ডিম সিন্ডিকেটে এআই (AI) বিপ্লব

এআই দিয়ে তৈরি কার্টুন

​মফিজ ভাই এলাকার কাঁচাবাজারের মুকুটহীন সম্রাট। বাজারে এমন কোনো জিনিস নেই যার দাম তিনি নিজের ইচ্ছেমতো বাড়াতে বা কমাতে পারেন না। তবে তাঁর বিশেষত্ব হচ্ছে ডিম আর কাঁচা মরিচ। তাঁর থিওরি খুব সিম্পল—‘আকাশে মেঘ ডাকলে মুরগির মন খারাপ হয়, তাই ডিমের দাম বাড়বে। আর রোদ উঠলে মুরগির গরম লাগে, তাই ডিমের দাম বাড়বে।’ মোটকথা, ব্রাজিল ফুটবল ম্যাচ হারলেও মফিজ ভাইয়ের গোডাউনে ডিমের দাম হালিপ্রতি দশ টাকা বেড়ে যায়।

​কিন্তু সম্প্রতি মফিজ ভাই কিছুটা হতাশ। তিনি বুঝতে পারছেন যে যুগ পাল্টেছে। মানুষ এখন কথায় কথায় ‘স্মার্ট’, ‘ডিজিটাল’ এসব বলে। তাই পুরোনো মান্ধাতা আমলের সিন্ডিকেট সিস্টেম বড্ড ব্যাকডেটেড লাগছে তাঁর কাছে।

​ঠিক এ সময়ই দৃশ্যপটে হাজির হলো মফিজ ভাইয়ের ভাগনে বল্টু। বল্টু পেশায় ফুলটাইম টিকটকার এবং পার্টটাইম ‘টেক-এক্সপার্ট’। পরনে গোড়ালি-কাটা প্যান্ট, চুলে গোল্ডেন কালার।

​বল্টু এসে বলল,

‘মামা, তুমি তো এখনো প্রস্তর যুগে পইড়া আছ। এখনকার দুনিয়া চলে এআই (AI) বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়া। তুমি চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) ইউজ করো, দেখবা তোমার ডিমের ব্যবসা রকেট হয়া গেছে!’

​বল্টু ল্যাপটপ খুলে বসল। ‘মামা, এইটা হইলো জাদুর চেরাগ। তুমি যা বলবা, সে বুদ্ধি বাইর কইরা দিবে। বলো, তোমার কী সমস্যা?’

​মফিজ ভাই পান চিবোতে চিবোতে বললেন, ‘তাইলে ওরে জিগা, এক রাইতের মইধ্যে ডিমের দাম হালি আশি ট্যাহা করুম ক্যামনে? একদম লেটেস্ট কোনো বুদ্ধি দিতে ক।’

​বল্টু ইংরেজিতে চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্নটা লিখে এন্টার দিল। কয়েক সেকেন্ড পর জিপিটি একগাদা ইংরেজি লিখে দিল।

​বল্টু অনুবাদ করে শোনাল, ‘মামা, এআই বলছে—প্রথমত, মার্কেটে আর্টিফিশিয়াল স্ক্যারসিটি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রোডাক্টের ‘রিব্র্যান্ডিং’ করতে হবে। মানে ডিমকে আর সাধারণ ডিম হিসেবে বেচা যাবে না, এর একটা ভিআইপি ভাব আনতে হবে।’

মফিজ ভাই আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন। ‘আরে সাবাস! এই জিপিটি তো দেখি আমার চাইয়াও বড় সিন্ডিকেটবাজ! তা রিব্র্যান্ডিং ক্যামনে করুম?’

​পরদিন সকালে মফিজ ভাইয়ের গোডাউনে রিব্র্যান্ডিং শুরু হলো। সাধারণ ফার্মের লাল ডিমের গায়ে গোল্ডেন কালারের স্টিকার লাগানো হলো—‘Premium Sonali VIP Egg - 24 Carat’। সঙ্গে একটা লাল ফিতা দিয়ে প্যাকেট করা হলো। ক্রেতারা এসে দাম শুনে ভিরমি খাওয়ার জোগাড়।

​মফিজ ভাই বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘ভাই, এইটা তো যে সে ডিম না। এইটা হইলো এআই-সার্টিফায়েড ডিম। এই মুরগি এসি রুমে বইসা মোজার্টের মিউজিক শুনতে শুনতে ডিম পাড়ছে। এর মধ্যে প্রোটিনের সাথে ভিটামিন-ডিজিটালও আছে। নিলে নেন, না নিলে রাস্তা মাপেন!’

​প্রথম ধাপে বেশ কিছু টাকা কামিয়ে মফিজ ভাই তো মহাখুশি। এবার তিনি গেলেন দ্বিতীয় ধাপে— কৃত্রিম সংকট!

