চাল ধোয়া পানি কি সত্যিই চুল লম্বা করতে সাহায্য করে
বাংলাদেশসহ এশিয়ার নানা সংস্কৃতিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সৌন্দর্যচর্চায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে চাল ধোয়া পানি। একসময় যা ছিল দাদি-নানিদের ঘরোয়া যত্নের অনুষঙ্গ, আজ তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে আধুনিক সৌন্দর্যচর্চার দুনিয়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিউটি ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রচারে চাল ধোয়া পানিকে তুলে ধরা হচ্ছে লম্বা, ঘন ও স্বাস্থ্যকর চুল পাওয়ার এক জাদুকরি সমাধান হিসেবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে প্রশ্ন—ঘরোয়া এই উপাদান কি সত্যিই চুল লম্বা ও মজবুত করতে পারে? নাকি এটি কেবলই ট্রেন্ডের মোড়কে মোড়া অতিরঞ্জিত দাবি? চুলের জন্য চাল ধোয়া পানি সম্পর্কে যা যা জানা দরকার, সবই তুলে ধরা হলো।
চাল ধোয়া পানিতে কী কী থাকে?
চাল ধোয়া পানিতে প্রচুর পরিমাণে স্টার্চের পাশাপাশি ইনোসিটল, ভিটামিন ই, ভিটামিন বি, ম্যাগনেশিয়াম, ফাইবার, জিংক, ম্যাংগানিজ থাকে। এসব পুষ্টি উপাদানের অনেকগুলোই চুলের গঠন মজবুত করা, চুলের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চুলের পুষ্টি উপাদানের কী কী কাজ?
ভিটামিন ই
ভিটামিন ই-তে টোকোট্রিয়েনল নামের শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি অ্যালোপেসিয়া (যে রোগে চুল পড়ে যায়) আক্রান্ত ব্যক্তিদের চুল গজাতে সহায়তা করতে পারে।
ম্যাগনেশিয়াম
ম্যাগনেশিয়াম শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রয়োজনীয় একটি খনিজ। চুলের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও ম্যাগনেশিয়ামের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যেসব নারীর চুল ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে যাচ্ছিল, তাঁদের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ৯০ থেকে ১৮০ দিন ম্যাগনেশিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ফলে চুলের বৃদ্ধি ছিল স্পষ্ট।
ভিটামিন বি (বিশেষ করে বায়োটিন)
বায়োটিন চুলের বৃদ্ধির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বায়োটিনের ঘাটতি হলে চুল পড়তে পারে। কারণ, এটি কেরাটিন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেরাটিনই চুল ও নখের প্রধান গঠন উপাদান।
জিংক
চুল পড়ার সাধারণ সমস্যার একটি হলো জিংকের অভাব। এটি চুলের টিস্যু বৃদ্ধি ও মেরামতের জন্য অত্যাবশ্যক। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের শরীরে জিংকের ঘাটতি ছিল, তাঁদের ক্ষেত্রে জিংক সাপ্লিমেন্ট চুল পড়া কমাতে কার্যকর। অর্থাৎ পর্যাপ্ত জিংক চুলকে সুস্থ, মজবুত ও টেকসই রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
চাল ভেজানো পানি কি সত্যিই চুলের জন্য ভালো?
অনেকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলছে, চাল ভেজানো পানি চুল গজাতে সাহায্য করে। চীনের হুয়াংলুও গ্রামের মানুষেরা নিয়মিত চাল ভেজানো পানি ব্যবহার করেন এবং তাঁরা ‘বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা চুলের গ্রাম’ হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও নাম উঠিয়েছে।
তবে বৈজ্ঞানিকভাবে এখনো প্রমাণিত হয়নি যে চাল ভেজানো পানি চুলের বৃদ্ধি ঘটায়। চাল ভেজানো পানিতে থাকা ভিটামিন ও খনিজ চুলের জন্য উপকারী হলেও বেশির ভাগ গবেষণা হয়েছে যাঁদের শরীরে এসব উপাদানের ঘাটতি ছিল। সেসব গবেষণায় ভিটামিন ও খনিজ খাওয়ার মাধ্যমে কী প্রভাব পড়ে, তা দেখা হয়েছে—চুলে বাইরে থেকে লাগালে কী হয়, সেটা নয়।
চাল ভেজানো পানি কীভাবে তৈরি করবেন?
এটি তৈরির তিনটি জনপ্রিয় উপায় আছে—
১. অল্প সময় ভিজিয়ে রাখার পদ্ধতি
প্রথমে এক কাপ চাল ভালো করে ধুয়ে নিন। এরপর এর সঙ্গে দুই-তিন কাপ পরিষ্কার পানি যোগ করুন। চাল ৩০ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা পর্যন্ত পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। নির্দিষ্ট সময় পর চাল ছেঁকে যে পানি পাওয়া যাবে, সেটিই ব্যবহারযোগ্য চাল ধোয়া পানি।
২. সেদ্ধ–পদ্ধতি
চাল স্বাভাবিক নিয়মে রান্না করুন, তবে এবার পানির পরিমাণ সাধারণের চেয়ে একটু বেশি দিন। চাল ভালোভাবে সেদ্ধ হয়ে গেলে ছাঁকনি দিয়ে চাল আলাদা করে নিন। যে পানি থেকে যাবে, সেটিই চুলের যত্নে ব্যবহার করা যেতে পারে।
৩. ফারমেন্টেড পদ্ধতি
কেউ কেউ মনে করেন, চাল ভেজানো পানি দুই-তিন দিন রেখে দিলে এতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজের মাত্রা বেড়ে যায়। তবে আপনি যদি চাল ভেজানো পানি ব্যবহার করতে চান, তাহলে অল্প সময় ভিজিয়ে রাখার পদ্ধতিটিই সবচেয়ে ভালো। কারণ, পানি সেদ্ধ করলে কিছু ভিটামিন নষ্ট হয়ে যেতে পারে, আর ফারমেন্ট করলে তাতে ব্যাকটেরিয়া তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ব্যবহারের নিয়ম কী?
প্রথমে শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে নিন।
এরপর পুরো চুলে চাল ভেজানো পানি ঢেলে দিন।
২০ মিনিট রাখুন।
শেষে কুসুম গরম পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন।
চাল ভেজানো পানি ব্যবহারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে?
চাল ভেজানো পানি ব্যবহারে তেমন কোনো বড় ঝুঁকি নেই। তবে একজিমা থাকলে ও চুল পড়ার সমস্যা থাকলে এটা ব্যবহার করার আগে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: ওয়েব এমডি