ঢাকার যে ছাদবাগানে ড্রাগন ফলে মণকে মণ
যাত্রাবাড়ীর দনিয়া-দোলাইরপাড় রোডের বাড়ি ‘আওয়ার গ্রিন ভ্যালি’। আক্ষরিক অর্থেই যেন এক সবুজ উপত্যকা! নিজেদের ছয়তলা ভবনের ছাদে সবুজের স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছেন জহিরুল ইসলাম কবির ও ডালিয়া কবির দম্পতি।
বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সবুজে মোড়ানো চমৎকার বাড়িটায় গিয়ে হাজির হই একদিন। সবুজের চুল ছড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি দূর থেকেই নজর কাড়ে।
বিশেষ করে নজরে আসে সবার ওপরে থাকা বাতাসে দোল খাওয়া ড্রাগন ফলের সারি। আমার আগমন টের পেয়ে ছোট ছেলে ইসতিহাদ রুহাবকে নিয়ে নিচে নামলেন জহিরুল ইসলাম।
প্রথম পরিচয়েই ছোট্ট রুহাবের সঙ্গে এমন ভাব হয়ে গেল, যেন বহুদিনের পরিচয়! দুজনে গল্প করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে সরাসরি ছাদে উঠে গেলাম। এত দিন ফেসবুকের কল্যাণে মুঠোফোনের স্ক্রিনে দেখলেও আজ সরাসরি চোখের সামনে ধরা দিল চমৎকার এই সবুজের দুনিয়া।
ছাদের মাঝখানটা নিজেদের ব্যবহারের জন্য রেখে চারপাশ ঘিরে গড়েছেন লম্বাটে স্থায়ী সবজির বেড। সেই বেড থেকে লতানো সবজির জন্য সিঁড়িঘরের ছাদ পর্যন্ত উঠে গেছে মাচা।
আর সেই মাচা থেকেই ঝুলে থাকে ধুন্দুল, চিচিঙ্গা, উচ্ছে, করলা, শসা, চালকুমড়া, আঙুর, প্যাশন ফ্রুটসহ নানা লতানো সবজি। শীতে যোগ হয় লাউ, মিষ্টিকুমড়া, বরবটির মতো লতানো সবজি। একেক মৌসুমে একেক সবজি। ফলন শেষে কেটে দিলেই রোদে লতা শুকিয়ে যায়। তখন লতা টেনে নিচে নামিয়ে নিলেই আবার নতুন কোনো লতানো সবজির জন্য প্রস্তুত মাচা।
সামনে মাচার একটা অংশ শুধুই আঙুর ফলের জন্য ছেড়ে দেবেন। ১০ থেকে ১২ রকমের আঙুরের চারা এরই মাঝে সংগ্রহ শেষ। মাচা থেকে ঝুলবে থোকা থোকা আঙুর। নিচে দোলনায় দোল খেতে খেতে কিংবা টেবিল পেতে খাবার খেতে খেতে সেই দৃশ্য উপভোগ করা যাবে। আবার পাকা আঙুরের স্বাদও নেওয়া যাবে।
ফল ও ফুলের সমাহার
বেডে সবজির পাশাপাশি ঠাঁই নিয়েছে অনেক রকমের ফলফলারির গাছ। আম্রপালি, সূর্য ডিম, আমেরিকান রেড পালমার, বারি ফোর, ব্ল্যাক স্টোনসহ ১২ রকমের আম, পেঁপে, মিষ্টি তেঁতুল, মালবেরি, জামরুল, আপেল, কমলা, করমচা, গোলাপজাম, লুকলুকি, পারসিমন, আলুবোখারা, বরই, আনারসসহ আছে অনেক ফল গাছের উপস্থিতি। কাঠগোলাপ থেকে শুরু করে রেইনলিলি, ক্রিনাম লিলি, ব্যাটলিলি, নাইট কুইন, হাসনাহেনা, বাগানবিলাস, কাঁটামুকুট, করবী, চন্দ্রপ্রভা, কদম, শাপলা, পদ্মসহ প্রায় ২০০ রকমের ফুল।
ড্রাগনের সাম্রাজ্য
মূল ছাদ থেকে লোহার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই চোখে পড়ে নিচের মতোই বেডে বসানো ফুল ও ফলের গাছ। এখানে করবী, চন্দ্রপ্রভা ফুল থেকে শুরু করে আছে বারোমাসি আমড়া, জাম্বুরা, চেরি ফল, পেয়ারা, আতা, মেহেদি, সফেদা, কলাসহ দুই সারি ড্রাগন ফল গাছ।
তবে ড্রাগনের সাম্রাজ্য দেখতে হলে আরও একটা মই বেয়ে উঠতে হবে পানির ট্যাংকের ছাদে! জি, ঠিকই পড়েছেন। সিঁড়িঘরের ছাদ থেকে ৪ ফুট উচ্চতায় ২০ ফুট দৈর্ঘ্য আর ১০ ফুট প্রস্থের পানির ট্যাংক। বৃষ্টিভেজা লোহার সিঁড়িতে সাবধানে পা রেখে রেখে ওপরে উঠতেই চোখ আমার ছানাবড়া!
