ব্রাজিলেই বাজি মেহজাবীনের

মেহজাবীন হোসেন
ছবি: সংগৃহীত

‘পারিবারিক সূত্রে আমি ব্রাজিলের সমর্থক। শুধু আমি নই, আমার চৌদ্দগোষ্ঠীর সবাই। তাই দলটির প্রতি ভালোবাসা একটু বেশি,’ বলছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ছাত্রী মেহজাবীন হোসেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) আয়োজিত ‘আমরাই হব বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন’ নামের রম্য বিতর্ক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বেশ পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। তাঁর বলার ধরন, সাবলীল উপস্থাপনা অনেকেরই নজর কেড়েছে৷ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর বক্তব্যের অংশবিশেষ।

মেহজাবীন চট্টগ্রামের মেয়ে। স্কুল–কলেজও সেখানেই। ছোটবেলা থেকে যুক্ত ছিলেন নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। স্কুলের ক্লাবের হয়ে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। তবে পড়ালেখায় বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি। ফলাফল পেয়েছেন হাতেনাতে। এসএসসিতে চট্টগ্রাম বোর্ডে প্রথম হন তিনি।

বিতর্কের হাত ধরেই বিটিভির সঙ্গে যোগাযোগ। বললেন, ‘বিশ্বকাপের আগে একটি জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম। নকআউট পর্বে আমার দল বাদ পড়ে। এ সময় আমাকে বিটিভি থেকে উপস্থাপনার প্রস্তাব দেওয়া হয়৷ ওই অনুষ্ঠানেরই কয়েকটি পর্ব আমি উপস্থাপনা করি। এরপর দু-একটা রম্য বিতর্কের জন্যও বলা হয়েছিল। তবে পরীক্ষাসহ নানা কারণে সম্ভব হয়নি। এবার বিশ্বকাপের বেশ কিছুদিন আগে আমাকে এই রম্য বিতর্কের বিষয়ে জানানো হয়। উৎসাহ নিয়েই অংশ নিই। বাছাই প্রক্রিয়ায় একটা ব্যাপার বেশ মজার ছিল। ব্রাজিলের সমর্থক জানার পরও একাধিকবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “সত্যি করে বলো, মন থেকে ব্রাজিল তো? মন থেকে না হলে কিন্তু হবে না।” হা হা।’

মেহজাবীন হোসেন
ছবি: সংগৃহীত

মেহজাবীন চট্টগ্রামের মেয়ে। স্কুল–কলেজও সেখানেই। ছোটবেলা থেকে যুক্ত ছিলেন নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। স্কুলের ক্লাবের হয়ে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। তবে পড়ালেখায় বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি। ফলাফল পেয়েছেন হাতেনাতে। এসএসসিতে চট্টগ্রাম বোর্ডে প্রথম হন তিনি। বলছিলেন, ‘পড়ালেখায় ভালো ছিলাম। পরিবারের লোকজন চাইত চিকিৎসক হই। এ নিয়ে বাসায় সব সময় কথা হতো। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করতে বাবা কী না করেছেন! অন্য খেলনার পরিবর্তে আমার হাতে আসত স্টেথোস্কোপ, থার্মোমিটার, ইত্যাদি। না না, খেলনা স্টেথোস্কোপ নয়, সত্যিকারেরটাই।’

আরও পড়ুন

শিক্ষা বোর্ডে প্রথম হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পান মেহজাবীন। চীন ভ্রমণে গিয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় হয়। ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে ওঠা মেহজাবীনের মনে উঁকি দিতে থাকে বিদেশে পড়ার স্বপ্ন। আগ্রহ জন্মায় চিকিৎসাসম্পর্কিত গবেষণায়। তাঁর বক্তব্য, ‘দেশে ফিরেই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিই, উচ্চমাধ্যমিকের পর দেশের বাইরে যাব। গবেষণার ক্ষেত্রে বাইরে সুযোগও তো বেশি। বাবা কাজের সূত্রে দেশের বাইরে ছিলেন। মাকেও মানিয়ে ফেলেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার আগে সবাই কোচিংয়ে ভর্তি হয়। আমি মেডিকেল কোচিংয়ে ভর্তির টাকা দিয়ে আইইএলটিস ও স্যাটের জন্য ভর্তি হই। ভালো স্কোরও আসে। এরপর বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে থাকি। যেহেতু বাসা থেকে আর্থিক সহযোগিতা পাব না, তাই শতভাগ বৃত্তি পাওয়ার চেষ্টা করছিলাম।’

