আমার বিয়ের বয়স হয়েছে—এই আবিষ্কারটি প্রথম আমার মা-ই করেছিলেন। এক শীতের সকালে মা ভাতের হাঁড়ি নামাতে নামাতে বললেন,
‘তোর জন্য একটা মেয়ে দেখা হয়েছে।’
আমি চুপ করে রইলাম।
বাবা খবরের কাগজের আড়াল থেকে বললেন,
‘মেয়ের বাবা ভালো মানুষ।’
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
‘মেয়েটা কেমন?’
বাবা খবরের কাগজটা ভাঁজ করে বললেন,
‘সেটা তোকে দেখার পর ওরাই ঠিক করবে।’
সেদিনই প্রথম বুঝলাম, বিয়ের বাজারে পাত্রেরও বাজারদর আছে—তবে ক্রেতা থাকে অন্য পক্ষে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট বোন পিউ মুচকি হেসে বলল,
‘ভাইয়া, তোমার তো আজকাল বেশ চাহিদা বেড়েছে।’
‘কীভাবে?’
‘আগে তোমাকে কেউ দেখতে চাইত না। এখন মেয়ের বাড়ির লোকজন এসে তোমাকে পরিদর্শন করে যাচ্ছে।’
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
‘এটা চাহিদা নয়। এটা পরিদর্শন।’
একদিন ঘটা করে মেয়ে দেখতে গেলাম।
মেয়ের বাড়ির বসার ঘরটি এতটাই পরিপাটি যে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়েই আমার অপরাধবোধ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমার জুতোর ধুলোও এই ঘরের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার যোগ্য নয়। মেয়ের বাবা চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
‘কোথায় চাকরি করেন?’
লোকটি গোয়েন্দা লাগিয়ে আমার নাড়িনক্ষত্র সব জানার পরও শেষবারের মতো তথ্য যাচাই করছেন। তথ্য ক্রসচেকের মতো ব্যাপার।
আমি চাকরির বিবরণ শেষ করার আগেই মেয়ের মায়ের স্পর্শকাতর প্রশ্ন,
‘বেতন কত?’
আমি গম্ভীর কণ্ঠে বললাম,
‘মেয়েদের বয়স আর পুরুষদের বেতন জিজ্ঞেস করতে নেই।’
আমার সরাসরি উত্তরে তিনি কিছুটা বিব্রত হয়ে মাথা নাড়লেন। তখন মেয়ের ভাবি সঞ্চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে কৌতূহলী মুখে বলল,
‘তা ঠিক। কিন্তু একটা ফিগার তো আমাদের জানতেই হবে।’
ক্ষণকাল বিলম্ব না করেই প্রজ্ঞার ভাব নিয়ে ঝটপট উত্তর দিলাম,
‘বেতনে হাত দিতে হয় না। একটু খোঁচা দিলেই মানিব্যাগ ভরে যায়।’
আমার কথা শুনে মেয়ের মা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। ভাবি হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘কমনসেন্স ভালো।’
মনে মনে বেশ পুলকিত হলাম। মনে হলো, নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতার তালিকায় আরও একটি গুণ যুক্ত হলো।
চা-পর্ব শেষ হলে, মেয়েটি লাজুক মুখে এসে সালাম দিয়ে মায়ের সামনে বসল।
মা কোনো ভণিতা না করেই জিজ্ঞেস করলেন,
‘আচ্ছা মা, দেশি ইলিশ চিনবে কীভাবে?’
রসুইঘরের প্র্যাকটিক্যাল কর্মকাণ্ডের ওপর জিজ্ঞাসায় মেয়েটি একটু ভেবে বলল,
‘ভাষা শুনে।’
আমরা সবাই পরস্পরের মুখের দিকে তাকালাম।
বাবা হাস্যোজ্জ্বল মুখে জিজ্ঞেস করলেন,
‘কী রকম?’
মেয়েটি বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,
‘দেশি ইলিশ চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলে।’
‘কেন?’
মায়ের বিস্মিত হওয়া প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটি একটুও না ঘাবড়ে দ্বিধাহীন চিত্তে বলল,
‘ইলিশ তো সাগরে থাকে। আর সাগর তো চট্টগ্রামের পাশেই।’
উত্তর শুনে জোঁকের মুখে লবণ দেওয়ার মতো অবস্থায় পতিত হয়েছে মায়ের মুখ। বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি দাঁত–মুখ খিঁচে বাগ্যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট আছেন।
সেদিন রাতে খাবার টেবিলে পিউ দাঁত কেলিয়ে বলল,
‘বাবা, কী ফাজিল মেয়ে! ভাষা শুনে নাকি দেশি ইলিশ চেনে!’
পিউয়ের কথা শুনে মা হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেললেন। আমরা সবাই হাসছি। আমি ইলিশ মাছের মাথায় কামড় বসিয়ে বললাম,
‘মা, মেয়েটা কিন্তু আমাদের ভালোই বাঁশ দিয়েছে।’
মা রাগত স্বরে বললেন,
‘তুই সবকিছুতেই বাঁশ দেখিস কেন?’
আমি ব্যাখ্যা করলাম,
‘কারণ, বাঁশটা আগে থেকে দেখা গেলে, খাওয়ার পর ব্যথাটা একটু কম লাগে।’
মা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
‘জীবনে বাঁশ না এলে মানুষ সাবধান হতে শেখে না।’
মায়ের এই দার্শনিক কথায় বাবা মিটিমিটি হাসতে হাসতে বললেন,
‘শোন, পুরুষ মানুষের জীবনে বাঁশ একবারই আসে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
‘কখন?’
বাবা ঘাড় দুলিয়ে বললেন,
‘যখন সে নাচতে নাচতে বিয়ে করতে যায়।’
একটু থেমে খোঁচা দেওয়া মন্তব্য যোগ করলেন,
‘বিয়ের পরদিন থেকেই আমৃত্যু সেই বাঁশের ব্যথা বহন করতে হয়।’
এরপর আর কিছু বলার সুযোগ পেলেন না বাবা। মা বজ্রকণ্ঠে ফেটে পড়লেন। তিনি রাগে গজরাতে গজরাতে রান্নাঘরের দিকে চলে যেতে যেতে বললেন,
‘বাঁশ খাওয়ার কথা এতই যখন জানেন তখন একদিন রান্না করে খাওয়াব।’
বাবার হাতে মাছের কাঁটা গেঁথে গেল। তিনি ধীরে ধীরে আমার দিকে অসহায়ের মতো তাকালেন। আমি মুখ নিচু করে ভাত মাখতে লাগলাম। পিউ টেবিলের নিচে পা দিয়ে আমাকে খোঁচা দিল। তার মুখে মজা পাওয়ার মজাদার হাসি ফুটেছে। বাবা আর কিছু বললেন না।
রান্নাঘর থেকে মায়ের তির্যক কণ্ঠ ভেসে এল,
‘আর হ্যাঁ, আপনার জন্য বাঁশটা কচি দেখে আনব।’
বাঁশ খেয়ে বাবা, সুবোধ বালকের মতো চুপচাপ মাছের কাঁটা বাছতে লাগলেন।