পানির ট্যাংক তো নয়, যেন একটুকরো সবুজ ফসলের মাঠ। মাঝের পুরোটা অংশ কলমি শাকের সবুজ চাদরে ঢাকা আর তার চতুর্দিকে খুব ঘন করে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে ড্রাগন ফলের সৈন্যবাহিনী! পাতাহীন কাঁটাযুক্ত সবুজ কাণ্ড যেন এক একটি তলোয়ার।
সেই তলোয়ারের মাথায় ঝুলছে লাল রঙের ড্রাগন, কোথাও–বা হলুদ রঙের ড্রাগন। একই গাছের কোনো ডালে সবুজ কাঁচা ফল তো কোনো ডালে উঁকি দিচ্ছে নতুন ফুলের কলি। ঘুরে ঘুরে নিজের গড়া এই ড্রাগন ফলের সাম্রাজ্য দেখাচ্ছিলেন জহিরুল ইসলাম। অন্য কারও সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি—একা নিজেই সামলেছেন পুরো কাজ।
যেভাবে শুরু
২০২১ সালে ছাদবাগানে ড্রাগনের আগমন। শুরুতে অল্পসংখ্যক গাছ নিয়ে মূল ছাদে অন্যান্য সব ফল গাছের সঙ্গেই ছিল ড্রাগন। কিন্তু ড্রাগন ফল ক্যাকটাসজাতীয় কাঁটাযুক্ত গাছ বলে ছাদে চলাফেরায় সমস্যা হচ্ছিল। বিশেষ করে শিশুদের জন্য।
এমন বিপত্তি এড়াতে ২০২৩–এর দিকে ট্যাংকের ওপরে সরিয়ে নেন ড্রাগনবাগান। সাত হাজার টাকা খরচ করে নাটোর থেকে ১৫০টি ড্রাগন ফলের চারা এনেছিলেন। সেই চারা পানির ট্যাংকের ওপরে থাকা মাঝের ফসলি জমিটা বাঁচিয়ে চারপাশে সরু বেড করে পরপর রোপণ করে দিলেন।
পিভিসি পাইপ, রড, সিমেন্ট আর জিআই তার দিয়ে নিজেই তৈরি করে নিলেন লম্বাটে এক ড্রাগন ফলের মাচা। রাতে ফুলের পরাগায়ন করতে আসতে হয়, তাই অন্ধকার দূর করার জন্য বৈদ্যুতিক বাতিরও ব্যবস্থা করলেন।
রোপণ–পরবর্তী পরিচর্যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে গাছ বড় হতে থাকলে ডালপালা ছেঁটে মাচার উচ্চতা পর্যন্ত তুলেছেন। মাচায় ওঠা পর্যন্ত গাছের মূল কাণ্ড ছাড়া আর কোনো শাখাপ্রশাখা রাখা হয় না। মাচায় ওঠার পর শাখাপ্রশাখা মেলে ফুলে ফুলে রাজ্য সাজাতে থাকে লাল ও হলুদ রঙের ড্রাগনরা।
ড্রাগন ফুলের পরাগায়ন
যেহেতু ড্রাগন ফুল ফোটে রাতের বেলা, তাই রাতে পরাগায়ন ঘটানোর মতো তেমন কীটপতঙ্গের উপস্থিতি দেখা যায় না। ফলে ড্রাগনের সর্বোচ্চ ফলন নিশ্চিত করতে নিজেরাই হাত দিয়ে কৃত্রিম পরাগায়ন করে দিতে হয়, বললেন ডালিয়া কবির।
সাধারণত সন্ধ্যার পর ফুল ফুটতে শুরু করে। রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে পরাগায়ন ঘটাতে ছাদে ওঠেন তাঁরা। প্রথমে একটা বাটিতে ব্রাশ দিয়ে সব ফুলের পরাগরেণু সংগ্রহ করা হয়।
