খেলোয়াড় তৈরি করতে সারা দেশ চষে বেড়ান তিনি
ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের নিয়ে একটা রাগবি দল গড়তে চেয়েছিলেন শারমিন ফারহানা চৌধুরী। বাংলাদেশে খেলাটি মোটেও জনপ্রিয় নয়। গ্রামের লোকজনের কাছে তো আরও অপরিচিত। এহেন একটা খেলার জন্য মেয়েদের নিয়ে দল! ফল যা হওয়ার তা–ই হয়েছিল। কিশোরীরা কিছুটা আগ্রহী হলেও পরিবারগুলো রাজি হলো না। শেষ পর্যন্ত গ্রামের চেয়ারম্যান, স্কুলশিক্ষকদের চেষ্টায় উঠান বৈঠক করে বাবা-মায়েদের রাজি করানো গেল। আর এভাবেই ২০১৭ সালের অক্টোবরে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার বেতাগা ইউনিয়নের ৩৭ জন মেয়েকে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হলো একটা রাগবি দল।
২০২০ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় মহিলা রাগবি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় এই দল। দলটি গড়ে তুলেছিল স্পোর্টস ফর হোপ অ্যান্ড ইনডিপেনডেন্স (শি)। খেলাধুলার মাধ্যমে প্রান্তিক শিশু, পথশিশু ও প্রতিবন্ধী মানুষদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে কাজ করে এই সংগঠন। তারা বিশ্বাস করে, নিয়মিত খেলাধুলায় অংশগ্রহণকারী মেয়েরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। অভিভাবকেরাও মেয়েদের বাল্যবিবাহ দেওয়ার পরিবর্তে মাঠে পাঠাতে উৎসাহিত হন। ফুটবল ও ভলিবল, মূলত এই দুটি খেলাকে মেয়েদের দলগত কার্যক্রমের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে শি।
২০১৬ সালে নিজের অর্থে সংগঠন শুরু করেন ঢাকার শারমিন ফারহানা চৌধুরী। ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, গাইবান্ধা, শ্রীমঙ্গলসহ সারা দেশে এখন ছড়িয়ে পড়েছে শির কার্যক্রম। ২০২৪ সালে সংগঠনটি ৪ হাজার ৭৯৩ জন মেয়ে ও ৮৯৬ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ক্রীড়া কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করেছে। দেশি-বিদেশি অনেক সংস্থা এখন সংগঠনটির সঙ্গে অংশীদার হয়ে আয়োজন করছে প্রতিযোগিতা। সবশেষ এই সংগঠনের উদ্যোগে প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে বাইরে থেকে পদক জিতে এনেছে চৈতী রানী দেব। শ্রীমঙ্গলের ৩ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার কিশোরী গত ডিসেম্বরে এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে স্বর্ণপদক জিতেছে। এর আগে ২০২৩ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান ওপেন প্যারা অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জেতেন শির প্রশিক্ষণ পাওয়া রাজীব হাসান। আন্তর্জাতিক প্যারা গেমসে সেটাই ছিল বাংলাদেশের প্রথম কোনো পদক জয়।
শারমিনের কাজের অনুপ্রেরণা তাঁর বাবা ব্যবসায়ী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শাহাবুদ্দিন আহমেদ এবং সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালেরি অ্যান টেইলর। সাভারে সিআরপির জমির একটি অংশ তাঁর বাবার দেওয়া। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নিজেও দীর্ঘদিন সিআরপিতে কাজ করেছেন শারমিন। কাজ করতে গিয়ে ধাক্কা খান, কিন্তু দমে যান না, আবার দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন শারমিন। যেমন কোভিড শুরু হওয়ার পর মেয়েদের সেই রাগবি দলটি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। স্কুল বন্ধ হয়ে যায়, কয়েক মাসের মধ্যে পাঁচজন খেলোয়াড়ের বিয়ে হয়ে যায়, যার মধ্যে আবার চারটিই ছিল বাল্যবিবাহ। বাকি খেলোয়াড়েরাও একটু বড় হয়ে যাওয়ার পর পরিবারগুলো আর খেলতে দিতে রাজি হয়নি। এরপরও থেমে যাননি তিনি।
২০২৪ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত হোমলেস ওয়ার্ল্ডকাপে অংশ নেওয়া ‘বাংলাদেশ হোমলেস টিম’-এরও পৃষ্ঠপোষক ছিল শি। নির্ধারিত সময়ে ভিসা না হওয়ায় মূল পর্বে খেলতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, হাঙ্গেরি, নামিবিয়ার সঙ্গে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেছে। নামিবিয়ার সঙ্গে টাইব্রেকারে হারা ছাড়া বাকি সাতটিতেই জেতে বাংলাদেশ। হোমলেস ওয়ার্ল্ডকাপে অংশ নেওয়া প্রেন চং ম্রো এখন ফুটসাল জাতীয় দলের খেলোয়াড়। শির দুজন খেলোয়াড় আরিফ বিল্লাহ ও খাইরুল আলম এখন জাতীয় রাগবি দলের খেলোয়াড়।
শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়, স্কুল, চা-বাগান কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারি গড়ে তুলে ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনা করছে শি। শ্রীমঙ্গলে সংগঠনের একটি খেলাধুলার সেন্টার রয়েছে। মাটি, সার ও বীজ দিয়ে তৈরি বল হাতে শিশুরা শেখে কীভাবে গাছ লাগাতে হয়, পরিবেশ রক্ষা করতে হয়। খেলার ছলে শেখানো হয় পরিবেশশিক্ষা।
২০২৫ সালে শি এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি বাংলাদেশে প্রথম অ্যাম্পুটি ফুটবল লিগ আয়োজন করে। ফারহানা শারমিনের সঙ্গে ৫ মার্চ যখন কথা হচ্ছিল, তখন বান্দরবানে অ্যাম্পুটি ফুটবল নিয়েই কাজ করছিলেন তিনি। এশিয়ার প্রথম মহিলা ও জুনিয়র অ্যাম্পুটি ফুটবল দল গঠন করেছেন তাঁরা। সেই দলের ৯ বছরের শিশু জয়শ্রী তঞ্চঙ্গ্যার সঙ্গে ছবি পাঠিয়ে বললেন, ‘এই মেয়েটার জন্মগতভাবে একটি পা নেই। কিন্তু ওর ফুটবল খেলা দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবে। এই মেয়েকে আমি জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাব।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ফারহানা শারমিন বলেন, ‘খেলাধুলা নিয়ে যতটুকু এগোনো যায়, এগোব। দেশের পতাকা বিশ্বের দরবারে নিয়ে যাব। শিশুদের পড়াশোনা করতে হবে। তার সঙ্গে খেলাধুলা করাকেও বাধ্যতামূলক করতে হবে।’