ব্রুটাস

আঁকা : সৌখিন

আরাম করে সোফায় বসেছি। আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ দেখব। আমার বউ তামান্না গেছে চা বানাতে। একসাথে খেলা দেখব।

বিয়ের পর এটা আমার প্রথম বিশ্বকাপ। আমি আর তামান্না দুজনই আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। তামান্না তো ‘মেসি’ বলতে অজ্ঞান। নিজের বউ আরেক বেটার নামে অজ্ঞান, বিষয়টা খুব আনন্দদায়ক হওয়ার কথা নয়। অবশ্য আমার চেনা যত আর্জেন্টিনার সাপোর্টার আছে, তাদের স্ত্রীরা ব্রাজিল সাপোর্ট করে, প্লাস ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ভক্ত। সেদিক দিয়ে আমি ভালোই আছি।

বাবা সব সময় বলতেন, ‘পক্ষের ষাঁড়ও ভালোবাসবি। আর বিপক্ষের গাভিও এড়ায়া যাবি। আখেরে শান্তি আসবে।’ তামান্নার মেসিপ্রীতি আমার জন‌৵ ‘পক্ষের ষাঁড়’।

ম্যাচ শুরু হয়ে গেছে। কী এক মামলার কাজে গতকাল তামান্নার বাবা ঢাকায় এসেছেন। তিনিও এসে ঢুকলেন ড্রয়িংরুমে। লম্বা সালাম দিলাম দাঁড়িয়ে।

‘বসো বসো। একসাথে খেলা দেখি। কী মনে হয়? গোল দিতে পারবা?’

‘বিশ মিনিটের মধ্যে গোল হবে, দেখবেন।’

পান চিবাতে চিবাতে শ্বশুর বললেন, ‘আমি খেয়াল করছি, নরম মনের মানুষেরা সবাই খেলা ভালোবাসে। আমিও বাসি।’

তামান্না উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, ‘আব্বা, ও নিজে খেলতও। কত পুরস্কার যে পেয়েছে, যদি শুনতা।…আচ্ছা, তুমি ওই ঘটনাটা বলো তো আব্বাকে, ওই যে, নয় উইকেট পড়ে গেছে, তুমি একলা সেঞ্চুরি মেরে ম্যাচ জিতাইলা…’

বলতে বলতে মিসর গোল দিয়ে দিল। বিশ মিনিট হয়নি এখনো।

জানতাম! সকাল থেকেই মন কু ডাকছিল। সারা দিন বৃষ্টি। গত যে ম‌্যাচে ব্রাজিল বাদ গেল, সেদিনও এমন বৃষ্টি ছিল!

এর মধ্যে তালিয়াফিকোকে কড়া একটা ট্যাকল দিয়ে কাত করে ফেলেছে মিসরের এক খেলোয়াড়। আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়েরা রেফারিকে মাছির মতো ঘিরে ধরেছে, ফাউল না দিয়ে যাবি কই? দে দে, পেনাল্টি দে।

উত্তেজনায় গা কাঁপছে আমার। এমন সময় আবার তামান্নার গলা, ‘অ্যাঁ, বলতেছ না কেন?’

‘কী?’

‘ওই যে, নয় উইকেট পড়ে গেছে, তুমি একলা সেঞ্চুরি মেরে ম্যাচ জিতাইলা…’

বিয়ের পর প্রথম রাতে বিড়ালের বদলে একের পর এক গুল মেরে যাচ্ছিলাম। জেলায় ফার্স্ট ডিভিশন ক্রিকেট খেলেছি। ছবি আঁকায় পুরস্কার আছে। অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস।… যত ধরনের গুল ইনস্ট্যান্ট মাথায় আসে আরকি। তার মধ্যে বোধ হয় এই সেঞ্চুরির গল্প ছিল। কিন্তু সে কি আর মনে আছে?

আরও পড়ুন

‘কী হলো! আব্বাকে বলো!’ তামান্নার গলা শোনা যায় আবারও।

টিভির দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘বলতেছি, দাঁড়াও।…উফফ, পেনাল্টিটা দিল অবশেষে!’

‘আরে, পেনাল্টি দেখার কী আছে! মেসির কি আর গোল মিস হবে?’

বলতে বলতে পেনাল্টি মিস। গোলকিপার ঠেকিয়ে দিয়েছে। আশ্চর্য এক ব৵াপার, আর্জেন্টিনার সাথে খেলা হলেই গোলকিপারদের শরীরে জিন ভর করে বোধ হয়। বুকটা ফাঁকা হয়ে গেল আমার। হাহাকার বেরিয়ে এল বুক চিরে। এমন সময় শ্বশুর আব্বার গমগমে গলা শুনতে পেলাম, ‘ধুরো! মেসি কোনো পিলিয়ার হইল!’

