আমাকে ঘাঁটাবেন না

কার্টুন: সৌখিন

বেতন বাড়বে—খবরটা প্রথম জানলাম আমার ওয়ান অ্যান্ড অনলি শ্যালিকার কাছ থেকে।

ফোন করেই বলল, ‘দুলাভাই, পার্টি কবে দিচ্ছেন?’

পার্টি দেওয়ার জন্য যদিও পোক্ত কোনো কারণ লাগে না, তবু জানতে চাইলাম, ‘কিসের পার্টি?’

‘ন্যাকা সাজার চেষ্টা করবেন না। আপনি অভিনয়ে কাঁচা। বেতন বাড়ছে না আপনাদের!’

বললাম, ‘আমার বেতন বাড়ছে, অথচ খবরটা আমি জানি না! তুমি জানলে কীভাবে?’

‘কেন, ফেসবুক থেকে!’

আমি চুপ করে গেলাম। সরকারি আদেশের সঙ্গে তর্ক করা যায়, ফেসবুকের সঙ্গে যায় না।

শ্যালিকা বলল, ‘সরকারি চাকরির মজাই আলাদা। চাকরি যাওয়ার ভয় নেই, বছর বছর ইনক্রিমেন্ট, আবার যখন-তখন বেতন বাড়ে!’

‘যখন-তখন’ কথাটায় একটু আহত হলাম। আমার চাকরিজীবনে বেতনকে যখন-তখন বাড়তে দেখিনি। বরং বাজারদরকে দেখেছি।

বললাম, ‘সবই যখন জানো, কত বাড়ছে বলে দাও। আমার আর পেপার-পত্রিকা ঘাঁটতে হবে না।’

‘“অনেক” বলেই শুনছি।’

‘অনেক’ একটি সুন্দর পরিমাণ। এর কোনো অঙ্ক নেই, কিন্তু শুনতে ভালো লাগে।

‘তাহলে একটা কাজ করো। তোমার প্রবাসী জামাইকে বলে আমাকে হাজার পঞ্চাশেক টাকা ধার দাও। ক্রেডিট কার্ডের বিল দিতে হবে। বেতন বাড়লেই ফেরত দেব।’

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতার পর পলায়নপর কণ্ঠযস্বর, ‘দুলাভাই, পরে কথা বলি। চুলায় দুধ দিয়েছি।’

ফোন কেটে গেল। মানুষের কৌতূহল কমানোর জন্য ‘ধার’ বোধ হয় সবচেয়ে কার্যকর থেরাপি!

অফিসে গিয়ে দেখি পরিস্থিতি ‘পিথাগোরাসের উপপাদ্য’ মানে অতীব জটিল।

তরফদার সাহেব আমাকে দেখেই বললেন, ‘অভিনন্দন’!

আমি অবাক হওয়ার ভান করে বললাম, ‘লটারি জিতেছি, নাকি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছি?’

‘কেন, আপনার তো বেতন বাড়ছে!’

‘আপনার বাড়ছে না!’

‘আমার কথা বাদ দেন। আপনার কত বাড়ছে?’

বুঝলাম উনি ‘জাতীয় সৌজন্য’ দেখাচ্ছেন। নিজের কথা বাদ দিয়ে অন্যের বেতনের দিকে পূর্ণ মনোযোগ।

বললাম, ‘সত্যিই এসব জানি না।’

উনি তাতে উৎসাহ পেলেন, ‘বেসিক কত আপনার এখন?’

আমি তাঁর দিকে কিঞ্চিৎ শক্ত চোখে তাকালাম, ‘আপনারটা যেন কত?’

‘বেতন গোপন জিনিস। বউয়ের থেকেও লুকাতে হয়। এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম’— তরফদার সাহেব আহত হলেন এবং কেটে পড়ে আমাকে রক্ষা করলেন।

দুপুরে ক্যানটিনে খবরের আরও উন্নতি হলো।

ক্যানটিন বয় জামাল হলদেটে দাঁত বের করে বলল, ‘শুনলাম এবার ভালোই বাড়ছে। সরকারি চাকরির মজাই আলাদা!’

পাশের টেবিল থেকে একজন বললেন, ‘এবার একটা নতুন গাড়ি নিতে পারেন।’

তার পাশের জন বললেন, ‘গাড়ি বাদ দেন। ফ্ল্যাট নেন।’

দূর থেকে একজন প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, ‘আমি হলে জমি নিতাম। লাভে লাভ।’

আমি খাওয়া থামিয়ে তাঁদের দিকে তাকালাম। যে টাকা এখনো পাইনি, তা দিয়ে পাঁচ মিনিটে গাড়ি, ফ্ল্যাট এবং জমি কেনা হয়ে গেছে। আর দশ মিনিট বসলে হয়তো মালদ্বীপে একটা রিসোর্টও হয়ে যেত!

সন্ধ্যায় এক আত্মীয় ফোন দিলেন, ‘নতুন স্কেলে কত বাড়ল, ভাই?’

‘এখনো মেপে দেখিনি, ভাই।’

‘ধরেন চল্লিশ পারসেন্ট বাড়লে মোট কত হবে?’

আমি বিরক্ত হলাম না। বিনা পারিশ্রমিকে কেউ যখন হিসাবরক্ষকের দায়িত্ব নিচ্ছে, তাকে অসম্মান করা ঠিক হবে না।

বললাম, ‘হিসাবটা পরে করেন। তার আগে হাজার বিশেক টাকা ধার দেন।’

ওপাশে নীরবতা।

পরদিন থেকে আমি কৌশলটা পাকাপাকি করে ফেললাম।

কেউ ‘কত বাড়ছে?’ জিজ্ঞেস করলেই ‘আপাতত কিছু টাকা ধার দেন, বর্ধিত বেতন পেয়ে শোধ করে দেব’ বলে মনে মনে মিচকি হাসি দিই।

বিশ্বাস করুন, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও গোপনীয়তা সুরক্ষায় এর চেয়ে কার্যকর বিধান এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

অতএব, আমাকে ঘাঁটানো থেকে বিরত থাকুন।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন