সেতু পেয়ে স্বপ্ন বড় হয়েছে নারী উদ্যোক্তাদের

পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের পথে ‘ওই পারের’ নারী উদ্যোক্তাদের অদৃশ্য বাধা ছিল পদ্মা। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর সেই বাধা কাটল। উদ্যোক্তাদের স্বপ্নের পরিধিও বেড়েছে। শরীয়তপুর ও মাগুরার পাঁচ উদ্যোক্তার কথা শুনেছেন নাজনীন আখতার

ফেব্রুয়ারির ঘটনা। মাদারীপুরের এক ক্রেতার কাছ থেকে অর্ডার পেয়েছেন শরীয়তপুরের উদ্যোক্তা নুর-ই-নাজমীন। শর্ত ছিল জরুরি ভিত্তিতে পণ্যগুলো সরবরাহ করতে হবে। শর্ত অনুযায়ী তিনিও তৎপর ছিলেন। ঢাকা থেকে অর্ডারের কাঁসার সামগ্রী নিয়ে দ্রুতই পথে নেমেছিলেন তিনি। কিন্তু সেদিন শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে প্রচণ্ড জট লেগেছিল। ফেরিও ছিল অপর্যাপ্ত। ফেরিতে কখন পার হবেন, ক্রেতাকে কখন পণ্য পৌঁছে দেবেন—এসব ভেবে অস্থির হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর সেই অস্থিরতার অবসান হয় ৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পর ফেরিতে উঠে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন সেই অভিজ্ঞতার কথাই প্রথম আলোকে জানালেন নুর-ই-নাজমীন।

‘ঐতিহ্য’ ও ‘সাজবাহার’ নামে নাজমীনের দুটি অনলাইনভিত্তিক উদ্যোগ আছে। পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক অনলাইন বিপণন স্থান ‘উই’–এও পণ্য বিক্রি করেন। তিনি কাঁসার জিনিসপত্র, বাড়িতে তৈরি ঘি, শর্ষের তেল, চুলের হারবাল তেল ও পোশাক বিক্রি করে থাকেন। ঢাকার কারিগরদের দিয়ে কাঁসার জিনিস বানিয়ে শরীয়তপুরে নিয়ে যান। বিক্রি করেন দেশের বিভিন্ন জায়গায়। ফেরিতে পারাপার বিষয়ে নাজমীন বললেন, ‘মালপত্র নিয়ে কী পরিমাণ ভোগান্তি যে হয়েছিল সেদিন। অবশ্য এমন অভিজ্ঞতা অহরহই হতো। নোংরা টয়লেটের কথা আর কী বলব! কত দিন যে টয়লেট চেপে রাখতে হয়েছে। ফেরির কারণে অনেক সময় শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় পণ্য সরবরাহ করতেও দেরি হয়েছে। পদ্মা সেতু হওয়ায় এসব দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পাব।’

রাজধানীর কিশোয়া তাবাচ্ছুম ও আফরোজা খান ২৬ জুন মোটরবাইকে পাড়ি দেন পদ্মা সেতু। অনেক নারীর স্বপ্ন–দুয়ার খুলে দিয়েছে এই সেতু
ছবি: প্রথম আলো

ঢাকার সঙ্গে ১৯ জেলার যোগাযোগব্যবস্থায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনছে পদ্মা সেতু। জেলাগুলো হলো—খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, বরিশাল, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও রাজবাড়ী। অর্থনীতির চাকা বেগবান করবে সহজ যোগাযোগ। তাই এই সেতু ঘিরে নাজমীনদের অনেক স্বপ্ন। সুখের দিনে দুর্ভোগের সময়ের কিছু স্মৃতিচারণ করে ‘ওই পারের’ নারী উদ্যোক্তারা পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি আরও বাড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন।

‘এখন দিনে দিনে ফিরে আসব’

২০২০ সালে কুয়াশার কারণে একবার লঞ্চে আটকা পড়েছিলেন ফারজানা তাবাসসুম। ২২ ঘণ্টা পর তিনি শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় পৌঁছেছিলেন। শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায় ‘আমার পণ্য’ নামে তাঁর একটি প্রতিষ্ঠান আছে। পাটের পণ্য, সুতার গয়না, নকশিকাঁথা এবং শীতের সময় ঘি ও মধু বিক্রি করেন ফারজানা। গয়নার জন্য পাইকারি দরে সুতা, কড়ি ও পুঁতি কেনেন রাজধানী ঢাকার শনির আখড়া ও গাউছিয়া থেকে। বললেন, ‘যাতায়াতের অসুবিধার কারণে সুতা বা কড়ির মতো কোনো একটি উপাদান শেষ হয়ে গেলে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হতো। এখন তো ঢাকায় গিয়ে দিনে দিনেই ফিরে আসতে পারব।’ তিনি জানালেন, সবচেয়ে বেশি সুবিধা হবে পণ্য সরবরাহে। কয়েকটি অভিজ্ঞতার বর্ণনা করে বলেন, ‘গাজীপুরে একবার তিন দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহের কথা ছিল। ফেরির কারণে ছয় দিন লেগে যায়। একবার ক্রেতা জানাল, ঘি উল্টে বেশির ভাগই পড়ে গেছে। লোকসান গুনতে হয়েছিল আমার। কিন্তু অল্প সময়ে পণ্য পৌঁছালে এই ক্ষতিপূরণ আমাকে দিতে হতো না।’