​বল্টুকে ডেকে বললেন, ‘ভাগনে, তোর জিপিটিরে জিগা, এক লাখ ডিম আমি ক্যামনে হাওয়া কইরা দিমু? এমন জায়গায় লুকাইতে হইব যাতে ম্যাজিস্ট্রেট খুঁইজেই না পায়।’

​বল্টু আবার টাইপ করল। এআই বুদ্ধি দিল, ‘Supply Chain Re-routing: ডিমগুলো মূল শহরের বাইরে কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাময়িকভাবে সরিয়ে ফেলুন। যখন শহরে হাহাকার শুরু হবে, তখন চড়া দামে রিলিজ করবেন।’

​মফিজ ভাই ঠিক করলেন, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড়ের কাছে তাঁর শ্বশুরের এক পুরোনো গোডাউন আছে, সেখানে এক লাখ ডিম লুকিয়ে রাখবেন। রাতের অন্ধকারে বিশাল এক কাভার্ড ভ্যানে ডিম লোড করা হলো। মফিজ ভাই আর বল্টুও চললেন সেই ভ্যানে।

কিন্তু সিরাজগঞ্জের মহাসড়কে যে কিছুদিন ধরে খানাখন্দের সংস্কারকাজ চলছে, সেটা এআই বা চ্যাটজিপিটি জানত না!

ভোরবেলা কাভার্ড ভ্যান যখন হাইওয়ের ওপর দিয়ে প্রবলবেগে ছুটছে, হঠাৎ রাস্তায় বিশাল এক গর্ত! ধাড়াম!!!

কাভার্ড ভ্যান লাফিয়ে উঠে আছড়ে পড়ল। ভ্যানের ভেতর থেকে মড়মড়, ঠকাস, প্যাঁচাত করে অদ্ভুত সব শব্দ আসতে লাগল।

​মফিজ ভাই আর বল্টু দৌড়ে পেছনে গিয়ে ভ্যানের দরজা খুলতেই তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এক লাখ ডিম ভেঙে একাকার! পুরো কাভার্ড ভ্যান যেন একটা ভাসমান অমলেটের নদী হয়ে গেছে। হাইওয়ের রাস্তায় ডিমের কুসুম আর সাদা অংশ গড়িয়ে পড়ে এক বিশাল হলুদ নদী সৃষ্টি করেছে।

​মফিজ ভাই মাথায় হাত দিয়ে রাস্তায় বসে পড়লেন,

‘হায় হায়! আমার এক লাখ ডিমের সমাধি! ওরে বল্টু, জলদি তোর জিপিটিরে জিগা, এখন আমি কী করুম? এই ডিম ক্যামনে জোড়া লাগামু?’

​বল্টু কাঁপা কাঁপা হাতে ল্যাপটপ খুলে চ্যাটজিপিটিকে জানাল, ‘My 100,000 eggs are broken on the highway. What to do now?’

​এআই অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় উত্তর দিল, ‘Pivot your business model immediately. Since the eggs are already cracked, you cannot sell them as whole eggs. Start a massive street-food campaign. Sell them as “Giant Highway Omelets” or “Liquid Protein Shakes”.’

বল্টু অনুবাদ করে শোনানোর পর মফিজ ভাই রাগে নিজের চুল ছিঁড়তে লাগলেন। ‘ওরে হারামজাদা, জিপিটি! হাইওয়ের মইধ্যে আমি এখন ফ্রাইপ্যান নিয়া অমলেট ভাজুম? আর কাস্টমার কে? ওই যে রাস্তার কুত্তাডি খাড়ায় আছে?’

সত্যিই তা–ই! ডিমের গন্ধ পেয়ে আশপাশের কয়েক গ্রামের ডজন ডজন কুকুর এসে হাইওয়েতে ভিড় জমিয়েছে। তারা মনের আনন্দে কাঁচা ডিম চাটতে শুরু করেছে। কুকুরগুলোর মধ্যে রীতিমতো আনন্দ উৎসব চলছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে সাইরেন বাজিয়ে হাজির হলো মোবাইল কোর্টের গাড়ি। রাস্তায় ডিমের নদী দেখে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব চোখ কপালে তুললেন।

​‘এই মিয়া, রাস্তায় এই সব কী? হাইওয়ে কি তোমার বাবার অমলেট বানানোর কারখানা?’

​মফিজ ভাই কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন,

‘স্যার, বিশ্বাস করেন, আমি কিচ্ছু করি নাই! সব এই বল্টুর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কাম! জিপিটি আমারে বলছে সাপ্লাই চেইন রিরুট করতে, আমি তো খালি...’

​ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ধমক দিয়ে বললেন, ‘থামো তোমার জিপিটি! রাস্তায় যানজট তৈরি করা আর সিন্ডিকেট করে ডিম মজুত করার অপরাধে তোমার এক লাখ টাকা জরিমানা!’

জরিমানার স্লিপ হাতে নিয়ে মফিজ ভাই শূন্যদৃষ্টিতে বল্টুর দিকে তাকালেন। বল্টু ল্যাপটপটা বুকে জড়িয়ে ধরে ভয়ে কাঁপছে।

​পরদিন সকালে মফিজ ভাইয়ের গোডাউনে একটা নতুন সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেল:

‘বিশেষ বিজ্ঞপ্তি: এখানে চ্যাটজিপিটি, এআই বা কোনো প্রকার ডিজিটাল বুদ্ধি খাটানো সম্পূর্ণ নিষেধ। ডিমের দাম আমি নিজের ম্যানুয়াল বুদ্ধিতেই বাড়ামু। শুধু খাঁটি দেশি বাটপারি চলিবে।’