সব ফুলের রেণু সংগ্রহ করা হয়ে গেলে ব্রাশ দিয়ে সেই পরাগরেণু তুলে তুলে প্রতিটা ফুলের মাঝে ওপর দিকে উঠে ফলের আকৃতিতে থাকা গর্ভমুণ্ডে দিতে হয়। এভাবে পরাগায়ন ঘটালে যেমন সর্বোচ্চ ফলন নিশ্চিত হয়, তেমনি ফলের আকারও ভালো হয়।
ফলন সংগ্রহ
ফল বড় হয়ে সবুজ থেকে জাতভেদে লাল ও হলুদ রং ধারণ করে। তবে ডালিয়া কবির জানান, ফলে রং এলেই সংগ্রহ করতে নেই। কমপক্ষে পাঁচ দিন গাছে রেখে পরিপক্বভাবে পাকতে দিতে হয়। তাতে ফলের মিষ্টতা বাড়ে।
তবে ফল পাকা শুরু হলেই পাখিদের উপদ্রব বাড়ে। ঠুকরে ঠুকরে ফল নষ্ট করে। তাই ফল পাকার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগিং করে দিলে ফল রক্ষা করা যায়। যে ফলগুলো হাতের নাগালের বাইরে ঝুলতে থাকে, সেগুলোর বেশির ভাগই অবশ্য পাখিদের পেটে যায়।
বাগান ঘুরে ঘুরে ড্রাগন ফল দেখানোর মাঝে কিছু পাকা ফল পাড়তে পাড়তে জহিরুল ইসলাম হলুদ ড্রাগন সম্পর্কে এক মজার তথ্য দেন, একই গাছে লাল ড্রাগন ‘যেমন খুশি তেমন’ ফললেও হলুদ ড্রাগন ফল আসে জোড়ায় জোড়ায়!
কেমন ফলন হয়? এর উত্তরে বলেন, বছরে প্রায় দুই থেকে তিন মণ ড্রাগন ফল নামে ছাদের এই পানির ট্যাংকের ওপর থেকেই। কোনো বিক্রির উদ্দেশ্য নয়, পরিবারের পুষ্টি চাহিদা মেটাতেই এই ড্রাগনগুলো সব ব্যয় হয়। নিজেদের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এমনকি বাড়ির ভাড়াটেদের সঙ্গেও শেয়ার করেন ছাদবাগানের সুমিষ্ট এই ড্রাগন ফল।
নতুনদের জন্য পরামর্শ
ছাদে যাঁরা ড্রাগন ফল করতে চান, তাঁদের জন্য পরামর্শ হলো, ভালো মানের গাছের ডাল সংগ্রহ করা। কিংবা নার্সারি থেকে ভালো মানের চারা সংগ্রহ। চারা রোপণের প্রথম এক বছর কোনো শাখা না রেখে গাছকে বাড়তে দেওয়া।
একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় এলে ডাল না কেটে ঝোপমতো হতে দেওয়া। ফুল এলে কৃত্রিম পরাগায়ন করা, তাতে ফলের সাইজ বড় হয় এবং ফলনও বেশি হয়।
আর গাছের খাবার হিসেবে যেকোনো জৈব সার ও খৈল পচা পানি নিয়মিত বিরতিতে দিয়ে গেলেই হলো।
সবশেষে বাগানের ড্রাগন ফল খেয়ে এবং কিছু সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যা নামতে বাড়ির পথ ধরলাম।