বাংলাদেশে বসেই অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ কলেজ, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন ও ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্কাশায়ারের কোর্স করার সুযোগ আপনারা দিচ্ছেন। মূল ক্যাম্পাসের মতো একই মান এখানেও ধরে রাখা হচ্ছে, সেটা কীভাবে নিশ্চিত করছেন?
অধ্যাপক হিউ গিল: প্রথম কথা হলো—পাঠ্যক্রম (কারিকুলাম) হুবহু এক। মেলবোর্ন বা লন্ডনে যা পড়ানো হচ্ছে, এখানেও তা-ই। লেকচার থেকে শুরু করে পরীক্ষার ধরন, প্রশ্ন, সেমিনার, কর্মশালা, সব এক। দ্বিতীয়ত, আমাদের অধিকাংশ শিক্ষকই বিদেশে পড়েছেন, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অনেকে বাইরের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজও করেছেন। আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে মোনাশের অ্যালামনাই আছেন। তৃতীয়ত, কোনো একটা প্রোগ্রামে যাঁদের যুক্ত করা হচ্ছে, তাঁরা প্রত্যেকেই পার্টনার প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত। অর্থাৎ মোনাশের প্রোগ্রাম যাঁরা পড়াচ্ছেন, মোনাশ সব যাচাই–বাছাই করেই তাঁকে অনুমোদন দিয়েছে। একই কথা ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন বা ল্যাঙ্কাশায়ারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তা ছাড়া প্রতিটি সেমিস্টার, টার্ম বা শিক্ষাবর্ষের পরই শিক্ষক বা কোর্স সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন মতামত নেওয়া হয়। আমি খুব খুশি যে আমাদের শিক্ষকেরা খুব ভালো করছেন। যেমন মেলবোর্নের শিক্ষকদের তুলনায়ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষকদের স্কোর ভালো।
আপনি নিশ্চয়ই একমত হবেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শেখা আর শেখানোর ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে আরও অনেক কিছু যুক্ত। যেমন ক্যাম্পাসের পরিবেশ, ক্লাবের কার্যক্রম, ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যোগাযোগ ইত্যাদি। যেগুলো আদতে একজন শিক্ষার্থীকে বাইরের দুনিয়ার জন্য তৈরি করে। এসব ক্ষেত্রে আপনারা কীভাবে মান ধরে রাখছেন?
অধ্যাপক হিউ গিল: এটা ঠিক। আমরা তো স্কুল নই, বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে আসার প্রথম দিন থেকেই একজন শিক্ষার্থী সেই পরিবেশ পায়, যেটা একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর পাওয়া উচিত। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অনলাইন লাইব্রেরি শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করতে পারে। ভার্চ্যুয়াল লার্নিংয়ের পরিবেশ লন্ডন বা মেলবোর্নে যেমন, এখানেও তেমন। এ ছাড়া নাচ থেকে শুরু করে আলোকচিত্র, নানা ধরনের ক্লাব আমাদের আছে। প্রতিদিনই কিছু না কিছু হচ্ছে। এখন যেমন বর্ষার ছবির প্রতিযোগিতা চলছে। কিছুদিন আগে সাহিত্য ক্লাব একটা অনুগল্প প্রতিযোগিতা করেছিল, যেটার বিচারকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি বেশ বিপাকে পড়েছি (হাসি)। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসগুলো নিয়মিত পালিত হয়। এ ছাড়া বড় শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অলাভজনক সংস্থার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপ থেকে শুরু করে ‘ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট’, নানা ধরনের সুযোগ পায়। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীকে একটা পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা দিতে আমরা খুবই সচেষ্ট। এসবের মধ্য দিয়েই তো সে বড় হবে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাকে ভুল করার সুযোগ দিতে হবে। যেন ভুল থেকে সে শিখতে পারে। আমরা পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে কিছু বাড়তি কোর্সও করাই। ‘সামাজিক ও মানসিক দক্ষতা’ যেমন একটি জনপ্রিয় কোর্স। এখানে আমরা শিক্ষার্থীদের সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার কৌশলগুলো শেখাই।
উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশ হওয়ার পথে সব তোমাদের আছে। যেটার অভাব, সেটা হলো দক্ষ জনশক্তি। বাংলাদেশের এখন এমন জনশক্তি দরকার, যাঁরা ভিনদেশি ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করবে না, বরং নিজেদের একটা ‘ব্র্যান্ড’ বানাবে।অধ্যাপক হিউ গিল, ইউনিভার্সেল কলেজ বাংলাদেশের (ইউসিবিডি) প্রেসিডেন্ট ও প্রোভোস্ট
আপনাদের কোনো একজন সফল অ্যালামনাইয়ের কথা বলতে পারেন?
