছোট বোনকে হুমায়ূন আহমেদ এবার দিল ধমক—‘বেশি কথা না বলার জন্য।’
৩
আমাদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা যখন একটু সেটেল হলো, তখন আমার মা ঠিক করলেন, তিনি একটা সোনার মুকুট বানাবেন। সেই মুকুট পরে তাঁর সব নাতনিদের এক এক করে বিয়ে হবে। সর্বশেষ যার বিয়ে হবে, মুকুট তার কাছেই থাকবে। ৫০ হাজার টাকা খরচ করে (সেই আমলে) সোনার মুকুট বানানো হলো। দাদাভাই বলল, ‘আম্মা, আপনার নাতনিদের মধ্যে কেউ যদি দুবার বিয়ে করে, তখন কী হবে? আবার ওই মুকুট পরার সুযোগ পাবে?’
তার এই শাশ্বত প্রশ্নের উত্তরে তখন কে কী বলেছিল, এখন আর মনে নেই। মনে না করাই বোধ হয় উত্তম!
৪
হুমায়ূন আহমেদ পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরেছে। সবাইকে বিদেশ থেকে আনা জিনিসপত্র দিচ্ছে। আমাকে ডেকে বলল: সিগারেট ধরেছিস তো?
(আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।)
আমি কথা বলি না। মাথা চুলকাই। সে আমাকে এক প্যাকেট দামি বিদেশি সিগারেট দিল। আমি মহাখুশি। যাক বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় বিদেশি সিগারেট টানা যাবে। কিন্তু একটু বাদেই সে বলল: এই তোর প্যাকেট থেকে দুটো সিগারেট দে তো আমার প্যাকেটটা খুঁজে পাচ্ছি না।
আমি বিরস মুখে তা দিলাম।
ঘণ্টাখানেক পর আবার, ‘তোর প্যাকেট থেকে দুটো সিগারেট দে তো আমার প্যাকেটটা খুঁজে পাচ্ছি না’...‘তোর প্যাকেট থেকে দুটো সিগারেট দে তো আমার প্যাকেটটা খুঁজে না...’—এই করতে করতে বিকেলের আগে গিফট পাওয়া সিগারেটের প্যাকেট প্রায় খালি!
৫
১৯৭৪ সালের দিকে সৈয়দ মুজতবা আলী ঢাকায় এসেছিলেন। কিছুদিন ধানমন্ডিতে ছিলেন। তখন আমার বড় বোন সুফিয়া হায়দার বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ডিপার্টমেন্টে পড়ত ফার্স্ট ইয়ারে। সে আর তার দু-একজন বান্ধবী সৈয়দ মুজতবা আলীর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে উনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। সৈয়দ মুজতবা আলী তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক কথাবার্তা বলেছেন। আপারা এতই নার্ভাস ছিল যে এত বড় লেখকের সামনে ঠিকমতো কথা বলতে পারেনি।
তারা যখন সৈয়দ মুজতবা আলীর সামনে দাঁড়ানো, তখন এক লোক এসে বলল, ‘এক সাংবাদিক আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।’ আপাদের মনে হলো মুজতবা আলী খুব বিরক্ত হলেন এবং বললেন, ‘গিয়ে বলো, সৈয়দ মুজতবা আলী মারা গেছে এবং তার মুখের ওপর মাছি ভনভন করে উড়ছে!’
পরে এ ঘটনা আপা দাদাভাইকে বলে। দাদাভাই তাকে বলে, ‘হুম, বিশ্বাস করলাম, তুই সত্যিই সৈয়দ মুজতবা আলীর সঙ্গে দেখা করেছিস...মাছি ভনভন করার রসিকতা তুই বানিয়ে বলতে পারতি না। ওটা উনার পক্ষেই বলা সম্ভব।’
৬
হুমায়ূন আহমেদ তখন মোটামুটি চেইন স্মোকার। ব্রিস্টল সিগারেট তার ব্র৵ান্ড। তখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার। বিয়েও করেনি। আমাকে দিয়ে একটা একটা করে সিগারেট কিনতে পাঠায়। বারবার দোকানে যেতে হয় বলে আমিও বিরক্ত। কী করি! তখন মাথায় বুদ্ধির বাল্ব জ্বলে উঠল। বড় বোনের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে এক কার্টুন ব্রিস্টল সিগারেট কিনে ফিরলাম। দোকানে দৌড়াতে হবে না ব্যবসাও হবে।
তারপর যথারীতি সে ডেকে পাঠাল,
: শাহীন, (আমার ডাকনাম) যা তো...
