‘ইংরেজি ভাষা শিক্ষা’ যখন পড়ালেখার বিষয়

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টনের অ্যাপ্লায়েড লিঙ্গুইস্টিকস প্রোগ্রামে পিএইচডি করছেন লাইলুন্নাহারছবি: লেখকের সৌজন্যে

ক্যাম্পাস সেন্টারের দোতলায় বসে কাজ করছি। সামনে ফাইনাল। তাই দিনরাত এক করে ল্যাপটপের সামনে বসে থাকতে হচ্ছে। এবারের কোর্স পেপারটা আমার খুব কাছের। কেননা, বিষয় হিসেবে নিয়েছি ‘বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার নীতিমালা’। একটু বড় পরিসরে, আবার খুব কাছ থেকে—দুভাবেই দেখার চেষ্টা করছি। কাজ করতে করতে মাঝেমধ্যেই চোখ চলে যায় জানালার দিকে, সামনে বিশাল আটলান্টিক। দূরদূরান্তের জাহাজ কিংবা আকাশে উড়ে যাওয়া বিমানের দিকে তাকালে মনে পড়ে যায়, একদিন আমিও ৮ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছিলাম। এখন পিএইচডি করছি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টনের অ্যাপ্লায়েড লিঙ্গুইস্টিকস প্রোগ্রামে।
আমার জন্ম মানিকগঞ্জ শহরে। বড় হয়েছি একটি সাধারণ পরিবেশে, পড়াশোনা করেছি সরকারি স্কুলে। ছোটবেলায় যখন প্রথম ইংরেজি শেখা শুরু করি, তখন মনে নানা প্রশ্ন জাগত। কেন হলো? কীভাবে হলো? অর্থটা কী? তবে সব প্রশ্ন ক্লাসে করা যেত না। আবার কিছু প্রশ্ন কীভাবে যে করব, বুঝে উঠতে পারতাম না। অনেক সময় কিছু বিষয় বুঝলেও মনে হতো কোথাও একটা ঘাটতি রয়ে গেল। সেই সময় ঘাটতিটা ধরতে না পারলেও বড় হতে হতে উপলব্ধি করেছি, একটা দ্বিতীয় বা বিদেশি ভাষা শেখার প্রক্রিয়া যতটা মনে হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল!

আরও পড়ুন

হাজার মাইল পেরিয়ে এখানে আসার যাত্রা কোনোভাবেই সহজ ছিল না। নানা সময়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি, বহু বাধা এসেছে, কখনো কখনো ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু থেমে থাকিনি। প্রতিটি সুযোগ থেকে নতুন করে শেখার চেষ্টা করেছি।
লিঙ্গুইস্টিকসে হাতেখড়ি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সব অভিজ্ঞতাই আমাকে শিখিয়েছে। দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দুই বছর শিক্ষকতা করেছি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পেপার প্রেজেন্ট করেছি। অংশ নিয়েছি বহু প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায়।
অনেক পরিশ্রমের পর ২০২২ সালে পূর্ণবৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে টিইএসওএল (টিচিং ইংলিশ টু স্পিকার্স অব আদার ল্যাঙ্গুয়েজেস) ও লিঙ্গুইস্টিকসে মাস্টার্স করতে আসি। পরে ২০২৫ সালে আবারও পূর্ণ অর্থায়নসহ বোস্টনে এসে পিএইচডি শুরু করি। আমার সৌভাগ্য, এমন একজন মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছি, যে নিজেও একজন পিএইচডি গবেষক। ঘরে হোক বা বাইরে, সব সময় সবচেয়ে ভালো বন্ধু হয়ে পাশে থাকে। তবে শৈশব থেকে এই পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শক্তি আমার মা-বাবা।
ইংরেজি ভাষা বাংলাদেশে ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ানো হয়। তবু প্রায়ই ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই ভাষা ব্যবহার করায় একধরনের সংকোচ, একধরনের ভীতি কাজ করে। এর একটা বড় কারণ হলো আমাদের দেশে এখনো বেশির ভাগ সময় ভাষা শেখাকে শুধু ব্যাকরণ শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। শিক্ষাদানের পদ্ধতিটাও ‘শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক’ নয়। নানা বৈষম্য আছে। দেশের সব জায়গায় সমানভাবে পেশাদার ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, প্রশিক্ষণ, বা রিসোর্সের সুযোগ নেই।
জটিলতা, বৈষম্য, সীমাবদ্ধতা আছে ঠিক; তবু আমি বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষকই পারেন এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে। এ কারণেই শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে আমার আগ্রহ ‘স্ক্যাফোল্ডেড টিচিং’ বা ধাপে ধাপে সহায়তা দিয়ে শেখানোর প্রতি। আমি প্রতিনিয়ত সিলেবাস, পড়ার উপকরণ, শেখার পদ্ধতি এমনভাবে সাজাই, যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থী শেখার ও অংশগ্রহণের সমান সুযোগ পায়। শিক্ষার্থীর আর্থসামাজিক ও মানসিক অবস্থানও আমার কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
স্বপ্ন দেখি, একদিন এ দেশের শিক্ষার্থীরা ‘ইনক্লুসিভ ক্লাসরুম’ পাবে, যেখানে বহুভাষিকতাকে সম্পদ হিসেবে দেখা হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থী তাঁর মাতৃভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয় ও জীবন অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে ইংরেজি শেখার সুযোগ পাবে।

আরও পড়ুন