ক্যাম্পাসে শাড়ি–পাঞ্জাবি দিবস, শিক্ষার্থীরা বলেন ‘শা–পা ডে’
ক্লাসভর্তি সবার পরনে একরঙা শাড়ি-পাঞ্জাবি। আচমকা দেখে মনে হতে পারে, এটাই বুঝি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইউনিফর্ম’! আদতে এটি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের শাড়ি-পাঞ্জাবি দিবসের চিত্র। প্রতিবছর বিভিন্ন বিভাগের বিদায়ী ব্যাচগুলো শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরে দিবসটি উদ্যাপন করে। একেক বিভাগ বেছে নেয় একেক রং।
অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এই দিবস উদ্যাপনের চল রয়েছে। তবে ২০০৮ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে বিইউপির প্রতিটি ব্যাচের শাড়ি-পাঞ্জাবি দিবস উদ্যাপন যেন অঘোষিত নিয়ম হয়ে গেছে। বিদায় উপলক্ষে প্রতিটি ব্যাচেরই দুই দিনের আয়োজন থাকে। প্রথম দিন আয়োজনজুড়ে থাকে শাড়ি আর পাঞ্জাবি। শিক্ষার্থীরা সংক্ষেপে একে বলেন ‘শা-পা ডে’। সম্প্রতি ‘শা–পা ডে’ পালন করলেন বিইউপির শিক্ষার্থীরা।
নাম দিয়ে শুরু
ব্যাচের নাম ঠিক করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শাড়ি-পাঞ্জাবি দিবস উদ্যাপনের প্রস্তুতি। বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের আপার প্লাজায় প্রতিটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা শাড়ি-পাঞ্জাবিতে একসঙ্গে একটি ছবি তোলেন। জাতীয় পতাকা এবং বিইউপির পতাকাকে পেছনে রেখে সবার একসঙ্গে ছবি তোলার চল অনেক দিনের। দলগত ছবিটি সম্পাদনা করে এর সঙ্গে ব্যাচের নাম যুক্ত করা হয় হয়। সন্ধ্যার মধ্যেই সম্পাদিত ছবি সবার ফেসবুক প্রোফাইলের কাভার ফটোতে জায়গা করে নেয়। এ জন্য সবার আগে নাম বাছাই করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলছিলেন, ‘নামসহ প্রতিটি ব্যাচের ছবি আমরা ডিপার্টমেন্টের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখি। আবার ফেসবুকেও দেওয়া হয়। তাই সবার আগে নামটা আমাদের ঠিক করতে হয়। ব্যাচের নাম হিসেবে সব সময় একটা সুন্দর এবং প্রাসঙ্গিক শব্দ বেছে নেওয়ার চেষ্টা থাকে।’ একই বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেমা তুজ্জান্নাত জানাচ্ছিলেন, নাম ঠিক করা হয় ‘গণতান্ত্রিক’ পদ্ধতিতে। প্রস্তাবিত নামগুলো থেকে মেসেঞ্জার গ্রুপে ভোটের মাধ্যমে নাম চূড়ান্ত করা হয়।
এবারও একেক বিভাগ একেক নাম বেছে নিয়েছে। যেমন সাংবাদিকতা বিভাগের নাম ছিল অদ্রিল ২২, পিস, কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস বিভাগের অগ্রদূত ২২, আইনের ঐক্যসপ্তক ২২...এমন আরও নানা কিছু।
রঙের লড়াই
নাম চূড়ান্ত করার পর শুরু হয় শাড়ি ও পাঞ্জাবির রং বাছাই। এখানেই বাধে বিপত্তি। ফাতেমা বলছিলেন, ‘আমরা গত মাস থেকে শাড়ি দেখা শুরু করি। কিন্তু এতগুলো মেয়ের পছন্দ এক জায়গায় করা প্রায় অসম্ভব। আবার অন্য ডিপার্টমেন্ট কি রং নিচ্ছে, সেটাও মাথায় রাখতে হয়।’ পছন্দের পাশাপাশি অনেকে আবার থিমকে গুরুত্ব দেন। পিস, কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস বিভাগের এবারের শাড়ির রং ছিল হালকা গোলাপি। এই বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আমাদের কাজ যেহেতু শান্তি নিয়ে, মাথায় ছিল হালকা কোনো রং। অনেক তর্কবিতর্ক শেষে হালকা গোলাপি রংটি জয়ী হয়।’ বিভিন্ন অনলাইন পেজ থেকে এসব শাড়ি কেনা হয়। ছেলেদের পাঞ্জাবি নেওয়া হয় মেয়েদের শাড়ির সঙ্গে মিল রেখে। বেশির ভাগ সময় আয়োজনের আগের দিন শুরু হয় পাঞ্জাবি কেনার তোড়জোড়। আইন বিভাগের কাওসার জারীফ বলছিলেন, ‘এবার আমি গিয়েছিলাম পাঞ্জাবি কিনতে। মোবাইলে ছবি পাঠাচ্ছিলাম গ্রুপে, কিন্তু ছবিতে রংটা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। নানা আপত্তি আসতে থাকে। নিয়ে আসার পরে অবশ্য সবাই রংটা পছন্দ করেছে।’
স্মৃতিতে ‘শা-পা’
শাড়ি-পাঞ্জাবি দিবস ঘিরে নানা পরিকল্পনা থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মির্জা সাবিহা জানালেন, বিইউপিতে পোশাকের কিছু বিধিনিষেধ আছে। মেয়েরা শাড়ি পরতে পারলেও নববর্ষের মতো উৎসব ছাড়া অন্যান্য সময়ে ছেলেরা পাঞ্জাবি পরতে পারেন না। সাবিহা বলেন, ‘শা-পা ডেতে ছেলেরা পাঞ্জাবি পরার সুযোগ পায়। তখন শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে সবাইকে একসঙ্গে সুন্দর লাগে। এই স্মৃতি ধরে রাখতে নানা প্ল্যান থাকে।’ দলগত ছবি ছাড়াও বন্ধুরা ছোট ছোট দল ক্যাম্পাসের নানা জায়গায় ছবি তোলে। মেহেদী বলছিলেন, ‘আগে থেকেই ঠিক করা হয় কী কী ধরনের ছবি তোলা হবে। ক্যাম্পাস নিয়ে ট্রেন্ডি রিলসগুলো রিক্রিয়েট করা হয়। কখনো কখনো এটার জন্য প্র্যাকটিসও করা হয়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক তাবাসসুম নুহা। তিনি আবার এই বিভাগেরই প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। স্মৃতি হাতড়ে বললেন, করোনা মহামারির কারণে স্নাতক শেষের সময়টা ক্যাম্পাসে আসতে পারেননি। তাঁরা শাড়ি-পাঞ্জাবি দিবস উদ্যাপন করেছিলেন স্নাতকোত্তরের শেষে। তিনি বলেন, ‘আজ যখন বিইউপিতে শিক্ষার্থীদের শা-পা দিবস উদ্যাপন করতে দেখি, তখন যেন নিজের সেই দিনগুলোতে ফিরে যাই। এদিন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলিয়ে একই রঙের শাড়ি পরে আসতে চেষ্টা করি। ফলে স্মৃতির সঙ্গে একটু হলেও সংযোগটা রক্ষা হয়।’ এই উদ্যাপনের সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনের অংশ হয়ে থাকবে, এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি।