অবসর নেওয়ার পর কি নিজেকে গুরুত্বহীন মনে হচ্ছে
দীর্ঘ ৩৩ বছর দেশের নামকরা একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেছেন রাবেয়া নাসরিন (ছদ্মনাম)। কাজের প্রয়োজনে ছুটে গেছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। ফলে সংসার বা সন্তানের সঙ্গে সেই অর্থে সময় কাটাতে পারেননি।
একটা সময় গিয়ে রাবেয়ার মনে হলো, অনেক ছুটেছেন; এবার একটু বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো প্রয়োজন। এ ভাবনা মাথায় আসার পর স্বেচ্ছায় অবসরের জন্য আবেদন করেন। রাবেয়া ভেবেছিলেন, সারা জীবন কাজ করেছেন, এখন মন দিয়ে সংসার করবেন। স্বামী-সন্তানের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটাবেন, ঘুরে বেড়াবেন।
কিন্তু অবসরজীবনে এসে দেখলেন, ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক। রাবেয়ার ২১ বছর বয়সী ছেলে, যিনি জন্মের পর থেকে কখনো মাকে বাড়িতে বসে থাকতে দেখেননি, তিনি নিজের মতো জীবন গুছিয়ে নিয়েছেন। তাঁর প্রাত্যহিক রুটিনে কোথাও মা নেই! এমনকি স্বামীর জীবনও চলছিল আগের মতোই। রাবেয়া যে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা ভেবে স্বেচ্ছায় অবসর নিলেন, সেই পরিবারে আসলে তাঁকে সেই অর্থে আর দরকারই নেই।
রাবেয়া বলছিলেন, ‘সকালে ছেলের বাবা আমার জন্য নাশতা রেডি করে যাচ্ছে, আমার ছেলেও সন্ধ্যায় একসঙ্গে বসে চা খাচ্ছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, যেমন চাইছি, তেমন পাচ্ছি না। আমার সঙ্গে ওদের একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে, যেটা এত দিন বুঝিনি। প্রতিদিন সকালে অফিসে বের হয়ে গিয়েছি, সন্ধ্যায় ফিরেছি। ফোন করে সব কাজের নির্দেশনা দিয়েছি। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার জন্য যখন বাসায় ফিরলাম, বুঝলাম, আমাকে আসলে ২৪ ঘণ্টার জন্য প্রয়োজন নেই!’ এমনকি আত্মীয়স্বজনও আগের মতো সময় বা গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে মনে করেন রাবেয়া।
রাবেয়া বলেন, ‘যে ননদ আগে সারা সপ্তাহ বসে থাকত—কখন ভাবি ফোন করবে এই আশায়। এখন সময় না কাটলে তাকে ফোন করলে শুনতে হয় সে ব্যস্ত, পরে কথা বলবে। কেন? ওরা ভেবেছে, আমি চাকরি করি না বলে আগের মতো উপহার দিতে পারব না, জন্মদিন উদ্যাপন করতে পারব না? সে জন্য আমাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না? আগে তো সব কথায় আমার পরামর্শ লাগত, এখন আমার সঙ্গে কথা বলারও সময় নেই? অবসরে গিয়েছি বলে আমি কি অবহেলার পাত্র হয়ে গিয়েছি?’
বেশ ক্ষোভ আর কষ্টের সঙ্গে কথাগুলো বললেন রাবেয়া।
রাবেয়া এ সংকটের বিষয়টি বুঝতে মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি বলেন, পরিবারের সঙ্গে দূরত্বের এ সমস্যায় অবসরে যাওয়া বেশির ভাগ মানুষই পড়েন। এ সমস্যার সমাধান চাইলে অবসরের আগেই কিছু পরিকল্পনা করে রাখতে হবে। আর্থিক প্রস্তুতির পাশাপাশি মানসিকভাবেও প্রস্তুত থাকতে হবে। চাকরিরত মানুষের একধরনের ক্ষমতা থাকে, ক্ষমতা প্রয়োগের জায়গা থাকে, যেটা অবসরের পর না থাকায় দিশাহারা হয়ে পড়েন কর্মজীবী মানুষ। ডা. সরকার বলেন, এই যে পরিবর্তন, এটা মেনে নিতে হবে। বুঝতে হবে যে আগের মতো ব্যস্ততা থাকবে না, নতুন যে জীবন সেটাকে সাদরে গ্রহণ করতে হবে।
প্রথমত, যিনি অবসরে যাবেন, তাঁকে আগে থেকেই ঠিক করতে হবে, অবসরে কী করতে চান তিনি। কেউ কথা না শুনলে বা বসে দুদণ্ড গল্প না করলে এটা ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই যে তিনি মূল্যহীন। তাঁকে বুঝতে হবে, তিনি অবসরে গেলেও পরিবারের অন্যদের তো কাজ আছে। তাঁরাও ব্যস্ত। নানা কাজে বা ভাবনায় নিজেকেও কিছুটা ব্যস্ত রাখতে হবে। কে কী নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন, সে পরিকল্পনাও আগেই করে ফেলতে হবে।
ডা. মেখলা পরামর্শ দেন, অবসরজীবন আর কর্মজীবনের মধ্যে যে পার্থক্য, সেটির সঙ্গে যে যত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারবেন, তিনি তত ভালো থাকবেন। আবার এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের বিশেষ দায়িত্ব আছে বলে মনে করেন তিনি। এই মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ মনে করেন, পরিবারের কোনো সদস্য অবসরজীবন যাপন শুরু করলে অন্যদের উচিত তাঁর কথা মন দিয়ে শোনা, তাঁর কথার গুরুত্ব দিতে চেষ্টা করা। পরিবারের ছোটখাটো বিষয়েও সেই মানুষটির মত নেওয়ার চেষ্টা করুন। সে অনুযায়ী কাজ করুন বা না করুন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করুন। এতে তাঁরা নিজেদের গুরুত্বহীন ভাববেন না। নিজেদের অবহেলিতও মনে করবেন না।
প্রায় একই কথা বলছিলেন সদ্য অবসরে যাওয়া রাবেয়া। ‘যে পরিবারের জন্য এত বড় সিদ্ধান্ত নিলাম, তাঁদের কি উচিত ছিল না ছোট ছোট বিষয়ে হলেও আমার মতামত নেওয়া? হ্যাঁ, এটা ঠিক যে গত ৩৩ বছর আমি এসব ছোট বিষয়ে নাক গলাইনি। কিন্তু এখন তো আমি বাড়িতে আছি, ওদের চোখের সামনেই আছি।’
রাবেয়া মনে করেন, কর্মক্ষেত্রগুলোরও উচিত অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের মাঝেমধ্যে খোঁজ নেওয়া। বছরের শুরুতে ক্যালেন্ডার বা ছোটখাটো কিছু স্যুভেনির পাঠানো। যাতে অবসরে যাওয়ার পরও নিজেদের একেবারে গুরুত্বহীন মনে না হয়।
দীর্ঘদিন চাকরি করার পর অবসরে যাওয়া, বাড়িতে বসে থাকা, প্রতিদিনকার রুটিনে ছন্দপতন মেনে নেওয়া যে কারও জন্য কঠিন। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবারের সদস্যদের যেমন ভূমিকা রাখতে হবে, তেমনি যিনি অবসরে যাচ্ছেন, তাঁকেও আগে থেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। তাহলেই অবসরজীবনটুকু সুন্দরভাবে কাটানো সম্ভব হবে।