এক অপ্রেমের গল্প নিয়ে আমি জুড়ে গেলাম শ্রাবণের সঙ্গে
বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে লেখা আহ্বান করেছিল প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভালোবাসার টক–ঝাল–মিষ্টি গল্প লিখে পাঠিয়েছেন পাঠক। কেউ লিখেছেন দুরন্ত প্রেমের গল্প, কেউবা শুনিয়েছেন দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়ার অনুভূতি। তেমনই একটি লেখা পড়ুন এখানে।
শ্রাবণের সঙ্গে আমার না হয়েছে প্রেম আর না হয়েছে বন্ধুত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছর আমরা স্রেফ সহপাঠী ছিলাম। সামনে পড়লে দু–একটা কথা হতো এমন। শ্রাবণ অবশ্য ডিপার্টমেন্টের পরিচিত মুখ, সবার সঙ্গেই মিশে যেত। এমন কোনো ইভেন্ট হয়নি যেখানে শ্রাবণের অংশগ্রহণ ছিল না, পর্দার সামনে হোক কি পেছনে। সেখানে আমি এক অসামাজিক প্রাণী। প্রয়োজনীয় ক্লাস ছাড়া ক্যাম্পাসে পা পড়ত না!
লোকে বলে, বিপরীতমুখী আকর্ষণ। সেই আকর্ষণ আমার মাথায় চেপে বসেছিল দ্বিতীয় বর্ষের শুরুতে। সাদা পাঞ্জাবি পরে খোলা ক্যাম্পাসে, সবার মধ্যমণি হয়ে যখন সে সুর তুলেছিল, ‘মায়াবনবিহারিণী...’
নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে সারাক্ষণ বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা আমি হঠাৎ করেই উপলব্ধি করেছিলাম জীবনের বৈচিত্র্য। সেদিন প্রথমবারের মতো আমার ইচ্ছা হয়েছিল ওদের মতো, শ্রাবণের মতো প্রাণ ভরে বাঁচতে, গাইতে, হাসতে!
ইচ্ছা হওয়া অবধিই যা! আমার আর নিজের গণ্ডির বাইরে আসা হয়নি। তবে এরপর যত অনুষ্ঠান-উৎসব হয়েছে, সেসবেই গিয়েছিলাম। এক কোণে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে শুনতাম শ্রাবণের গান। দেখতাম তার হাস্যোজ্জ্বল মুখ, কপালে ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো চুল আর চশমার আড়ালে থাকা দুটো চোখ। সামনে পড়েছিলাম একবার। কপট বিস্ময় নিয়ে শ্রাবণ বলেছিল, ‘ইন্দুমতী যে! কী মনে করে? ভুলে ক্লাস আছে ভেবে চলে এসেছ?’
আমি বলতে পারিনি কিছু। কেবল টের পেয়েছিলাম, আমার মনে বেজে ওঠা রবীন্দ্রনাথের সে সুর, ‘দূর হতে আমি তারে সাধিব...’
এই নীরব সাধনাতেই পেরোল দিন। দোরগোড়ায় হাজির হলো ফাইনাল সেমিস্টার। দিনদুনিয়া এক করে বইয়ের পাতায় ডুবে আছি, এমন এক রাতে ফোন এল অপরিচিত নম্বর থেকে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল পরিচিত স্বর,
‘এই ইন্দুবালা, একটা বাজি ধরবে?’
‘শ্রাবণ!’
‘আরে হ্যাঁ, আমিই! বলো ধরবে?’
‘কী?’
‘কে বেশি সিজি তুলবে এবার, তুমি না আমি? যে জিতবে, তার একটা স্পেশাল ট্রিট পাওনা। বাজি?’
বাজিতে শ্রাবণ হেরে গেল। কিন্তু সেদিনের পর এ বিষয়ে কোনো কৌতূহল সে দেখায়নি। কনভোকেশনের দিনও তার দেখা পাইনি। কোন খেয়াল চেপেছিল কে জানে! আমি অপেক্ষায় রইলাম তবু; ঠিক কিসের, জানা নেই। এদিকে বাড়ি থেকে পাত্রদের খোঁজ শুরু হলো। তা ঠেকাতে মাস্টার্স উপেক্ষা করে আমি শুরু করলাম চাকরির খোঁজ।
আরও বছর দুই কেটে গেল। একটা ব্যাংকে ঢুকেছি তখন আট মাস হলো। বাড়িতে বিয়ের চেষ্টাও বেড়েছে বহুগুণ। এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আমার জীবনে আবার আগমন ঘটল শ্রাবণের, একপশলা বৃষ্টি নিয়ে! সেই চিরচেনা হাসিমুখে, কোনো ভূমিকা ছাড়াই বলে বসল,
‘বাজিটার কথা মনে আছে, ইন্দুমতী? ভেবেছিলাম জিতব। পাওনাটাও আমিই পাব। তুমি তা হতে দিলে কই! তাই দেখো, কত কাঠখড় পুড়িয়ে চাকরি একটা জুটিয়ে তারপর এলাম। লেকচারার হয়ে গিয়েছি বুঝলে? বেকার, গান গেয়ে বেড়ানো ছেলেদের তো তোমার বাবার মনে ধরবে না! পাওনা পরিশোধ করতেও আর কোনো সমস্যা নেই। তো বলো, কী চাও?’
রাজ্যের অস্থিরতা মনে চেপে বললাম, ‘কিছু না।’
‘জানতাম! তাই আমি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছি। দূরে না দাঁড়িয়ে পাশে বসে আমার গান শুনবে, ইন্দু? সব সময়?’
সেবারও কিছু বলতে পারিনি। প্রেমটাও হয়ে ওঠেনি! তবে এই সুযোগ্য পাত্রের আকর্ষণীয় সম্বন্ধ লুফে নিয়েছিলেন আমার বাবা। এক অপ্রেমের গল্প নিয়ে আমি জুড়ে গেলাম শ্রাবণের সঙ্গে! সময় পেরোল, আমরা পাল্টালাম। পাল্টাল না আমাদের অপ্রেম, ইন্দুর সঙ্গে একেকটি বিশেষণ জুড়ে তার আমাকে ডাকা! আজও যখন শুধাই, ‘প্রেমে পড়েছিলে?’
সে হেসে বলে, ‘উঁহু, ভালোবেসেছি।’