‘মৃত্যুকে কাছে থেকে দেখেছি’—কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশির লেখা
ভারতের কলকাতায় নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে গতকাল মঙ্গলবার মাঝরাতে আগুন লাগে। ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ৯ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া ব্যক্তিরা বাংলাদেশের নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছেন কলকাতা পুলিশ ও স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস। আগুন লাগা ভবনেই ছিলেন বাংলাদেশি ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা অনিক কুণ্ডু। রাতের ঘটনার ট্রমা থেকে এখনো বের হতে পারেননি তিনি। এর মধ্যে তিনি মা–বাবাসহ বেঁচে বের হওয়ার অভিজ্ঞতা লিখেছেন ফেসবুকে। অনুমতি নিয়ে নিচে তাঁর সেই লেখাটি কিছুটা সম্পাদনা করে তুলে ধরা হলো।
আপনার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন যারা কলকাতা ভ্রমণে এসেছে বা ডাক্তার দেখাতে কলকাতা এসেছে তাদের খোঁজ নিন। গতকাল (১৯ আগস্ট) রাত ২টায় মির্জা গালিব স্ট্রিট, নিউমার্কেট এলাকায় ফায়ার ব্রিগেডের পাশের বিল্ডিং–এ আগুন লাগে।
উল্লেখ্য, এই বিল্ডিংসহ আশেপাশে এলাকা বাংলাদেশ অধ্যুষিত (বাংলাদেশিরা কলকাতায় এলে সাধারণত এই এলাকায় বেশি থাকেন) । রাত ২টায় আগুন লাগে লবিতে ২য় ফ্লোরে। আমরা থার্ড ফ্লোরে ছিলাম। আমি, বাবা, মা ও পাশের রুমের কাপল ও তাঁদের বাচ্চা ও একটা ভাইয়া সবাই বাংলাদেশি আটকে গিয়েছিলাম।
সিঁড়িতেও আগুনের প্রচন্ড ধোঁয়া থাকায় আমরা কোনভাবে ছাদে যেতে বা নিচে নামতে পারছিলাম না। কোনমতে বাথরুমের জানালা (ভেন্টিলেটর) খুলে ফায়ার সার্ভিসে কল দিয়ে জানাই যে আমরা চারতলায় আটকে আছি, আমাদের বাঁচান। নিশ্বাস নিতে পারছি না।
ইতমধ্যে বিল্ডিং-এর কাচ, এসি ব্লাস্ট করতে থাকে। আগুন মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আনার কিছুক্ষন আগে ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা আমাদের উদ্ধার করে নিচে নামাতে সক্ষম হয়। মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। যত দূর জানি আমার চোখের সামনে ৩টি অ্যাম্বুলেন্সে মৃত/আহত দেহ নিয়ে গেছে। এখন বিল্ডিং–এ কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। কোন হোটেলে কেউ জায়গা দিচ্ছে না। সারা রাত বাইরে থেকে মাত্র (সকালে) অন্য একটি হোটেলে উঠলাম।
তবে অনেক মানুষ মারা গেছে। এর মাঝে পুরুষ, নারী, শিশুও আছে। অধিকাংশই বাংলাদেশী হতে পারে (বা ইন্ডিয়ান), এটা আমরা জানতে পারি নাই। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সাহায্যে আমার জিনিসপত্র একটু আগে বের করে এনে অন্য হোটেলে উঠেছি। সবাই সুস্থ আছি শারীরিকভাবে। ভগবানের অশেষ কৃপায় এ যাত্রায় বেঁচে গেছি।
বাথরুমে থাকা প্রতি ন্যানো সেকেন্ডে মনে হচ্ছিল আমরা আর বাঁচব না। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে চিকিৎসা করাতে এসে যেন মরতে এসেছি।
সিঁড়ি ও লিফটে যেমন আগুনের স্ফুলিঙ্গ দেখেছি, তা মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখার চেয়ে কম কিছু না। সবাই সুস্থ থাকুন। প্রতিটা শহর ঢাকা, কলকাতা-যেন একটা মরণ বোমা। কোথাও যেন অগ্নিনির্বাপক কোন ব্যবস্থা নাই। ব্যবসায়ীরা শুধু টাকা কামিয়েই যাবে? মানুষ জীবনের মূল্য ঠিক কোথায়? আমাদের অনেকের-ই অনেকের সঙ্গে শেষ দেখা হয়ে গেছে। যে যার সঙ্গে পারেন ভালো ব্যবহার করুন।