নিজের যেসব ভুলে সম্মান কমে যায়

কিছু মানুষ ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবেশটা কেমন বদলে যায়। সবাই নড়েচড়ে বসে, তাঁর কথা শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। অথচ তিনি হয়তো খুব জোরে কথা বলেন না, নিজেকে জাহির করার মতো কিছুই করেন না। তবু সবাই তাঁকে সমীহ করে, সম্মান করে। আবার উল্টোটাও ঘটে। কেউ হয়তো অনেক জ্ঞানী, অনেক কথা বলছেন, কিন্তু কেউ তাঁকে পাত্তাই দিচ্ছে না। কিন্তু কেন এমন হয়? সম্মান কি জোর করে আদায় করা যায়? মনোবিজ্ঞান বলছে, একদমই না।

মানুষ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আপনার সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করে ফেলে
মডেল: নোমান ফাতিন, রাগীব ইয়াসার ও রাজু আহমেদ। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

মানুষ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আপনার সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করে ফেলে। আর সেই ধারণা নির্ভর করে আপনার সূক্ষ্ম কিছু আচরণের ওপর। অজান্তেই আমরা এমন কিছু ভুল করে বসি, যা আমাদের ব্যক্তিত্বকে অন্যদের চোখে ছোট করে দেয়। চলুন দেখে নিই এমন ১০টি সূক্ষ্ম আচরণের কথা, যা এড়িয়ে চললে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র।

১. তড়িঘড়ি করে কথা বলা

অনেক সময় উত্তেজনা বা নার্ভাসনেসের কারণে আমরা খুব দ্রুত কথা বলি। মনে হয় যেন কেউ আমাদের তাড়া করছে। এতে শ্রোতার কাছে মনে হয়, আপনি নিজের কথার ওপর নিজেই ভরসা পাচ্ছেন না। তাই ধীরে কথা বলুন। শব্দ বেছে নিতে সময় নিন। সময় নিয়ে শান্তভাবে কথা বললে মানুষ অবচেতনভাবেই ধরে নেয়, আপনার কথার ওজন আছে।

২. মনোযোগের অভাব

কারও সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলছেন, অথচ আপনার চোখ মুঠোফোনে। ভাবছেন, এতে আপনাকে খুব ব্যস্ত বা কুল দেখাচ্ছে? মনের ভুলেও এ কাজ করা উচিত নয়। এতে শিশুদের মতো অপরিণত মনে হয়। আপনি যাঁর সঙ্গে কথা বলছেন, তাঁকে গুরুত্ব না দেওয়া মানে পরোক্ষভাবে নিজেকেই ছোট করা। যাঁর সঙ্গে কথা বলছেন, পুরোপুরি তাঁর সঙ্গে থাকুন। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। আপনার এই উপস্থিতি মানুষকে চুম্বকের মতো টানবে।

আরও পড়ুন

৩. ‘জি হুজুর’ স্বভাব

কেউ কিছু বলল আর আপনি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে সায় দিলেন। দ্বিমত থাকলেও ভয়ে কিছু বললেন না। সব কথায় হ্যাঁ, হ্যাঁ…ঠিক ঠিক বলেছেন—এমন মানুষকে কেউ মনে রাখে না। এতে নিজের নিজস্বতা ফিকে হয়ে যায়। সবার সব কথায় একমত হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। ভদ্রভাবে দ্বিমত করতে শিখুন। নিজস্ব মতামতই আপনাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করবে।

৪. কথার মাঝে কথা বলা

কেউ কথা বলছে, আপনি হুট করে তার কথার মধ্যে একটা কথা বলে ফেললেন। এটা চরম বিরক্তিকর একটি অভ্যাস। এতে বোঝা যায়, আপনি নিজের কথা নিয়ে খুব নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং নিজেকে প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়ে আছেন। প্রথমে ভালো শ্রোতা হোন; অন্যকে কথা শেষ করতে দিন; মাঝে একটু নীরবতা থাকলেও সমস্যা নেই। নীরবতাও একধরনের শক্তি।

৫. অতিরিক্ত সিরিয়াস থাকা

সব সময় মুখ গোমড়া করে থাকা বা সবকিছুতে খুঁত ধরা মানুষকে কেউ পছন্দ করে না। এরা ঘরে থাকলে আনন্দ শেষ হয়ে যায়। আপনি সব সময় সবকিছু নিয়ে অতিরিক্ত সিরিয়াস থাকলে মানুষ আপনাকে এড়িয়ে চলবে। তাই পরিস্থিতি বুঝুন। নিজেকে হালকা রাখুন। যে মানুষটা হাসতে জানে এবং অন্যকে হাসাতে জানে, তার প্রতি মানুষের সম্মান এমনিতেই চলে আসে।

