ইদানীং আমাকে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার করা হচ্ছে। এটা নয়া জমানার নয়া বন্দোবস্ত কি না, বুঝতে পারছি না। মানুষ এখন কথায় কথায় আমাকে ব্যবহার করছে। মানে, ‘ভাইরাল’ শব্দটা।
আরে ভাই, আমাকে নিয়ে এত টানাটানির কী আছে? মাঝেমধ্যে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে ইনকিলাবের ডাক দিতে ইচ্ছে করে। আরও ইচ্ছে করে গোলামি থেকে আজাদির ঘোষণা দিতে। ‘দিল্লি না ঢাকা’—এই স্লোগানের ইস্যুতেও মুখ খুলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পারি না। পারলেও আমার কথা, শব্দ, বায়ান কেউ বুঝতে পারে না। অবশ্য আমি সবার হাবভাব ঠিকই বুঝতে পারি।
সেদিন বন্ধুদের আড্ডায় ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে শাকিল নামের এক তরুণ বললেন, ‘আরে মামা..., আমার গানের ভিডিও তো ফেসবুকে ভাইরাল!’
এমন কথা শুনে কৌতূহলবশত তাঁর ফেসবুক পোস্টে গেলাম। দেখি, লাইক ৩৭টি, ভিউ ১৮৯। আমার মাথায় যেন ভূমিকম্প হলো। এটা কীভাবে ভাইরাল হলো, বুঝলাম না!
আমার সঙ্গে এ কেমন আচরণ। এভাবে প্রতিনিয়ত আমার মান-ইজ্জত লুণ্ঠন করা হচ্ছে। আমাকে অপমান-অপদস্থ করা হচ্ছে। এর কি কোনো বিচার নেই? বিচারহীনতার সংস্কৃতি আজ সর্বত্র। যেন দেখার কেউ নেই, বলার কেউ নেই।
কারে কী বলব, দুঃখের কথা! ২০০৪ সালে ফেসবুক আবিষ্কারের পর দুই দশক পেরিয়ে গেল। কিন্তু আমাকে নিয়ে কোনো কর্তৃপক্ষই ভেবে দেখল না। আমার প্রাপ্য সম্মান কেউ দিল না। আমাকে কেউ সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজনও মনে করল না।
দেশের সরকার না করুক, অন্তত মার্ক জাকারবার্গ কিংবা গুগল মামা তো একটা নোটিশ দিয়ে বলতে পারে—‘কোনো পোস্ট ২০ হাজারের বেশি লাইক এবং ১০ লাখের বেশি ভিউ হলেই কেবল সেটাকে ভাইরাল বলা যাবে। এর নিচে হলে ভাইরাল বলা যাবে না।’
এমন একটা ঘোষণা দিলেই তো সব ল্যাঠা চুকে যায়। এক জীবনে কী চেয়েছি? কিঞ্চিৎ সম্মান, আর সামান্য স্বীকৃতি। সেটাও দিতে এত কার্পণ্য কেন? কেন...? কেন...?
অথচ আমাকে নিয়ে ব্যবসা তো কেউ কম করছে না। আমার ঘাড়ে চেপে কতজন ডলার কামাচ্ছে। কেউ আবার রাতারাতি তারকা বনে যাচ্ছে। কিন্তু আমার জন্ম, ইতিহাস ও আভিজাত্য সম্পর্কে কেউ জানার চেষ্টা করে না।
অথচ চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করলেই তো সব জানা যায়। এটুকু পরিশ্রমও কেউ করতে চায় না। তাই আজ দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়ে নিজের সম্পর্কে নিজেই বলছি।
আমি মানে ‘ভাইরাল’—ইংরেজিতে viral—শব্দটির মূল উৎস চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান। Viral শব্দটি এসেছে virus থেকে। আর লাতিন virus শব্দের অর্থ ‘বিষ’ বা
‘বিষাক্ত পদার্থ’।
উনিশ শতকে জীববিজ্ঞানে virus শব্দটি ধীরে ধীরে এমন সংক্রামক রোগজীবাণু বোঝাতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, যা সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার চেয়ে ভিন্ন। এরপর viral অর্থ দাঁড়ায়—‘ভাইরাস-সম্পর্কিত’ বা ‘ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম’।
তবে আমার কপালটা খারাপ। আগে আমি ছিলাম বিজ্ঞানজগতের শব্দ। এখন আমি যেন হয়ে গেছি ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউব–দুনিয়ার জঞ্জাল।
ভুলে গেলে চলবে না। আমার অন্তর-আত্মাজুড়ে বিষ ও বিষাক্ত পদার্থ। আমার বংশপরিচয়ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সুতরাং আমার সঙ্গে কোনো ভংচং, ভগিচগি ও হাঙ্কিপাঙ্কি
চলবে না।
আমি চুপচাপ থাকি বলে ভেবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই যে আমি দুর্বল। তাই শেষবারের মতো বলছি—আমাকে সম্মান করো। যেখানে-সেখানে আমাকে ব্যবহার কোরো না। আমি খেপে গেলে কিন্তু সবার খবর আছে। প্রত্যেকের জীবন একেবারে ফানা ফানা করে দেব।