মেহজাবীন হোসেন
ছবি: সংগৃহীত

চেষ্টা বিফলে যায়নি। মনমতো বৃত্তি ও বিষয় পেয়ে যান মেহজাবীন। সব চূড়ান্ত, কয়েক মাস পরই বিদেশে পাড়ি জমাবেন, এই সময় দেশে আসেন বাবা। সব জেনে বাবাও নিরুৎসাহিত করলেন না। বরং বাহ্বা দিলেন। তবে একটা অনুরোধও করলেন, ‘মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষাটাও দাও।’ কোনো প্রস্তুতি ছাড়া পরীক্ষায় অংশ নিয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে সুযোগ পান মেহজাবীন হোসেন, ‘বিদেশে পড়তে যেতে হলে উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল দরকার ছিল। তাই আমি শতভাগ মনোযোগ দিয়ে পাঠ্যবই পড়েছিলাম। জীববিজ্ঞানে আমার শতকরা ৯৯ ভাগ নম্বর ছিল। সে জন্যই হয়তো ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে কোনো বেগ পেতে হয়নি। নিশ্চিন্তে পরীক্ষা দিয়েছি।’ শেষ পর্যন্ত মেহজাবীনের আর বিদেশে যাওয়া হলো না। দেশেই চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়বেন, সিদ্ধান্ত নিলেন।

অবসর সময়ে বই পড়তে ভালোবাসেন মেহজাবীন। কবিতা লেখেন, ছবি আঁকেন। ক্যাম্পাসের যেকোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের চেষ্টা করেন। জাতীয় পর্যায়ের বিতর্ক, অলিম্পিয়াড, কুইজসহ বহু প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছেন। বেশ কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে আছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘আমার বন্ধুদের দেখেছি, স্কুল–কলেজে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল, কিন্তু মেডিকেলে এসে সব বাদ দিয়েছে। আমি দেখাতে চাই, ভারসাম্য করতে পারলে একজন মেডিকেলের শিক্ষার্থীও এসবের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।’

ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখ মেহজাবীন। রম্য বিতর্কের কল্যাণে সেই ব্যাপ্তি আরও বেড়েছে। এখন বন্ধুরা মাঝেমধ্যে ‘সেলিব্রিটি’ও বলে। ব্রাজিল জিতে গেলে আনন্দ র‍্যালিতে সামনে দাঁড়াতে বলে। তবে এই খ্যাতির বিড়ম্বনাও কম নয়। ব্রাজিলের সমর্থকদের কাছ থেকে যেমন প্রশংসা পান, অন্য দলের সমর্থকদের ট্রলের শিকারও হতে হয় হরহামেশা। বললেন, ‘ট্রল নিয়ে আমার সমস্যা নেই। আমি যেহেতু বিতর্কের মানুষ, যৌক্তিক আলোচনা কীভাবে করতে হয়, জানা আছে। আর্জেন্টিনা বা জার্মানির কেউ যদি গঠনমূলক সমালোচনা করেন, আমিও গঠনমূলক জবাব দেব। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের বলার বা লেখার সীমা অতিক্রম করে ফেলেন। কোথায় থামতে হবে, সেটা বোঝেন না। ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বসেন। এরাই সুস্থ পরিবেশকে নোংরা করেন। কোথাকার লাতিন আমেরিকার দেশ, তার জন্য এত কিছু করছি। আবেগ তো থাকবেই। কিন্তু দিন শেষে খেলা উপভোগ করাই মুখ্য।’

ভালো মানুষ এবং ভালো চিকিৎসক হতে চান মেডিকেলের এই শিক্ষার্থী। অবদান রাখতে চান মানবসেবায়। পাশাপাশি মিডিয়া জগতেও কাজ করার ইচ্ছা আছে। সামনে বিটিভির স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের বিতর্কে উপস্থাপনা করবেন তিনি। নাটক ও মডেলিংয়ের প্রস্তাবও পাচ্ছেন। সবকিছু মিলে গেলে হয়তো সামনে অন্যভাবে দেখা যাবে মেহজাবীনকে।