নিজস্ব মতামতই আপনাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করবে
মডেল: শামস ও নাজমি। ছবি: সুমন ইউসুফ

৬. সব সময় সেফ খেলতে চাওয়া

সবার কাছে ভালো মানুষ সাজার জন্য অনেকে বিতর্কিত বা কঠিন বিষয় এড়িয়ে চলেন। সত্যি কথা বলতে ভয় পান, পাছে কেউ কিছু মনে করে! কিন্তু যারা সব সময় সেফ খেলে, তাদের মানুষ বড়জোর নিরীহ বলে মানে, সম্মান করে না। নিজের সত্যটা বলতে শিখুন। কখনো কখনো অপ্রিয় সত্য বলাটা ব্যক্তিত্বের পরিচয় প্রকাশ করে। সবার কাছে ভালো সাজার চেয়ে সত্যবাদী হওয়া অনেক বেশি জরুরি।

৭. নিজেকে সস্তা করে ফেলা

কেউ ডাকল আর আপনি সব কাজ ফেলে দৌড়ে গেলেন। ভাবছেন, এতে মানুষ খুশি হবে? খুশি হয়তো হবে, কিন্তু সম্মান করবে না। যে নিজের সময়ের মূল্য দেয় না, অন্যরা তাকে মূল্য দেবে কেন? সাহায্য করা ভালো, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়। মানুষকে খুশি করার জন্য নিজের কাজ নষ্ট করবেন না। আপনি যখন নিজের সীমারেখা ঠিক রাখবেন, মানুষ তখন আপনাকে সমীহ করবে।

৮. কথা বলার সময় নিজেকে বিচার করা

কথা বলার সময় কি আপনি ভাবেন—‘আমি কি ঠিক বললাম?’ ‘আমাকে কি বোকা লাগছে?’ ‘ওরা কি আমাকে পছন্দ করছে?’ যদি এমন হয়, তাহলে আপনি কথোপকথনে নেই, আপনি আটকে আছেন নিজের মস্তিষ্কের ভেতরে। এই অতিরিক্ত সচেতনতা আপনার স্বাভাবিকতা নষ্ট করে দেয়। মাথা থেকে এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন। বর্তমান মুহূর্তের মধ্যে বাঁচুন। আপনি যেমন, তেমনভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করুন।

আরও পড়ুন

৯. সমালোচনায় প্রতিক্রিয়া দেখানো

কেউ আপনার সমালোচনা করল বা অপমান করল, আপনি রেগেমেগে তাকে পাল্টা আক্রমণ করলেন। আপনি ভাবছেন আপনার শক্তি দেখালেন। আসলে আপনি নিজের দুর্বলতাই প্রকাশ করলেন। প্রতিক্রিয়া দেখানো মানেই আপনি তার কথায় আঘাত পেয়েছেন এবং আপনার কিছু লুকানোর আছে। তাই প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে হাসুন। বিষয়টাকে হালকাভাবে নিন। টিটকারির জবাব দিন রসবোধ দিয়ে, রাগ দিয়ে নয়। যে সমালোচনা গায়ে মাখে না, তাকে কেউ দমাতে পারে না।

১০. ফলাফলের ওপর নির্ভরশীলতা

এটাকে এককথায় বলা যায় কাঙালপনা। আপনি খুব করে চাইছেন কেউ আপনাকে পছন্দ করুক বা কোনো ক্লায়েন্ট আপনার ডিলটা সাইন করুক। এই যে চাই-ই চাই ভাব, এটা আপনার আচরণে ফুটে ওঠে। মানুষ খুব সহজেই এই হাহাকার টের পায় এবং পিছিয়ে যায়। ফলের আশা ছাড়ুন। আপনি আপনার সেরাটা দিন, তারপর ভুলে যান। আপনি যখন বোঝাতে পারবেন, কোনো কিছু না পেলেও আপনার কিছু যায় আসে না, তখনই সেটা পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

আপনি যখন নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা বন্ধ করবেন, ঠিক তখনই মানুষ আপনাকে সম্মান করতে শুরু করবে
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

শেষ কথা

এই সবকিছুর মূল কথা, মাথার ভেতরের হট্টগোল থামানো। এই নিয়মগুলো চর্চা করুন, কিন্তু যখন মানুষের সঙ্গে মিশবেন, তখন সব নিয়ম ভুলে যান। নিজের সহজাত বুদ্ধির ওপর ভরসা রাখুন। অনিশ্চয়তাকে উপভোগ করুন। আপনি যখন নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা বন্ধ করবেন, ঠিক তখনই মানুষ আপনাকে সম্মান করতে শুরু করবে। বিশ্বাস হচ্ছে না? আজই পরীক্ষা করে দেখুন!

সূত্র: মিডিয়াম

আরও পড়ুন