আমি প্রস্তুত এখনি বলবে, ‘যা তো দুটো ব্রিস্টল সিগারেট কিনে আন...।’
না, তা না বলে সে বলল, ‘দুটো ক্যাপস্টান ফিল্টার কিনে আন, আমি ব্র্যান্ড চেঞ্চ করেছি!’
আমার ব্যবসা লাটে!
৭
দাদাভাইয়ের নিজস্ব কিছু হিউমার ছিল, যা সে তাৎক্ষণিকভাবে করত। আমার বড় ভাগনি শর্মী (শবনম হায়দার শর্মী, এখন জার্মানিপ্রবাসী) সে তখন খুবই ছোট। সে একটা সুন্দর ডায়েরি পেয়েছে, কেউ হয়তো তাকে গিফট করেছে। সে ঠিক করল, এটাকে সে অটোগ্রাফ খাতা বানাবে। প্রথমেই ছুটে গেল তার মার কাছে।
: মা, একটা কিছু লিখে দাও।
তার মা লিখল, ‘অনেক বড় হও, মা।’
শর্মী এবার ছুটে গেল দাদাভাইয়ের কাছে।
: বড় মামা, একটা কিছু লিখে দাও।
বড় ভাই লিখল, ‘অনেক বড় হও, ডাবল মা।’
৮
হুমায়ূন আহমেদের ক্যানসার ধরা পড়ার পর থেকে সে কিন্তু খুব হাসিখুশিই ছিল। তার ফান করা যেন আরও বেড়ে গেল। নিজের অগ্রিম কুলখানি কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে প্রায়ই হাসিঠাট্টা করত। কিন্তু একদিন দেখা গেল, তার খুবই মেজাজ খারাপ এবং যথেষ্ট বিরক্ত সে। অনুসন্ধান করে বিরক্তির কারণ জানা গেল। তার কাছে খবর এসেছে, ময়মনসিংহের কোনো একটি সংগঠন নাকি ‘হুমায়ূন আহমেদের ক্যানসারের প্রতিবাদে’ রাস্তায় দীর্ঘ মানববন্ধন করেছে!
৯
তার মুখে শোনা আমার শেষ জোকটা পল্লবীতে বসেই শোনা হয়েছিল। ক্যানসারের প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট করে সে দেশে এসেছিল মা আর নুহাশপল্লী দেখার জন্য। এক ফাঁকে আমাদের পল্লবীর বাসায় এসেছিল। খাওয়ার সময় সাধারণত সে বেশ মজার গল্পটল্প বলে। সেদিনও দুপুরে খাওয়ার সময় সে আমার বড় বোনকে জোকটা বলল। আর পাশ থেকে আমিও শুনলাম। জোকটা এ রকম:
এক লোক এক বাসায় দাওয়াত খেতে গেছে। নানা রকম খাবারদাবার দেওয়া হয়েছে। তবে সব খাবারই কোনো না কোনো সবজি দিয়ে রান্না করা হয়েছে। বাড়ির মালিক জিগ্যেস করলেন, ‘ভাই, খাওয়া কেমন হয়েছে?’ খাওয়া আসলে ভালো হয়নি। তারপরও লোকটি বলল,
: সবচেয়ে ভালো হয়েছে শসার আইটেমটা।
: কী বলছেন, শসা তো শুধু সালাদে দেওয়া হয়েছে।
: ওই জন্যই...ওটা যেহেতু রান্না করতে পারেননি, তাই খেতে ভালো লাগছে।
আসলে বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে, তাকে কেন্দ্র করে কত যে মজার ঘটনা আছে, মাঝে মাঝে মনে করে এখনো মনে মনে হাসি, মাঝে মাঝে চোখ ভিজে ওঠে। সে নেই, সে যেন আমাদের পরিবারের সব আনন্দ নিয়ে চলে গেছে একা, আমাদের তার নন্দিত নরকে রেখে!