আমরা কেন প্রায়ই ভুল সিদ্ধান্ত নিই? ৫টি মনস্তাত্ত্বিক কারণ ও সমাধান জানুন

আমরা প্রায়ই ভাবি, সিদ্ধান্ত নিই যুক্তি দিয়ে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময়ই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে আমাদের কিছু পক্ষপাত, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘কগনিটিভ বায়াস’। এসব পক্ষপাতের কারণে আমরা পরিস্থিতি ভুলভাবে বিচার করি, তাড়াহুড়া করি বা নিজের ধারণাকেই সত্যি ধরে বসে থাকি। গবেষণা বলছে, এসব বায়াসের কিছু আমাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রবণতা, আবার কিছু আসে অভিজ্ঞতা থেকে। তবে ভালো খবর হলো, এসবে সচেতন হলে আমরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক ও দক্ষ হতে পারি। নিচে এমন পাঁচটি সাধারণ কারণ তুলে ধরা হলো, যেসব প্রায়ই আমাদের ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

কাউকে প্রথম দেখার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমাদের মস্তিষ্ক তার সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করে ফেলে
ছবি: প্রথম আলো

১. প্রথম ধারণার ফাঁদ

কাউকে প্রথম দেখার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমাদের মস্তিষ্ক তার সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করে ফেলে। পরে সেই ধারণা বদলানো বেশ কঠিন হয়ে যায়।

ধরুন, কোনো চাকরির সাক্ষাৎকারে একজন প্রার্থী খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রেজেন্টেশন দিলেন। তখন আপনি হয়তো ধরে নিলেন তিনি ব্যবস্থাপনায়ও খুব দক্ষ। এরপর এমন তথ্যও আপনি উপেক্ষা করতে পারেন, যা এ ধারণার সঙ্গে মেলে না।

এই পক্ষপাত কাটানোর একটি উপায়, প্রথম ধারণাকে চূড়ান্ত না ধরে আরও তথ্য সংগ্রহ করা। সময় নিয়ে মানুষকে জানলে প্রাথমিক ধারণা বদলানো সম্ভব।

২. আবেগের বশে সিদ্ধান্ত

রাগ, উত্তেজনা বা আনন্দ—তীব্র আবেগের মুহূর্তে অনেক সময় আমরা ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। তখন যুক্তির চেয়ে আবেগই আচরণকে বেশি প্রভাবিত করে।

তর্কের সময় অনেকেই পরে আফসোস করে এমন কথা বলে ফেলেন বা সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, সেই মুহূর্তে আবেগ যুক্তিকে ছাপিয়ে যায়।

এ ধরনের পরিস্থিতি সামলাতে মানসিক প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। কখনো কখনো এক আবেগকে আরেক আবেগ দিয়ে সামাল দেওয়াও কাজে লাগে। যেমন ভয় অনেক সময় রাগের তীব্রতা কমাতে পারে।

আরও পড়ুন

৩. নিজের অভিজ্ঞতার ছাঁচে অন্যকে বিচার

নতুন কারও সঙ্গে পরিচয়ের সময় আমরা প্রায়ই নিজের অতীত অভিজ্ঞতার ছাঁচে তাকে বিচার করি। অর্থাৎ আগের সম্পর্ক বা অভিজ্ঞতার প্রভাব অজান্তেই নতুন মানুষের ওপর পড়ে।

ধরুন, কারও শৈশবে কঠোর বা নির্যাতনকারী অভিভাবক ছিল। পরে জীবনে যদি এমন কারও সঙ্গে দেখা হয়, যিনি সেই অভিভাবকের মতো দেখতে বা আচরণে কিছুটা মিল আছে, তাহলে অজান্তেই তার প্রতি অবিশ্বাস বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।

আবার উল্টো ঘটনাও ঘটে। আমরা অনেক সময় এমন মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হই, যারা আমাদের জীবনের ইতিবাচক কোনো ব্যক্তির মতো।
নিজের আবেগ ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন থাকলে এই প্রবণতাগুলো বোঝা সহজ হয়।

আমরা যা ঘটবে বলে আশা করি, অনেক সময় সেই প্রত্যাশাই আচরণকে প্রভাবিত করে এবং শেষ পর্যন্ত ফলাফলকেও বদলে দেয়
ছবি: এআই/প্রথম আলো

৪. প্রত্যাশা থেকেই তৈরি হয় বাস্তবতা

আমরা যা ঘটবে বলে আশা করি, অনেক সময় সেই প্রত্যাশাই আচরণকে প্রভাবিত করে এবং শেষ পর্যন্ত ফলাফলকেও বদলে দেয়।

ধরুন, ব্যস্ত একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করা ওয়েটার মনে করলেন, ভালো পোশাক পরা অতিথিরা বেশি টিপস দেন। ফলে তিনি তাঁদের বেশি যত্ন নিয়ে সেবা দিলেন, আর অন্যদের তুলনায় কম গুরুত্ব দিলেন। শেষে দেখা গেল, ভালো পোশাক পরা অতিথিরাই বেশি টিপস দিলেন। কারণ, তাঁরা ভালো সেবা পেয়েছেন।

এভাবেই তৈরি হয় ‘সেলফ-ফুলফিলিং প্রোফেসি’। অর্থাৎ আমরা যা সত্যি হবে বলে ধরে নিই, সেই বিশ্বাসের কারণে এমনভাবে আচরণ করি যে শেষে সেটাই সত্যি হয়ে দাঁড়ায়। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিজের বিশ্বাসকে চূড়ান্ত সত্য না ধরে পরীক্ষাযোগ্য ধারণা হিসেবে দেখা ভালো।

আরও পড়ুন

৫. অস্বীকারের আশ্রয়

কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলে অনেক সময় মানুষ সেটিকে অস্বীকার করার চেষ্টা করে। এটিও একধরনের মানসিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

যেমন কেউ গুরুতর অসুস্থতার খবর পেলে প্রথমে মনে করতে পারেন, ‘এটা সত্যি হতে পারে না।’ আবার মাদকাসক্ত কেউ অনেক সময় নিজের সমস্যাটিই মানতে চান না।
কিন্তু বাস্তবতা অস্বীকার করলে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপই হলো, সমস্যাটি আছে, সেটি স্বীকার করা।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমরা পুরোপুরি পক্ষপাতমুক্ত হতে পারি না, এটাই মানুষের স্বভাব
মডেল: আজীম উদদৌলা ও ঐশী। ছবি: কবির হোসেন

শেষ কথা

সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমরা পুরোপুরি পক্ষপাতমুক্ত হতে পারি না, এটাই মানুষের স্বভাব। তবে এই মানসিক ফাঁদগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকলে আমরা অন্তত একটু থেমে ভাবতে পারি। আর সেই সামান্য বিরতিই অনেক সময় ভালো সিদ্ধান্তের পথ খুলে দেয়।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে

আরও পড়ুন