রায়ট কারের সুবিধা

কার্টুন: এআই

রাজধানীর বাজারে এখন হীরা-মুক্তা বাদ দিয়ে সবচেয়ে হট আইটেম ‘রায়ট কার’ বা সাঁজোয়া যান!

এক হাজার পিস রায়ট কার কেনার বিশাল ধুম পড়েছে। প্রতিটির দাম মাত্র সোয়া দুই কোটি টাকা! শুনে সাধারণ মানুষের হার্টবিট বাড়লেও নীতিনির্ধারকদের বাজেটে তো আর টান পড়েনি। তাই বেশ আয়েশ করেই চলছে এই মেগা প্রজেক্ট।

গাড়ির স্পেশালিটি শুনলে যেকোনো সচেতন নাগরিকের চোখ কপালে উঠবে। ভেতরে বুলেটপ্রুফ গ্লাস, স্পেশাল এয়ারকন্ডিশনের পাশাপাশি এতে যুক্ত করা হয়েছে বিশেষ ‘জনতা তাড়ানো’ হর্ন।

সেই হর্ন বাজলেই নাকি মানুষ নিমেষেই উত্তেজনা ভুলে সোজা বাড়ি গিয়ে মায়ের হাতের গরম খিচুড়ি খাওয়ার জন্য বায়না ধরবে!

গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয়েছে, এই গাড়ির উপস্থিতি মাত্রই মানুষের মাথা ঠান্ডা হয়ে মুখে একধরনের মায়াবী হাসি ফুটে ওঠে। এর কারণ বিশেষ রং। গাড়ির রং দেখলেই মানুষের মনে শান্তি নেমে আসে।

সরকার এই ধারণা সম্ভবত ‘The Perfume’ সিনেমা থেকে পেয়েছে। শুধু পারফিউমের বদলে এবার ব্যবহার হবে রায়ট কার!

তবে আসল টুইস্ট লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। এই গাড়িগুলো আসলে কোনো রাজনৈতিক দলের মিছিল বা মিটিং ঠেকানোর জন্য নয়। এগুলো কেনা হয়েছে আমাদের নিত্যদিনের আসল জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য।

সরকার অবশ্য বেশ মহৎ উদ্দেশ্যেই গাড়িগুলো আনছে। আমাদের দেশে এখন যেকোনো ছুঁতোয় মানুষ রাস্তায় নামে।

ফুটপাতের বাদাম বিক্রেতা থেকে শুরু করে পিএইচডি করা বেকার যুবক—সবাই ব্যস্ত রাজপথ গরম রাখতে।

সরকার ভাবল, এভাবে চলতে থাকলে তো রাজপথের পিচগুলো অতিরিক্ত চাপে নষ্ট হয়ে যাবে! তাই দেশের রাস্তা, পিচ ও নাগরিকদের ধৈর্য—সবকিছু বাঁচাতেই এই গাড়িগুলোর আমদানি।

গাড়ির রঙেও এসেছে আধুনিক নান্দনিক ছোঁয়া। একঘেয়ে কালো বা জলপাই রঙের পরিবর্তে গাড়িগুলো রাঙানো হয়েছে আকর্ষণীয় গোলাপি আর বেবি ব্লু রঙে।

যাতে মারামারি বা ধস্তাধস্তির সময়ও একটু ফ্যাশনেবল বাটিক প্রিন্টের ফিল পাওয়া যায়!

বিরোধী দলের নেতারা অবশ্য ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘সরকার আসলে দাঙ্গা দমন করতে চায় না, তারা দেশের কার মার্কেটে একধরনের বিলাসবহুল বিপ্লব ঘটাতে চায়!’

তবে আসল টুইস্ট লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। এই গাড়িগুলো আসলে কোনো রাজনৈতিক দলের মিছিল বা মিটিং ঠেকানোর জন্য নয়। এগুলো কেনা হয়েছে আমাদের নিত্যদিনের আসল জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য।

শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার সময় অফিসগামী যাত্রীরা যখন প্রতিদিন সিএনজি বা বাসের ড্রাইভারের সঙ্গে মিটারে না যাওয়াকে কেন্দ্র করে হাতাহাতিতে লিপ্ত হন, অথবা ট্রাফিক জ্যামে পড়ে দুই বাসের কন্ডাক্টরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী ঝগড়া শুরু হয়—ঠিক সেই মুহূর্তেই মাঠে নামবে রায়ট কার।

‘আজ ধানমন্ডিতে অসাধারণ একটা গাড়ি দেখলাম। দেশের উন্নয়ন চোখে দেখা যাচ্ছে!'

কারণ, আমাদের দেশের আসল বড় দাঙ্গাগুলো কোনো রাজনৈতিক মঞ্চে নয়।

দাঙ্গা হয় কাওরান বাজারে ইলিশ মাছের দাম নিয়ে।

দাঙ্গা হয় ২৫০ গ্রাম কাঁচা মরিচ বেশি চাওয়া নিয়ে।

দাঙ্গা হয় ফুটপাতে ফুচকার প্লেটে টক কম দেওয়া নিয়ে।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর সংঘর্ষটা হয় ধানমন্ডি লেকের পাড়ে—যখন প্রেমিক-প্রেমিকা দুজন মিলে ফুচকাওয়ালাকে বলে, ‘ভাই, টকটা একটু বেশি দেন।’

ফুচকাওয়ালা তখন বলে, ‘আপা, বেশি টক দিলে পেটের সমস্যা হবে।’

ব্যস!

এরপর প্রেমিক বলে, ‘আপনি জানেন আমি কে?’

ফুচকাওয়ালা বলে, ‘না।’

এই ‘না’ বলাটাই হয়ে যায় পরিস্থিতির মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।

সঙ্গে সঙ্গে রায়ট কারের হর্ন বাজবে।

প্রেমিক-প্রেমিকা, ফুচকাওয়ালা, পথচারী—সবাই শান্ত।

কেউ আর ফুচকা নিয়ে কথা বলবে না।

সবাই মিলে রায়ট কারের গোলাপি রং দেখে মুগ্ধ হয়ে ছবি তুলবে।

তারপর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবে—‘আজ ধানমন্ডিতে অসাধারণ একটা গাড়ি দেখলাম। দেশের উন্নয়ন চোখে দেখা যাচ্ছে!'

এভাবেই একদিন আমাদের দেশের সব দাঙ্গা শেষ হবে।

রাজপথে আর কোনো মিছিল থাকবে না।

থাকবে শুধু রায়ট কার।

আর তার পাশে দাঁড়িয়ে এক হাতে ফুচকা, অন্য হাতে মোবাইল নিয়ে জনগণ শান্তিপূর্ণ সেলফি তুলবে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন