জেন-জির নানা শব্দ, ট্রেন্ড—এসব আমি সত্যিই বুঝি না : রাশমিকা মান্দানা
বিয়ে করে বর্তমানে বেশ আলোচনায় আছেন রাশমিকা মান্দানা। কদিন আগে স্ন্যাপচ্যাট আয়োজিত এক পডকাস্টে খোলামনে নিজেকে তুলে ধরেছিলেন এই ভারতীয় অভিনেত্রী। বলেছিলেন, কেন দ্বৈত চরিত্র ধরে রাখাটা তাঁর জন্য কঠিন। রাশমিকার কথামালার নির্বাচিত অংশ থাকল আজ।
ডায়েরি ছিল আমার সব সময়ের সঙ্গী। সব সময় সেই মেয়েটাই ছিলাম, যে জার্নাল লেখে। মানুষের সঙ্গে নিজের কথা খুব একটা শেয়ার করতাম না। অনুভূতিগুলো লিখে রাখতেই বরং ভালো লাগত। যেহেতু হোস্টেলে বড় হয়েছি, খেয়াল করেছি, মানুষের সঙ্গে বেশি কথা বললে নানা উপদেশ শুনতে হয়। এই উপদেশ অনেক সময় উল্টো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি তাই মনের কথা লিখে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এটা আমার কাছে খুব ব্যক্তিগত, হৃদয়ের খুব কাছের একটা বিষয়।
যখন নিজের একটা সুগন্ধির ব্র্যান্ড শুরু করতে চাইলাম, ভাবলাম, নামটা ‘ডিয়ার ডায়েরি’ হলে কেমন হয়। সবাই জানে, ডিয়ার ডায়েরি নামে অনলাইনে আমি একটা সিরিজ লেখা শুরু করেছিলাম। ডায়েরির মতো সুগন্ধিও তো ভীষণ ব্যক্তিগত। যেন নিজেরই একটা অংশ—ত্বকের খুব কাছের, খুব অন্তরঙ্গ কিছু। আমি মনে করি, আমি যে পারফিউম ব্যবহার করি, সেখান থেকেই আমার আত্মবিশ্বাসের একটা অংশ আসে। তাই এমন নাম।
একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে আমি জানি, বাইরে শতভাগ নিজের মতো থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, আমি আদতে ‘রাশমিকা মান্দানা’ নামে একটা ব্র্যান্ডের অধীন। যা করি, যা বলি, যা পড়ি, সব এই ব্র্যান্ডটার জন্য। চারপাশ থেকে অনেকেই নানা পরামর্শ দেয়, ‘এটা বলা যাবে না’, ‘এই আচরণ তোমার সঙ্গে যায় না’, ‘ওটা কোরো না’। এভাবেই তৈরি হয় আপনার অনলাইন ব্যক্তিত্ব। এটা আপনারই একটা অংশ, কিন্তু পুরোপুরি আপনি নন।
আপনি যদি আমাকে বাড়িতে দেখেন, অবাক হবেন। মনে হবে মেয়েটা কত সেকেলে! বাড়িতে আমি ঘুরে ঘুরে সবাইকে খাওয়াই, খোঁজ নিই। ‘বিশ্রাম নিয়েছ?’ ‘ভালো আছ তো?’ এটাই আমার ধরন। জেন-জির নানা শব্দ, ট্রেন্ড—এসব আমি সত্যিই বুঝি না! সত্যি বলতে, এসবের সঙ্গে তাল মেলাতেও পারি না। আমি ভীষণ আবেগপ্রবণ, বাস্তববাদী। কিন্তু বাইরে সেটা পুরোপুরি দেখাতে পারি না। কারণ, লোকে সহৃদয়তাকে দুর্বলতা ভাবে। কিংবা ভাবে, ভান। তারা মনে করে, ‘ক্যামেরার জন্য এমন করছে।’
তাই ভারসাম্য ধরে রাখতে হয়। আমার একটা অনলাইন ব্যক্তিত্ব আছে, আর আছে একটা ব্যক্তিগত সত্তা। দুটোই আমি, দুটোই সত্যি। লোকের কথা যদি কানে না নেন, তাহলে আলাদা কথা। কিন্তু আমার সমস্যা হলো, আমি এটা পারি না। বাইরে মানুষের কথায় পাত্তা দিচ্ছি না, আবার ঘরে ঢুকেই বাড়ির মানুষের কথাকে গুরুত্ব দিচ্ছি, এমন আচমকা বদলে যাওয়া আমাকে দিয়ে হয় না। আমি যেমন পরিবার ও বন্ধুদের জন্য ভাবি, দর্শকের জন্যও ভাবি। আলাদা ব্যক্তিত্ব নিয়ে বাঁচতে জানি না। তাই এসব আমাকে প্রভাবিত করে। বারবার আঘাত পাই, ধীরে ধীরে সেরে উঠি। আবার নতুন কিছু আসে, আবার কষ্ট পাই, আবার সামলে উঠি। মনে হয় একই চক্রের মধ্যেই বেঁচে আছি বছরের পর বছর।
নিজেকে বদলানোর চেষ্টা আমি করেছি। আচ্ছা ঠিক আছে এভাবেই চলি, এটা না বলি, ওটা করি—সব চেষ্টাই করেছি। কিন্তু ভীষণভাবে ব্যর্থ হয়েছি। কারণ, আপনি যদি নিজের মতো না হন, সেটা ধরে রাখা যায় না। চেষ্টা করলে অনেক কিছু বদলানো যায়, কিন্তু আপনার ভেতরের যে মূল সত্তা, যে সূক্ষ্ম সুতো আপনাকে ধরে রাখে, সেটা বদলানো যায় না। সেটাই আপনার আসল পরিচয়।
আমি জানি, সহৃদয় হওয়ার জন্য কোনো পরিচালক টাকা দেবে না। কোনো পরিচালক বলবে না, ‘ও তো ভালো মানুষ। ওকে কাজ দিই।’ তবু ভালোভাবে বাঁচার জন্য সহৃদয় থাকতে চাই। কারণ, আমার কাছে সহৃদয়তাই আসল শক্তি। যদি ক্ষমতার কথা বলেন, হ্যাঁ, সেটাই আমার ক্ষমতা। আমরা সবাই কঠিন একটা জীবন পার করছি। নাম কামানো, অর্থ উপার্জন, টিকে থাকা, সবই কঠিন। অনেকে বলে, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে শক্ত মানুষটাই টিকে থাকে। কিন্তু আমি বলি—এই যাত্রাপথে আপনি কেমন ছিলেন? আপনি কি দয়ালু ছিলেন? নাকি নিজের নাম করার জন্য অন্য কাউকে ছোট করেছেন?
আমরা সবাই সংগ্রাম করছি। কিন্তু এই পথচলায় যদি অন্যের প্রতি সদয় থাকি, তাহলে বয়স বাড়ার পর পেছনে তাকিয়ে অন্তত বলতে পারব—আমার সঙ্গে যারা কাজ করেছে, তারা একটা ভালো সময় কাটিয়েছে।
আজ আমি যা, তাকে নিয়ে আমি গর্বিত। আশা করি বুড়ো বয়সে এই সময়টার দিকে ফিরে তাকিয়েও নিজের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে পারব।