মনের যত্ন নেবে এআই, শিক্ষার্থীদের উদ্যোগ
কম বয়সে হতাশা বা মানসিক চাপ যে কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে, নিজের জীবন থেকেই উপলব্ধি করেছিলেন রিদম মুন্সি। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী তিনি। গত বছর থেকেই ভাবছিলেন, শিক্ষার্থীদের মনের সুরক্ষায় একটা কিছু করবেন। অগ্রজ সানজিদা আশেকিনের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছিলেন ভাবনাটা। এ বছর বিএএফ শাহীন কলেজের এক বন্ধুর আত্মহত্যার ঘটনা আবারও নাড়া দেয় তাঁকে। কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করেন প্রবলভাবে। তখনই মাথায় আসে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় একটা কিছু করলে কেমন হয়? সমমনাদের সঙ্গে নিয়ে এভাবেই গড়ে তোলেন মনতরঙ্গ ডটকম, মানসিক স্বাস্থ্যসহায়ক একটি ওয়েবসাইট। রিদম মুন্সিই এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
মনতরঙ্গের গল্প
রিদমের ভাবনার বুননে একে একে যুক্ত হন বিএএফ শাহীন কলেজ, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ, ইউনিভার্সিটি অব সাইবারজায়া (মালয়েশিয়া), ঢাকা সিটি কলেজ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি বিজ্ঞান কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতেই গড়ে ওঠে মনতরঙ্গ। এখানে এক বিশেষায়িত এআই চ্যাটবটের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টাই বার্তা আদান–প্রদান করা যায়, অডিও আলাপে মন খুলে বলা যায় নিজের কথাও। দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আগ্রহী শিক্ষার্থীরা নিজ ক্যাম্পাসে মনতরঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ১০ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ওয়েবসাইটটি। মনতরঙ্গের মূলমন্ত্র—
‘আবেগ লুকিয়ে নয়, প্রকাশেই মুক্তি,
মনতরঙ্গ দেয় সাহস, ভালো থাকার যুক্তি।’
বন্ধুর এ পথে…
পরিকল্পনা অনুযায়ী ওয়েব ডেভেলপমেন্ট বা গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ তো চলছিলই। মূল চ্যালেঞ্জ ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিস্টেমটা বানানো। চারজন শিক্ষার্থী ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজ করেছেন দলগতভাবে।
মনতরঙ্গের এআই চ্যাটবট একজন ব্যবহারকারীকে ইতিবাচক জবাব দেয়, দেয় মনের যত্নের পরামর্শ। প্রযুক্তিগত দিকের দায়িত্বে থাকা ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী অর্ণব দত্ত জানান, প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্টের লিঙ্কও দিয়ে দেবে তাঁদের চ্যাটবট। সদ্য চালু হওয়া ওয়েবসাইটটির উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরা। মনতরঙ্গের সাইবার সিকিউরিটির দায়িত্বে আছেন ইউনিভার্সিটি অব সাইবারজায়ার শিক্ষার্থী শাহরিয়ার শানাজ।
তবে এআইতেই শেষ নয়
এআই চ্যাটবটের সহযোগিতা নেওয়ার অনন্য এক সুযোগ তো আছেই, মনতরঙ্গের ওয়েবসাইটে আরও আছে নানা অপশন। এ উদ্যোগে মানবসম্পদের দায়িত্বে থাকা গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী সামিহা মালিক জানান, তাঁদের ওয়েবসাইটে আছে মুড ট্র্যাকার, সেলফ কেয়ার ও মনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যায়ামের চর্চার অপশন। ওয়েবসাইটে থাকা টাইমার চালু করে ব্যায়ামের মাধ্যমে ‘শিথিলায়ন’ করতে পারবেন যে কেউ। পরিচয় গোপন রেখে মনের কথা লিখতেও পারবেন।
ওয়েবসাইটের সেলফ হেল্প অংশে আছে সমুদ্র, বৃষ্টি আর বাতাসের শব্দের মতো চমৎকার কিছু আবহ। এ আবহ হয়তো মনকে শান্ত করতে সাহায্য করবে। এসব সেবা আপনি পেয়ে যাবেন বিনা মূল্যে। শুধু ওয়েবসাইটে একটি প্রোফাইল খুললেই হলো।
বিশেষজ্ঞদের অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে সেবা গ্রহণ করলে সেটির জন্য অবশ্য ফি দিতে হবে। তবে নিতান্তই অসুবিধায় পড়লে শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যেও এ সেবা দেবেন বলে জানান সানজিদা আশেকিন, যিনি এ উদ্যোগের চিফ অপারেটিং অফিসার। তিনি বলেন, ‘এআই চ্যাটবট কখনোই একজন বিশেষজ্ঞের বিকল্প নয়; বরং না বলা কথা ভাগ করে নেওয়ার মতো এক বন্ধু হয়ে উঠতেই এআইকে কাজে লাগিয়েছি আমরা।’