আমাদের বাসায় বিদ্যুৎ আর গ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কটা এখন আর স্বাভাবিক কোনো সম্পর্ক নয়। তারা আত্মীয়স্বজনের মতো—কখন আসে, কখন যায়, কেন যায়, কিছুই জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। শুধু জানা যায়, দুজনকে একসঙ্গে পাওয়া বিরল সৌভাগ্য।
সেদিন সন্ধ্যায় ফ্যানের নিচে বসে টেলিভিশনে খবর দেখছিলাম। ফ্যানটা বেশ জোরে ঘুরছিল। মনে হচ্ছিল, পৃথিবী যতই অশান্ত হোক, অন্তত এই ফ্যান তার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে যাচ্ছে।
আচমকা ফ্যান থেমে গেল। টেলিভিশন অন্ধকার। ঘর অন্ধকার। রান্নাঘর থেকে স্ত্রীর চিৎকার এল, ‘বিদ্যুৎ গেছে?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’
দুই সেকেন্ড পর আবার চিৎকার, ‘গ্যাসও নেই!’
ঠিক তখনই ছেলে দৌড়ে এল।
‘বাবা, ওয়াই-ফাই নেই!’
আমি বললাম, ‘বিদ্যুৎ নেই।’
সে অবাক হয়ে বলল, ‘তাতে ওয়াই-ফাইয়ের কী দোষ?’
তার মোবাইলে তখন চার শতাংশ চার্জ। সে এমনভাবে চার্জার খুঁজতে লাগল, যেন জীবন-মরণের প্রশ্ন।
রান্নাঘরে গিয়ে দেখি স্ত্রী চুলার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। খট খট করে গ্যাসের চুলার নব ঘোরাচ্ছে, কিন্তু শিখা উঁচিয়ে আগুন জ্বলে উঠছে না। আমিও খট খট শব্দ তুলে গ্যাসের চুলার নব ঘুরিয়ে চুলা পরীক্ষা করলাম। সাত মিনিটের বৈজ্ঞানিক গবেষণার পর নিশ্চিত হলাম—গ্যাস নেই।
আমাদের বাবা তখন পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। বয়স আশির কাছাকাছি। বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওয়াই-ফাই—কোনোটার ওপরই তাঁর বিশেষ আস্থা নেই। ফলে আধুনিক বিপর্যয়ে তিনিই সবচেয়ে শান্ত।
তিনি পুরোনো একটা হারিকেন বের করে জ্বালালেন।
ছেলে হারিকেন দেখে অবাক হয়ে বলল, ‘দাদু, এটা কীভাবে চলে?’
বাবা বললেন, ‘বিদ্যুৎ ছাড়া।’
ছেলের মুখে এমন বিস্ময় ফুটল, যেন দাদু চাঁদে যাওয়ার গোপন প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন।
বাবা হারিকেনের পাশে বসে বললেন, ‘আমাদের সময়ে বিদ্যুৎ ছিল না, গ্যাসও ছিল না। সন্ধ্যায় সবাই একসঙ্গে বসত।’
ছেলে মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে বলল, ‘তখন ওয়াই-ফাই?’
বাবা বললেন, ‘পাশের বাড়ির মানুষ।’
ছেলে বুঝল না।
বাবা বললেন, ‘কারও বাড়িতে কী রান্না হচ্ছে, কে কার সঙ্গে ঝগড়া করছে, কে কাকে বিয়ে করছে—সব খবর পাওয়া যেত। পাসওয়ার্ড লাগত না।’
আমরা হাসব কিনা বুঝতে পারছি না। বাবা মজার কথা বলেছেন। আমাদের হাসা উচিত, আবার আমরা আছি তীব্র সংকটের ভেতর। হাসি এবং না-হাসির মাঝামাঝি আমাদের মুখ ভেংচি কাটার মতো হলো।
আমরা আশা নিয়ে বাঁচি। একদিন নিশ্চয় আবার আমাদের বিদ্যুৎ থাকবে। গ্যাসও থাকবে। সেদিন হয়তো আমাদের নাতি-নাতনিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করবে, ‘দাদু, তোমাদের সময় কি সত্যিই বিদ্যুৎ চলে যেত?’