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ‘ওড়িন’স কালেকশন’–এর উদ্যোক্তা দোলনা আক্তার এবং ‘ভিলেজ ফুড উইথ সায়মা’–এর উদ্যোক্তা কাকন আক্তারও জানালেন, সেতু তাঁদের পণ্য সরবরাহ আরও সহজ করবে। দোলনা আক্তার বললেন, এখন থেকে ঢাকায় গজ কাপড় কিনতে গিয়ে ফেরির কারণে সকালের জায়গায় সন্ধ্যায় পৌঁছাতে হবে না। তিনি তৈরি পোশাক ও খেস শাড়ি বিক্রি করেন। সেতু হওয়ায় ব্যবসা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন।

কাকন আক্তার বললেন, ‘ঢাকায় যেসব পণ্য সরবরাহ করতে হবে, সেগুলো এখন আমি নিজেই করতে পারব। এতে কুরিয়ারের জন্য যে টাকা খরচ হয়, সেটি বেঁচে যাবে। অনেক সময় তাড়াতাড়ি পণ্য সরবরাহের জন্য কুরিয়ার সার্ভিসকে বারবার তাগাদা দিতে হয়। সেই ঝক্কিও কমবে।’ তিনি নকশিকাঁথা, মাটির শোপিস, নারকেলের নাড়ু ও ঘি বিক্রি করেন।

নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য অনলাইনে কেনাবেচার প্ল্যাটফর্ম ‘হার ই ট্রেড’–এর সদস্য শাহিন সুলতানা। তিনি মাগুরায় শহরের কলেজপাড়া এলাকা থেকে ‘পৃথ্বীজ’ নামের উদ্যোগটি পরিচালনা করেন। তাঁর বেশির ভাগ পণ্য যায় ঢাকা, বরিশাল ও যশোরে। শাড়ি, পাঞ্জাবি ও বেল্ট পদ্ধতির পেটিকোট বিক্রি করেন। শাড়ির জন্য নকশিকাঁথার পাড় পাইকারি দরে বিক্রি করেন। শাহিন বললেন, পদ্মা সেতু হওয়ায় তিন দিনের জায়গায় এক দিনে এখন ঢাকায় পণ্য সরবরাহ করা যাবে। তিনি জানান, একবার এক অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী তিনটি শাড়ি ও কয়েকটি পেটিকোট অর্ডার করেছিলেন। কুরিয়ার সার্ভিস রাজিও হয়েছিল। কিন্তু যাতায়াতের সমস্যার কারণে ক্রেতা বাসা থেকে এয়ারপোর্টে যাওয়ার কিছু সময় আগে পণ্য পৌঁছাতে পেরেছিলেন।

তৈরি হবে নতুন উদ্যোক্তা

পদ্মা সেতু হওয়ার কারণে নতুন আরও নারী উদ্যোক্তা তৈরি হবেন বলে মনে করেন কমিউনিটিভিত্তিক অনলাইন বিপণন স্থান ‘উই’–এর সভাপতি নাসিমা আক্তার। উইয়ের মোট সদস্য ১৩ লাখ। যার ৮০ শতাংশই নারী। খুলনা ও বরিশাল বিভাগে উই–এর নারী উদ্যোক্তা সদস্য রয়েছেন ৬৭ হাজার ৪৯৯ জন।

নাসিমা আক্তার বলেন, সেতুর কারণে ওই অঞ্চলের ব্যবসার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। অনলাইনে পণ্য কেনাবেচার জন্য সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেতুর কারণে পণ্য দ্রুত সরবরাহ করা যাবে। এতে ক্রেতার আস্থা অর্জন করা যাবে। তিনি আরও বলেন, অনেক নারী উদ্যোক্তা অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ খাবার তৈরিতে আগ্রহী হলেও, শুধু যাতায়াতের সুবিধা ছিল না বলে ব্যবসা করা থেকে পিছিয়ে যেতেন। খুলনা ও যশোর এলাকার চুইঝালে তৈরি খাবারের চাহিদা রয়েছে। অনেকে মাটির চুলার রান্না খেতে চান। দিনে দিনে পৌঁছানো যাবে বলে, এ ধরনের তৈরি খাবার বিক্রির নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়বে।