শ্বশুর আব্বা ব্রাজিল সাপোর্ট করেন, জানি। ফলে এই ভয়াবহ বাজে কমেন্ট হজম করে নিলাম। একে শ্বশুর আব্বা, তার ওপর বয়সে সিনিয়র।

আরও পড়ুন

পেনাল্টি মিস করলেও মেসি যে আসলে ভালো প্লেয়ার, এটা বলতেই যাব, এমন সময় আবার ছুটে এল আব্বার বোমাসদৃশ কণ্ঠ, ‘বলো বলো। এমন ফালতু পিলিয়ার দেখছ জীবনে? যা গোল করে, সব নাকি পিনাল্টিতেই করে। তা-ও আবার মিস! পিলিয়ার হইল গিয়া নিমার। কী বলো?’

উফফ! এ কোন ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে আল্লাহ আমার! বলতেই যাচ্ছিলাম, ‘আব্বা, নেইমারের মিস হওয়া পেনাল্টির একটা বল এখন ভয়েজারের সঙ্গে ছুটে বেড়াচ্ছে!’ এর মধ্যে আবারও তাঁর গলা, ‘আরেকজন পিলিয়ার হইল গিয়া রুনালদু।’ এরপর গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা বাবা, সারা জীবন শুনছি যে রুনালদু ব্রাজিলে খেলে। কাপ জিতছে। এখন তার পর্তুগালে খেলার মানে কী? এইটা কি বেইমানি না? বলো?’

শুরুতে বুঝতেই পারলাম না, উনি কী বলছেন। ওদিকে বারবার পেনাল্টি মিসটা রিপ্লে হচ্ছে।

আমার চোখে একরাশ দুঃখ-বেদনা-হতাশা। সেসব না দেখার ভান করে আব্বা বলেই যাচ্ছেন, ‘কী বলো তুমি? রুনালদু যদি আগের মতোই ব্রাজিলে খেলত, তাইলে কি ব্রাজিলের এমন দুর্দশা হইত?’

আমি বললাম, ‘আব্বা, এইটা অন্য রোনালদো।’

‘কী বলো?’

‘হ আব্বা। এইটা অন্যজন।’

‘ওহ। তা-ই বলো! যাক, তোমার কাছ থেকে নতুন একটা জ্ঞান অর্জন করলাম।’

আব্বার এই কথাটা সিরিয়াস, নাকি টিটকারি, ঠিক বুঝলাম না। তিনি তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে। গুটুরগুটুর গল্প শুরু হয়েছে আবার। মন্দের ভালো যে পেনাল্টি মিসের কারণে সেঞ্চুরির গল্পটা কাটানো গেছে।

আরও পড়ুন

এর মধ্যে হাইড্রেশন ব্রেক দিল। আবার শ্বশুর আব্বার কণ্ঠ, ‘এই যে “হাইপারটেনশন ব্রেক” দিল, এইটা ভালো করছে। ছোটবেলায় আমরা যখন ফুটবল খেলতাম, তখনো এই রকম ব্রেক দিত। ওই ব্রেকে আমরা বিড়ি-সিগারেট খায়া নিতাম।’

চেহারায় যথাসম্ভব বিনয় ফুটিয়ে বললাম, ‘আব্বা, এইটা হাইড্রেশন ব্রেক। পানি পানের বিরতি।’

আব্বা তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, ‘ওই একই কথা! যেই টেনশন থাকে, বিড়ি-সিগারেট না খাইলে কি আর তা দূর হয়!’

আবার খেলা শুরু। আবার বাপ-মেয়ের গুটুরগুটুর। এদিকে আর্জেন্টিনা গোল শোধের চেষ্টা করে যাচ্ছে মরিয়া হয়ে। আমিও মরিয়া হয়ে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছি।

ফার্স্ট হাফের বিরতি শুরু হলো। যা কথাবার্তা বলার, এখনই বলে ফেলি। হাতে আছে পনেরো মিনিট। এমন কোনো আলাপ তুলতে হবে, যা ওইটুকু সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।

‘আব্বা, সত্তর মিনিটের মধ্যে গোল না দিতে পারলে আজ আমরা বাদ। আর কাজ হবে না।’

আব্বা পান চিবাতে চিবাতে বললেন, ‘ধুরু। সত্তর মিনিটের মইধ্যে আরও গোল খাইব। তুমি তো টেংশনে খেলায় অত মনোযোগ দিতে পারো নাই।’

মেজাজ টং হয়ে গেল আমার। কথা বলাই ভুল হয়ে গেছে। প্রসঙ্গ পাল্টে যথাসম্ভব নরম গলায় বললাম, ‘আব্বা, আপনার রোনালদোও কিন্তু বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিছে। এতক্ষণে বাড়িতে চলে গেছে বোধ হয়।’

আব্বা সত্যিকারের ব্যথিত চোখে তাকালেন আমার দিকে। বললেন, ‘কী বললা! এত ভালো একটা পিলিয়ার। সব ওই মেসির ষড়যন্তর। পুরা ফিফা হের কেনা। হেয় একটা মাফিয়া।’

তামান্না বাবাকে থামিয়ে দিতে চাইল, ‘এইগুলা ভুয়া কথা, আব্বা।’

‘তুই থাম!’

