ইংরেজি শিক্ষায় নতুন ভাবনার খোঁজ

৯ অক্টোবর ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) স্থায়ী ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে ইউল্যাব–টেসল বিডি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ইএসপি সম্মেলন ২০২৬
ছবি: শুভ্র কান্তি দাস

কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি। অথচ বিদেশে কাজ করতে গিয়ে দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যেই চোস্ত ইংরেজি শিখে ফেলেছেন, এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। অন্যদিকে ১২ থেকে ১৬ বছর পাঠ্যক্রমে ইংরেজি থাকার পরও আমাদের অনেক স্নাতক সাহস করে ইংরেজি বলতে পারেন না। ইন্টারভিউ ও অফিসে ইংরেজি বলতে ভয় পান। ই–মেইল লিখতেও দ্বিধায় পড়েন। তাহলে ইংরেজি শেখার সাফল্য কি শুধু পরীক্ষার ফলাফলে, নাকি বাস্তব জীবনে ভাষাটি ব্যবহার করতে পারার মধ্যেও?

এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই ৯ অক্টোবর ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) স্থায়ী ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে ইউল্যাব–টেসল বিডি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ইএসপি সম্মেলন ২০২৬। ইউল্যাবের সেন্টার ফর ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজ ও টেসল সোসাইটি অব বাংলাদেশ যৌথভাবে দিনব্যাপী এই সম্মেলন আয়োজন করে। সহযোগী হিসেবে ছিল প্রথম আলো।

আরও পড়ুন

এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ফ্রম মার্জিন টু মেইনস্ট্রিম: রিস্ট্রাকচারিং ইনস্টিটিউশনাল ইএসপি ফর সাসটেইনেবল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট’। অর্থাৎ নির্দিষ্ট প্রয়োজনের জন্য ইংরেজি শিক্ষা বা ইংলিশ ফর স্পেসিফিক পারপাসেসকে (ইএসপি) শিক্ষাব্যবস্থার প্রান্তিক বিষয় হিসেবে না দেখে মূলধারায় নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ইএসপির ধারণাটা সহজ। সবার জন্য একই ধরনের ইংরেজি শেখানোর পরিবর্তে শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, পেশা কিংবা কাজের প্রয়োজন অনুযায়ী ভাষা শেখানো। একজন গণমাধ্যমকর্মীর সংবাদ লেখা ও সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য যে দক্ষতা প্রয়োজন, একজন প্রকৌশলী, আইনজীবী বা ব্যাংকারের চাহিদা তাঁর চেয়ে আলাদা। তাই শুধু ব্যাকরণ ও শব্দভান্ডার শেখানো নয়, কোন পরিস্থিতিতে ভাষাটি ব্যবহার করতে হবে, সেটিও শিক্ষার অংশ হওয়া দরকার।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, ইংরেজিতে কথা বলার আত্মবিশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শুধু ভাষা জানলেই কর্মজীবনে সফল হওয়া যায় না। ব্যবসা, প্রকৌশল, অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রে কাজ করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জ্ঞান ও বোঝার সক্ষমতাও প্রয়োজন।

ইউল্যাবের উপাচার্য সামসাদ মর্তূজার বক্তব্যেও উঠে আসে শেখা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যকার ব্যবধান। তাঁর ভাষায়, ‘১২ বছর স্কুলের শিক্ষা শেষ করার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষার্থীদের যদি আবার প্রাথমিক পর্যায়ের ইংরেজি শেখাতে হয়, তাহলে তা জাতীয়ভাবে লজ্জার বিষয়। আমাদের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আমরা কেন শিক্ষার্থীদের অনুচ্ছেদ বা রচনা লেখার মতো বিষয় শেখাব? শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শিক্ষার জন্য অনেক টাকা টিউশন ফি দেয়। অথচ তারা কী শিখতে চায়, আর বাস্তবে তাদের কী শেখানো হচ্ছে—এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে।’

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ
ছবি: শুভ্র কান্তি দাস

এই ব্যবধান কমাতে শিক্ষকদের বাস্তব কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে ধারণা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেন সামসাদ মর্তূজা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক মাসুমা হাবিব বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করে তুলতে ইংরেজি শিক্ষাকে পেশাগত জগতের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।

ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের প্রসঙ্গ তোলেন কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এক সাক্ষাৎকারে আমি বলেছিলাম, আমার জীবনে একটা আফসোস আছে, আমি ইংরেজিতে দুর্বল। আবার জন্ম নিলে আমি ইংরেজি শিখব। এই সাক্ষাৎকার পড়ে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী আমাকে বলেছিলেন, আরেকবার জন্ম নিতে হবে না। এখন থেকেই শিখতে শুরু করো। আমার বুয়েটের বন্ধুরা যাঁরা বিদেশে আছেন, তাঁরা বলেন বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা স্মার্ট। কিন্তু তাঁরা পিছিয়ে পড়েন শুধু নিজেকে ঠিকমতো উপস্থাপন করতে পারেন না বলে।’ আনিসুল হকের মতে, ইংরেজি শেখার পাশাপাশি তা ব্যবহারের আত্মবিশ্বাস অর্জনও জরুরি।

সম্মেলনের প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রিয়েলি ইংলিশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাইজেল কিলিক। গোলটেবিল আলোচনায় তিনি বলেন, ‘ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আমার অভিজ্ঞতায় এশিয়ার পূর্বাঞ্চলের অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে আছে। যুক্তরাজ্যেও আমরা এমন শিক্ষার্থী পাই, যাঁদের আইইএলটিএস স্কোর ৬ দশমিক ৫, কিন্তু বাস্তবে ইংরেজি ব্যবহারের দক্ষতা সেই মানের নয়। জাপানের মতো দেশে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইংরেজি শেখানোর দায়িত্ব নিতে হয়। আমার মতে, এটি সঠিক পদ্ধতি নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্ত হওয়া উচিত।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার ব্যবধান কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন ইউল্যাবের সেন্টার ফর ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজের পরিচালক ও সম্মেলন আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ফাহিম হাসান। সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণা ও আলোচনার ফলাফল কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে ইউল্যাবের পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা এবং কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

ব্যাংক, আইন, প্রকৌশল, শিক্ষকতা ও এনজিও খাতের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল আলোচনায় কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে ইংরেজি শিক্ষার সংযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পেশাগত ই–মেইল লেখা, প্রতিবেদন তৈরি, উপস্থাপনা ও ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরির প্রস্তাব উঠে আসে।

সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপনা, কর্মশালা, ঘটনাভিত্তিক বিশ্লেষণেরও আয়োজন ছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ রাইহান এম শরীফ ইংরেজি চর্চার বাস্তব সুযোগ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। তাঁর মতে, পডকাস্ট, ভিডিও ও চলচ্চিত্রের মতো উপকরণ শিক্ষার্থীদের ভাষা ব্যবহারের অনুশীলনে সহায়তা করতে পারে।

সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কোবরা বলেন, শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ পেশার চাহিদা অনুযায়ী ইংরেজি শেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এআইকে আত্মোন্নয়ন ও ভাষাচর্চার সহায়ক হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে।

সম্মেলনটির সমাপনী অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আখতার ইমাম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের ম্যানেজিং পার্টনার ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। বাংলাদেশের কর্মবাজারের পাশাপাশি বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।