প্যারাসিটামল নিয়ে যা জানা উচিত

জ্বর বা ব্যথার প্রথম ও প্রধান সমাধান হলো প্যারাসিটামলছবি: পেক্সেলস

দৈনন্দিন জীবনে জ্বর বা ব্যথার প্রথম ও প্রধান সমাধান হলো প্যারাসিটামল। হাতের নাগালে পাওয়া যায় এবং দামেও সস্তা হওয়ায় অনেকে প্রায়ই এই ওষুধ সেবন করে থাকেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি একটি নিরাপদ ওষুধ এবং ‘ওভার দ্য কাউন্টার’(চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কেনা যায়) ওষুধ হিসেবে স্বীকৃত। তবে প্যারাসিটামলের অতিব্যবহার তৈরি করতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি।

প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

  • প্যারাসিটামল নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি হলো, ‘এটি যত খুশি খাওয়া যায়, এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।’ আসলে যেকোনো ওষুধের মতোই এর নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, বেশি মাত্রায় বা ঘন ঘন ওষুধ খেলে জ্বর দ্রুত কমবে। এটি সম্পূর্ণ ভুল। মাত্রাতিরিক্ত প্যারাসিটামল আমাদের লিভারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং স্থায়ীভাবে লিভারের ক্ষতি করতে পারে।

  • আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, খালি পেটে প্যারাসিটামল খাওয়া যায় না।

  • প্যারাসিটামল খালি পেটে খাওয়া যায় এবং তাতে এর কার্যকারিতার কোনো তারতম্য হয় না। তবে যাঁদের দীর্ঘদিনের গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের সমস্যা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ভরা পেটে খাওয়া নিরাপদ।

  • ‘প্যারাসিটামল খেলে সঙ্গে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেতে হয়’ এটাও আরেকটা ভুল ধারণা। প্যারাসিটামল সাধারণত গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটি করে না, যা ব্যথানাশক অন্য ওষুধগুলো করতে পারে।

যেসব ওষুধ প্যারাসিটামলের সঙ্গে খাওয়া বিপজ্জনক

১. রক্ত পাতলা করার ওষুধ

যাঁরা নিয়মিত রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা ‘ব্লাড থিনার’ খান, তাঁরা দীর্ঘদিন উচ্চমাত্রায় প্যারাসিটামল খেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এটি ওষুধের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে।

২. অন্যান্য প্যারাসিটামলযুক্ত ওষুধ

অনেক সময় আমরা সর্দি-কাশি বা ব্যথার জন্য আলাদা আলাদা ওষুধ খাই। এই সব কটির মধ্যেই প্যারাসিটামল থাকতে পারে। অজান্তে একাধিক ওষুধ খেলে শরীরে প্যারাসিটামলের মাত্রা বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায়, যাকে ‘হিডেন ওভারডোজ’ বলা হয়।

৩. খিঁচুনি বা মৃগীরোগের ওষুধ

মৃগীরোগের কিছু ওষুধ (যেমন কার্বামাজেপিন, ফেনাইটোইন, ফেনোবারবিটল) লিভারের এনজাইম বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে প্যারাসিটামল শরীরে বিষাক্ত উপাদান তৈরি করতে পারে, যা লিভারের কোষ ধ্বংস করে।

৪. যক্ষ্মার কিছু ওষুধ

যক্ষ্মার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ (যেমন আইসোনিয়াজিড) প্যারাসিটামলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে লিভারের ক্ষতি করতে পারে। যক্ষ্মার চিকিৎসা চলাকালীন যেকোনো ব্যথানাশক খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

৫. অ্যালকোহল

এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক সংমিশ্রণ। নিয়মিত অ্যালকোহল যাঁরা পান করেন, এমন ব্যক্তিরা প্যারাসিটামল খেলে লিভার বিকল হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ, অ্যালকোহল ও প্যারাসিটামল—উভয়ই লিভারে বিপাক হয়, যা লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

সঠিক নিয়ম ও প্রতিকার

১. মাত্রাজ্ঞান: একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৬ গ্রাম খেতে পারেন। তবে টানা দুই দিনের বেশি জ্বর থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
২. শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্কতা: শিশুদের ক্ষেত্রে ওজন অনুযায়ী ডোজ নির্ধারণ করা হয়। আন্দাজে বড়দের বড়ি ভেঙে শিশুদের খাওয়ানো অত্যন্ত বিপজ্জনক।
৩. জ্বর মাপুন: শরীরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে থাকলে ওষুধ না খেয়ে জলপট্টি দেওয়া, তোয়ালে বা গামছা হালকা ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে শরীর মুছে দেওয়া কিংবা বিশ্রাম নেওয়াই শ্রেয়। শরীরকে তার প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে।

শেষ কথা

প্যারাসিটামল জীবনদায়ী হতে পারে, যদি তা সঠিক নিয়মে ব্যবহার করা হয়। মাথাব্যথা বা সামান্য গা ব্যথায় হুটহাট ওষুধ না খেয়ে পর্যাপ্ত পানি পান এবং বিশ্রাম নিন। মনে রাখবেন, সচেতনতাই সুস্থ থাকার চাবিকাঠি।

সোর্স: হেলথ ডিরেক্ট, ড্রাগস ডটকম

আরও পড়ুন