সেকেন্ড হাফ শুরু। আর্জেন্টিনা এখনো মরিয়া। তাতে অবশ্য খুব লাভ হচ্ছে না। কপালজোরে মিসরের একটা গোল বাতিল হয়ে গেল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে না বাঁচতেই আব্বার গুলি, ‘কী, বলছিলাম না, সব মাফিয়া মেসির খেল!’

তবু চুপ থাকলাম। আগেই বলেছি, শ্বশুর আব্বা, আবার সিনিয়র।

ঠিক সাতষট্টি মিনিটে দ্বিতীয় গোলটা হলো। কোন কুক্ষণে যে সত্তর মিনিটে গোলের কথা বলতে গেলাম! আজ আর্জেন্টিনার পক্ষে যা বলছি, সব দেখি মিসরের ঘরে চলে যাচ্ছে। নাহ, আর একটা ভবিষ্যতদ্বাণীও করা যাবে না। লক্ষণ খারাপ। তার ওপর সারা দিন বৃষ্টি।

উনআশি মিনিটে পাশের বাসা থেকে ভয়াবহ চিৎকার ভেসে এল। এর দশ সেকেন্ড পর দেখিও রোমেরো গোল দিয়েছে। পাশের বাসায় বিটিভিতে খেলা দেখে, দশ সেকেন্ড আগেই টের পায় ওরা।

তিরাশি মিনিটে আবার স্পয়লার। পাশের বাসায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। ঠিকই দশ সেকেন্ড পর দেখতে পেলাম, মেসি গোল দিয়েছে।

আমি হইহই করে লাফিয়ে উঠলাম। তামান্নাও লাফিয়ে উঠল সোফা ছেড়ে। হাততালি দিতে দিতে খেয়াল হলো, শ্বশুর আব্বা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছেন ছোট মেয়ের দিকে। চেহারায় কেমন এক জিঘাংসা ফুটিয়ে যেন বোমা ছুড়লেন তিনি, ‘কী রে তামান্না, তুই না ‍রুনালদুর ফ্যান ছিলি? ব্রাজিল করতি? জামাই নাহয় সরল মানুষ, তোরে তো বুদ্ধিমান জানতাম।’

তামান্না থতমত খেয়ে গেল। হতভম্ব গলায় বলল, ‘কী বলো আব্বা! আমি তো আগে থেকেই আর্জেন্টিনা।’

‘কী রে! ভুলে গেছিস, তুই যে ব্রাজিলের অন্ধ ভক্ত ছিলি! ছোটবেলায় ট্রাংকভরা ব্রাজিলের পিলিয়ারগো ছবি আছিল।’

‘ইউ টু ব্রুটাস!’ দৃষ্টি নিয়ে আমি তামান্নার দিকে তাকালাম। সে আমতা–আমতা করে বলল, ‘আব্বা, তোমার ভুল হচ্ছে। আমি আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করতাম।’

আব্বা চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘চুপ কর! মিথ্যা বললে তোর নামে মামলা করে বাড়ি যাব। প্রতারণা মামলা। তোর জামাইয়ের নামেও মামলা ঠুকে দিব। সে মানসিক চাপ দিয়ে তোরে অন্য দল সাপুর্ট করাইতেছে!’

আমি বললাম, ‘আব্বা, শান্ত হন। আপনার মেয়ে ব্রাজিল সাপোর্ট করে। আমাকে আগেও বলেছে।’

‘তাইলে মেসির গোলে হাততালি দিল ক্যান?’

তামান্না রেগেমেগে চলে গেল। আমিও গেলাম। রুমে ঢুকতেই বলল, ‘আব্বা থাকতে আর কখনো যদি খেলার নামও নাও, আমি বাড়িতে চলে যাব।’

যথেষ্ট বিজ্ঞানমনস্ক হলেও রাতে একটু সমস্যা হয় আমার। তখন সব পদার্থবিজ্ঞান উড়ে গিয়ে ভূতবিজ্ঞান ভর করে। ভূতের ভয় আষ্টেপৃষ্ঠে কাবু করে ফেলে আমাকে। তাই আমতা–আমতা করে বললাম, ‘ঠিক আছে। খেলা বাদ।’

‘আমি কোন দলি করি না-করি, তা নিয়েও কিছু বলা যাবে না।’

‘আচ্ছা।’

‘মনে থাকে যেন। নইলে সোজা বাপের বাড়ি।’

‘আচ্ছা।’

বলেই টের পেলাম, পাশের বাসা থেকে চিৎকার ভেসে আসছে—‘গোওওওওওল!’