ট্রাভেল ভ্লগার সালাউদ্দীন সুমনের প্রিয় বেড়ানোর জায়গা রাজশাহীর এই চর
কোনো কোনো স্থানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগত গল্প। সেখানে প্রথম যাওয়ার দিনটা মনে থাকে আজীবন। বারবার জায়গাটায় ফিরে যেতে চায় মন। ‘ফিরে ফিরে যাই’-তে প্রিয় ভ্রমণস্থানের গল্প বলবেন নানা ক্ষেত্রের বিখ্যাত ব্যক্তিরা। এবার বলেছেন ট্রাভেল ভ্লগার সালাউদ্দীন সুমন, শুনছেন সজীব মিয়া
প্রিয় বেড়ানোর জায়গা
আমার প্রিয় বেড়ানোর জায়গা রাজশাহীর চরখানপুর। সীমান্তঘেঁষা এই গ্রামের তিন দিকেই ভারত। কখনো কখনো সেখানে যেতে ভারতীয় অংশের নদীপথ ঘুরে ঢুকতে হয়। ভৌগোলিক এই অদ্ভুত অবস্থানই চরখানপুরকে অন্য রকম করে তুলেছে।
প্রথম যাওয়া
প্রথমবার এই চরে গিয়েছিলাম ২০০৯ সালের দিকে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায়। এরপর যাওয়া হয়েছে বহুবার। হিসাব করলে ২০ বার তো হবেই। চরটি আমার কাছে প্রতিবারই নতুন লাগে—গ্রীষ্মে একরকম, বর্ষায় আরেক রূপ। কোথাও সবুজ ফসলের খেত, কোথাও পাখির কলতান, চারদিকে নদীকেন্দ্রিক জীবন—সব মিলিয়ে জায়গাটা আমাকে টানে। সাংবাদিকতা করার সময় চরখানপুর নিয়ে একটি প্রতিবেদনও করেছিলাম।
সেই চরের কিছু মানুষ আমার খুব প্রিয় হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে আজিজুল নামের একজন, যাঁকে আমি ‘আজিজুল ভাই’ ডাকি, তাঁর সঙ্গে সম্পর্কটা যেন আত্মার। বছরের মধ্যে দু-তিনবার শুধু তাঁর সঙ্গে দেখা করতেই সেখানে গিয়েছি।
স্মরণীয় অভিজ্ঞতা
চরখানপুরে বর্ষাকালে চরে যাওয়া সুবিধাজনক, নৌকায় সরাসরি পৌঁছানো যায়। গ্রীষ্মে গেলে কিছু পথ নৌকায়, তারপর চার-পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়। তবে বর্ষায় নদী ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। ২০২২ সালে যেমন হয়েছিল, নদী ছিল প্রচণ্ড উত্তাল। যাব কি যাব না, ভাবছিলাম। কিন্তু আজিজুল ভাইয়ের বাসায় আমার জন্য রান্না হয়েছিল নদীর টাটকা মাছ, মাষকলাইয়ের ডাল, বেগুন দিয়ে ছোট মাছের তরকারি। খাবারের লোভের চেয়েও বড় ছিল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার আকাঙ্ক্ষা। ঝুঁকি নিয়েই রওনা দিলাম। নৌকা মাঝনদীতে পড়তেই প্রবল ঢেউ। কয়েক মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, আজ বুঝি সলিলেই সমাধি হবে। আগের দিনই নৌকাডুবিতে পাঁচ-ছয়জন মারা গিয়েছিলেন। সেই ভয় নিয়েই পার হয়েছি। এখনো সেই দিনের ভিডিও আছে, দেখলে বোঝা যায়, কতটা ভয়ংকর ছিল নদীটা। জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
দিনে দিনে পরিবর্তন
২০০৯ সালে যখন প্রথম যাই, চরখিদিরপুর ও চরখানপুর মিলিয়ে বড় এলাকা ছিল। সরকারি হাসপাতাল, ভবন, বাড়িঘর—সবই ছিল। কিন্তু ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেখেছি, প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন একটিমাত্র ছোট্ট গ্রাম টিকে আছে।
নদী কীভাবে একটি জনপদকে ধীরে ধীরে গিলে ফেলে, নিজের চোখে দেখেছি। এটি শুধু ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়, মানুষের জীবন, স্মৃতি, স্বপ্নেরও বিলীন হয়ে যাওয়া।
আবার কবে যাবেন
অনেকে বলতে পারেন, এটা কি ঘোরার জায়গা? পৃথিবীর কত দেশ ঘুরেছি, কত সুন্দর জায়গা দেখেছি। তবু বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত চর কেন এত প্রিয়, আমি নিজেও জানি না। হয়তো মানুষ টানে, হয়তো টানে নদী, হয়তো–বা স্মৃতি।
কিছুদিন যাওয়া হয় না। হয়তো শিগগিরই যাব।