প্রায় ৭০ বছর বয়সে এহছানুল হক মিলনের মতো দৌড়লাফ কি নিরাপদ, গবেষণা কী বলছে
সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে শেষ মুহূর্তে দৌড়ে ও লাফিয়ে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করেন বিএনপি থেকে নবনির্বাচিত চাঁদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তাঁর বয়স প্রায় ৬৮ বছর। ফলে এই বয়সে এমন দৌড়লাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। অনেকের প্রশ্ন, এই বয়সে দৌড়ানো বা লাফ দেওয়া কি ঝুঁকিপূর্ণ? বয়স্ক ব্যক্তিদের কি এ ধরনের নড়াচড়া করা উচিত? বিজ্ঞান বলছে, সঠিক নিয়মে করলে বয়স কোনো বাধা নয়, বরং উপকারই বেশি। বিস্তারিত জানুন।
বয়স্কদের লাফানো কি সত্যিই ভালো
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, বয়স বাড়লে দৌড়ঝাঁপ বা লাফ দেওয়া বিপজ্জনক। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে ঠিক উল্টো কথা।
বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, জাম্পিং বা প্লাইওমেট্রিক এক্সারসাইজ (যার মধ্যে লাফ, দ্রুত ওঠানামা ইত্যাদি থাকে) বয়স্কদের জন্য হতে পারে অত্যন্ত উপকারী, যদি তা হয় নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ পরিবেশে।
১. হাড় মজবুত করে, অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি কমায়
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমে, অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে। লাফ দেওয়ার সময় যে ধাক্কা বা চাপ তৈরি হয়, তা হাড়ের কোষকে উদ্দীপিত করে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বড় গবেষণা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিয়মিত জাম্পিং এক্সারসাইজ নিতম্বের হাড়ের ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়, যা বৃদ্ধ বয়সে হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশনও লাফ বা উচ্চ-প্রভাবযুক্ত ব্যায়ামকে হাড় মজবুত করার কার্যকর উপায় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
২. পেশিশক্তি বাড়ায়, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়
বয়স বাড়লে পেশিশক্তি কমে যাওয়াকে বলা হয় সারকোপেনিয়া। লাফানো–জাতীয় ব্যায়াম পায়ের পেশিকে শক্তিশালী করে।
১২ সপ্তাহের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত জাম্পিং এক্সারসাইজে—
সিঁড়ি ভাঙার ক্ষমতা বাড়ে
চেয়ার থেকে ওঠা সহজ হয়
হাঁটার গতি ও ভারসাম্য উন্নত হয়
বয়স্কদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলোর একটি হলো পড়ে যাওয়া। এই ঝুঁকি কমাতেও এর সরাসরি প্রভাব থাকে।
৩. হৃৎস্বাস্থ্যের উন্নতি করে
লাফ দিলে দ্রুত হার্টরেট বাড়ে। ফলে হৃদ্যন্ত্র ভালোভাবে কাজ করার সুযোগ পায়। ইউরোপিয়ান জার্নাল অব অ্যাপ্লায়েড ফিজিওলজিতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, জাম্পিংসহ উচ্চমাত্রার ব্যায়াম বয়স্কদের হৃৎস্বাস্থ্য ও রক্তনালির কার্যকারিতা উন্নত করে, যা হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
৪. ভারসাম্য ও সমন্বয় শক্তিশালী করে
লাফানোর সময় শরীরকে ভারসাম্য রাখতে হয়। এতে স্নায়ু ও পেশির সমন্বয় বাড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত জাম্পিং এক্সারসাইজ করলে—
ব্যালান্স বা ভারসাম্য ভালো হয়
হাঁটার স্থিরতা বাড়ে
পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে
৫. স্নায়ু-পেশির কার্যকারিতা উন্নত করে
আট সপ্তাহের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জাম্পিং এক্সারসাইজ বয়স্কদের ক্ষেত্রে—
লাফের উচ্চতা বাড়িয়েছে ১৪ শতাংশ
পায়ের পেশির গতি বাড়িয়েছে ৮ শতাংশ
পেশির সংকোচনের সময় কমিয়েছে
এর মানে, বয়স বাড়লেও শরীরের প্রতিক্রিয়া ও শক্তি ধরে রাখার ক্ষমতা অনেকটাই বজায় রাখা সম্ভব।
তাহলে কি সবাই লাফাতে পারবেন
এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সবাই একভাবে লাফাবেন না।
যাঁদের আছে—
হাঁটু বা কোমরের তীব্র ব্যথা
অস্টিওআর্থ্রাইটিস
হৃদ্রোগ
ভারসাম্যজনিত গুরুতর সমস্যা
তাঁদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া লাফানো উচিত নয়।
নিরাপদভাবে শুরু করার উপায়
প্রথমে হালকা স্কোয়াট, হিল রেইজ, স্টেপ-আপ
এরপর ছোট ছোট হপ
নরম মেঝে বা ম্যাটে অনুশীলন
ভালো জুতা ব্যবহার
এহছানুল হক মিলনের ঘটনাটি কী বার্তা দেয়
৬৮ বছর বয়সেও যদি কেউ দ্রুত দৌড়ে ও লাফিয়ে চলতে পারেন, সেটি মূলত শারীরিক সক্ষমতা ও নিয়মিত নড়াচড়ার সুফলকেই তুলে ধরে। এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বয়স শুধু সংখ্যা, চলাফেরা ও শরীরচর্চাই আসল শক্তি।
শেষ কথা
বয়স্কদের জন্য লাফানো নিষিদ্ধ নয়, বরং সঠিক নিয়মে করলে এটি হতে পারে হাড়, পেশি, হৃদ্যন্ত্র ও ভারসাম্যের জন্য দারুণ উপকারী। তবে নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝে, ধীরে শুরু করে এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে এগোনোই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। সক্রিয় থাকাই সুস্থ বার্ধক্যের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
সূত্র: থার্ড এজ ফিটনেস