আমরা গর্ব করে বলব, ‘যেত।’
‘গ্যাসও থাকত না?’
‘না।’
‘তাহলে তোমরা বাঁচতে কীভাবে?’
আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলব, ‘তখন আমরা খুব শক্ত মানুষ ছিলাম। লড়াই করে বেঁচেছি।’
রাতের রান্না তখনো হয়নি। ইলেকট্রিক কুকার আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ নেই। গ্যাসের চুলা আছে, কিন্তু গ্যাস নেই। মাইক্রোওভেন ওভেন আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ নেই।
আমাদের রান্নাঘরে আধুনিক সভ্যতার সব অর্জন দাঁড়িয়ে আছে, আর সবাই মিলে প্রমাণ করছে—বিদ্যুৎ না থাকলে তারা মূলত দামি আসবাব।
শেষ পর্যন্ত রুটি, কলা আর মিষ্টি দিয়ে রাতের খাবার হলো। রাত দশটার দিকে টুক করে বিদ্যুৎ এল। ফ্যান ঘুরল। বাতি জ্বলল। রাউটার জ্বলে উঠল। ছেলে মোবাইল হাতে নিল এমন আনন্দে, যেন বহুদিনের হারানো আত্মীয় ফিরে এসেছে। স্ত্রী রান্নাঘরে ছুটল। দশ মিনিট পর রান্নাঘর থেকে তার চিৎকার, ‘গ্যাস এখনো আসেনি!’
মনে মনে ভাবলাম, বিদ্যুৎ আর গ্যাসের মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো গোপন চুক্তি আছে। একজন এলে আরেকজন চলে যায়। কিংবা দুজন একসাথে আসে না।
কিছুক্ষণ পর স্ত্রী আবার চিৎকার করে উঠল, ‘গ্যাস এসেছে!’
আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। এবার বাড়ি শান্ত হবে। বাবা খুশি হলেন। তখন রান্নাঘর থেকে স্ত্রী চেঁচিয়ে জানাল, ‘পাশের বাসায় গ্যাস এসেছে।’
এই ঘটনা আমাদের ভয়ংকর বিপর্যয়ের ভেতর ফেলে দিল। এটা গ্যাস না থাকার চেয়েও বড় অপমান। বাবা তখন হারিকেন নিভিয়ে বললেন, ‘আমাদের সময় এসব নিয়ে এত চিন্তা ছিল না।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’
বাবা বললেন, ‘কারণ বিদ্যুৎ-গ্যাস থাকার অভ্যাসই ছিল না।’
চুপ করে গেলাম। সত্যিই তো। এখন বিদ্যুৎ আছে বলে বিদ্যুৎ নিয়ে চিন্তা করি, গ্যাস আছে বলে গ্যাস নিয়ে চিন্তা করি, ওয়াই-ফাই আছে বলে ওয়াই-ফাই নিয়ে চিন্তা করি। আর কিছুই না থাকলে হারিকেনের আলোয় বসে বুঝতে পারি—আমরা একসময় মানুষও ছিলাম। আমাদের একদা বিদ্যুৎ ও গ্যাস ছিল।
পরদিন সকালে ফ্যান ঘুরল, গ্যাসে চুলা জ্বলল, ওয়াই-ফাই চলল। সব স্বাভাবিক। শুধু বাবা হারিকেনটা আলমারিতে তুলে রাখতে রাখতে বললেন, ‘রেখে দে। আবার লাগবে।’
আমরা কেউ বাবার কথার প্রতিবাদ করিনি। আমরা জানি, আমাদের বিদ্যুৎ ও গ্যাস আছে। শুধু মাঝে মাঝে চলে যায়। তা ছাড়া আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, বাবার কথা অদ্ভুতভাবে সত্যি হয়।