মনের অজান্তে ওর একটা ফোন, একটা মেসেজের জন্য অপেক্ষা করি

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে লেখা আহ্বান করেছিল প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভালোবাসার টক–ঝাল–মিষ্টি গল্প লিখে পাঠিয়েছেন পাঠক। কেউ লিখেছেন দুরন্ত প্রেমের গল্প, কেউবা শুনিয়েছেন দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়ার অনুভূতি। তেমনই একটি লেখা পড়ুন এখানে।

ছবি: এআই/প্রথম আলো

ছেলেটার কথা বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ এক মাস আগেও সব ঠিক ছিল। ছোটবেলা থেকেই ওদের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক, আমার চাচির বোনের ছেলে, আমার চেয়ে বছর পাঁচেক ছোট হবে।

আমার ছোট ভাইয়ের বিয়ে ছিল, এর মধ্যে নতুন করে ওর সঙ্গে ইন্টারঅ্যাকশন হলো।

আমি ইশা, বয়স ৩৫, পেশায় ডাক্তার। দুটি ছোট বাচ্চা আছে, এ জন্য আপাতত কিছু করা হচ্ছে না। যাহোক, বিয়েতে হাজারটা কাজের মধ্যে হইচই–হট্টগোল সবকিছুই চলছিল, ভাইয়ের বন্ধুরা আমাদের কাজিনরা সব একসঙ্গে থাকা-খাওয়া, যাওয়া-আসা খুব ভালো আর আনন্দের মধ্যে দিনগুলো কেটে গেল, প্রায় এক মাস!

প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো প্রোগ্রাম।

এত কিছুর মধ্যে হঠাৎ কিছু একটা খুব বদলে গেল, আমার মন।

আমরা দুজনেই মনে হয় বুঝতে পারছিলাম, এরপর সেভাবে আমাদের আর দেখা হবে না। ইচ্ছা করলেই বাইরে দেখা করা যায়; কিন্তু আমরা দুজনই আমাদের সীমানা জানি, জানি কোথায় থামতে হয়।

আর বদলানোটা এতটাই আকস্মিক ছিল যে নিজেকে ধরে রাখার সময় পাইনি, আর এতটাই তীব্র ছিল যে আমার দিন–রাতের হিসাব ওলট–পালট হয়ে গেল। আমার চেঞ্জটা ঠিক কখন থেকে বুঝতে না পারলেও ওর চেঞ্জটা আমার চোখ এড়ায়নি। একটা প্রোগ্রামে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ভাইয়া আসবে না? ‘না’ বলতেই কেন যেন মনে হলো ও বেশ খুশি হলো! এ রকম হওয়ার কথা না, আমার বরকে পছন্দ করে না ১০ বছরের বিবাহিত জীবনে, এ রকম কাউকে আজ পর্যন্ত পাইনি! আরেক দিন একটা প্রোগ্রামে আমার বরকে দেখে ও যে হতাশ হলো, সেটা আমার চোখ এড়িয়ে যায়নি। আরও একটা ব্যাপার সেদিন টের পেলাম, ও চলে যাওয়ায় আমার খুব মন খারাপ হলো—খুবই। কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল।

এর পর থেকে আমার অস্থির লাগা শুরু হলো, ঠিক করলাম ওকে জানাব, কিন্তু কেন এমন ঠিক করলাম জানি না। হয়তো আমি চাচ্ছিলাম, ও ওর কথাটা বলুক।

যখন বললাম তখন প্রথমে না বোঝার ভান করল, এরপর বললাম, মনে হয় এটা সাময়িক, তখন মনে হলো একটু অপ্রস্তুত হলো, হয়তো একটু হতাশও।

ও আমাকে কখনোই ফোন মেসেজ দিত না, আমিই হুটহাট ফোন মেসেজ দিতাম। আমার কেন যেন খুব ওর টাচে থাকতে ইচ্ছা করত।

একদিন বুঝলাম আমার মেসেজে সে খুব অপ্রস্তুত হয়। এরপর আর যোগাযোগ করিনি। কিন্তু শেষ যেদিন দেখা হলো আমার বাসায়, সেদিন ওর খুব মন খারাপ ছিল মনে হলো। আমারও খুব খারাপ লাগছিল কেন যেন। আমরা দুজনেই মনে হয় বুঝতে পারছিলাম, এরপর সেভাবে আমাদের আর দেখা হবে না। ইচ্ছা করলেই বাইরে দেখা করা যায়; কিন্তু আমরা দুজনই আমাদের সীমানা জানি, জানি কোথায় থামতে হয়। সেদিন ও আমার দিকে তাকাচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল তাকালে ধরা পড়ে যাবে। যতবারই কাছাকাছি ছিলাম, মনে হচ্ছিল একটা অদ্ভুত অনুভূতি, অদৃশ্য সুতা আমাদের জড়িয়ে আছে।

ওর শেষ মেসেজটা আমার আর ওর দুজনের জন্যই রিয়ালিটি চেক ছিল, যেটা আমি বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু কিছুই করার ছিল না।

ঠিক করলাম কিছুদিন দূরে থাকাই ভালো হবে, এখনো সেই পর্বে আছি, কিন্তু তা–ও মনের অজান্তে ওর একটা ফোন, একটা মেসেজের জন্য অসম্ভব অস্থির হয়ে অপেক্ষা করি।

রবীন্দ্রনাথের সেই লাইন দুটি এখন খুব সত‍্যি মনে হয়, ‘প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস, তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ!’

আরও পড়ুন