অধ্যাপক হিউ গিল: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা এখনো অপেক্ষাকৃত নতুন। ফাউন্ডেশন প্রোগ্রামগুলোতে এমন অনেককে পেয়েছি, যাঁরা এখন বিশ্বের নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব ভালো করছে। জীবনযাত্রা ও পড়ালেখার খরচসহ শতভাগ বৃত্তি পাচ্ছে, এমন শিক্ষার্থীও আছে। তবে এখনো ওদের ডিগ্রি শেষ হয়নি। আশা করি, ফাউন্ডেশন প্রোগ্রাম থেকে পাওয়া প্রথম গ্র্যাজুয়েট ব্যাচ আমরা এ বছরই পাব। এ ছাড়া পুরোপুরি বাংলাদেশে থেকেই ডিগ্রি নিচ্ছে, এমন গ্র্যাজুয়েট ব্যাচ আশা করি আগামী বছর আগস্টে বেরোবে। জানিয়ে রাখি, আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা পড়ালেখা এখানে করলেও চাইলে মূল ক্যাম্পাসের সমাবর্তনে অংশ নিয়ে ডিগ্রি গ্রহণ করতে পারে।
আমি দেখেছি, আপনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে যান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। কী মনে হয়, এই ছাত্রছাত্রীদের সবচেয়ে বড় বাধা কী? আপনি তো শুধু শিক্ষক নন, একজন মনোবিদও। সেই জায়গা থেকেই আপনার মতামতটা জানতে চাই।
অধ্যাপক হিউ গিল: ‘বাধা’ বলব না। আমি বরং বলব ‘সুযোগ’। এটা ঠিক যে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করেন। তাঁদের মধ্যে যাঁরা আন্তর্জাতিক মানে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পান, তাঁরা সংখ্যায় খুব অল্প। বাকিরা হয়তো দ্বিধায় ভোগেন কিংবা ভয় পান, ভাবেন আমি কী পারব? অথচ আমরা কিন্তু দেখছি তাঁরা খুব ভালো করছেন। অতএব ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই সুবিধাজনক জায়গায় আছে। যেমন অর্থনীতি, ভৌগোলিক অবস্থান। বিশ্ববাজারের একটা বড় অংশ বঙ্গোপসাগরের ওপর নির্ভর করে, সুতরাং সবাই-ই চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধা নিতে চায়। তা ছাড়া এ দেশে ২৫ বছরের কম বয়সীরা সংখ্যায় অনেক, সেটাও একটা দারুণ ব্যাপার। উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশ হওয়ার পথে সব তোমাদের আছে। যেটার অভাব, সেটা হলো দক্ষ জনশক্তি। বাংলাদেশের এখন এমন জনশক্তি দরকার, যাঁরা ভিনদেশি ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করবে না, বরং নিজেদের একটা ‘ব্র্যান্ড’ বানাবে।
দেশের অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে একধরনের আস্থার সংকট আছে, যেটা স্বাভাবিক। কারণ, এমনও হয়েছে, বিদেশি ডিগ্রির প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোনো একটা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছে, কিন্তু কথা রাখেনি। কারও হয়তো অনুমোদন নেই, কারও ক্যাম্পাস নেই। শিক্ষার্থীরা যে ইউসিবিডির ওপর নিশ্চিন্তে আস্থা রাখতে পারে, কীভাবে সেই নিশ্চয়তা দেবেন?
অধ্যাপক হিউ গিল: এই উদ্বেগটা আমি বুঝি। জানিয়ে রাখি, আমরাই প্রথম; যারা বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন নিয়ে সব প্রোগ্রাম অফার করছি। আমাদের অভ্যর্থনা ডেস্কের পেছনেই অনুমোদনের সব কাগজ প্রদর্শন করা আছে। তবু যদি আস্থা না পান, আপনি ঘুরেফিরে সব দেখতে পারেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিতে পারেন।
২০৩০ সালে আপনি ইউসিবিডিকে কোথায় দেখতে চান?
অধ্যাপক হিউ গিল: তখনো হয়তো এই ক্যাম্পাসটা থাকবে, তবে শুধু খণ্ডকালীন স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামগুলোর জন্য। তবে আমাদের মূল ক্যাম্পাস চলে যাবে সাঁতারকুলে। নিশ্চয়ই আমরা তখন আরও বেশি প্রোগ্রাম চালু করব। আরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পার্টনারশিপও হতে পারে।