হাম মানেই কেবল গায়ের র‍্যাশ নয়, এটি ক্ষতি করতে পারে স্নায়ুরও

অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা হামকে শুধু তীব্র জ্বর, কাশি এবং শরীরের লালচে দানাদার র‍্যাশ হিসেবেই দেখি। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, হাম কেবল একটি চর্মরোগ বা সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বর নয়; এটি শরীরের অন্যতম প্রধান অঙ্গ স্নায়ুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে হামের নিউরোলজিক্যাল বা স্নায়বিক জটিলতা অনেক সময় স্থায়ী পঙ্গুত্ব, এমনকি মৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়ায়।

শিশুদের ক্ষেত্রে হামের নিউরোলজিক্যাল বা স্নায়বিক জটিলতা অনেক সময় স্থায়ী পঙ্গুত্ব, এমনকি মৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়ায়ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

হামের প্রধান স্নায়বিক জটিলতা

হামের কারণে মূলত তিন ধরনের বড় স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে—


১. তীব্র হামজনিত এনকেফালাইটিস
এটি সাধারণত হামের র‍্যাশ বের হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা দেয়। হামে আক্রান্ত প্রতি এক হাজার রোগীর মধ্যে একজনের এই জটিলতা হতে পারে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে আছে তীব্র মাথাব্যথা, উচ্চমাত্রার জ্বর, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, হঠাৎ খিঁচুনি এবং রোগী অজ্ঞান বা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়া। অনেক ক্ষেত্রে এর ফলে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হয়।

২. এডিইএম
হাম সংক্রমণের এক থেকে দুই সপ্তাহ পর অনেক সময় শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভুলবশত নিজের স্নায়ুতন্ত্রকেই আক্রমণ করে বসে। একে বলা হয় ‘অ্যাকিউট ডিসেমিনেটেড এনকেফালোমায়েলাইটিস’ বা এডিইএম। ফলে শিশুর হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, ভারসাম্য হারানো কিংবা দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

আরও পড়ুন

৩. এসএসপিই (সবচেয়ে মারাত্মক)

হামের সবচেয়ে মারাত্মক স্নায়বিক জটিলতা হলো ‘সাবঅ্যাকিউট স্ক্লেরোসিং প্যানএনকেফালাইটিস’ বা এসএসপিই। এটি অত্যন্ত বিরল, কিন্তু শতভাগ প্রাণঘাতী। অবাক করার মতো বিষয় হলো, হাম হওয়ার ৫ থেকে ১০ বছর পর এই সমস্যা দেখা দেয়। হামের ভাইরাসটি মস্তিষ্কে সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায় এবং বছরের পর বছর ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস করতে থাকে। শুরুতে শিশুর আচরণে পরিবর্তন, পড়াশোনায় অমনোযোগিতা বা হাত-পা কাঁপা দিয়ে এটি শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে শিশু কথা বলা ও হাঁটাচলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসে মৃত্যু।

আরও পড়ুন

কখন সতর্ক হবেন

হামে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে একমুহূর্তও দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে—

  • হঠাৎ খুব বেশি খিটখিটে মেজাজ বা অস্বাভাবিক আচরণ।

  • শরীর অতিরিক্ত নেতিয়ে পড়া বা ডাকলে সাড়া না দেওয়া।

  • চোখে ঝাপসা দেখা বা চোখ ট্যারা হয়ে যাওয়া।

  • ঘাড় বা হাত-পা শক্ত হয়ে যাওয়া কিংবা খিঁচুনি হওয়া।

সময়মতো হামের টিকা (এমআর ভ্যাকসিন) নিশ্চিত করা হলে এসব মারাত্মক স্নায়বিক জটিলতা থেকে শিশুকে শতভাগ সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব
ছবি: ফ্রিপিক, কোলাজ: প্রথম আলো

প্রতিরোধই একমাত্র পথ

হামের নিউরোলজিক্যাল ফিচারের কোনো নির্দিষ্ট নিরাময় নেই; একমাত্র প্রতিরোধই হলো বাঁচার পথ। সময়মতো হামের টিকা (এমআর ভ্যাকসিন) নিশ্চিত করা হলে এসব মারাত্মক স্নায়বিক জটিলতা থেকে শিশুকে শতভাগ সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। হামকে শুধু একটি সাধারণ শৈশবকালীন রোগ ভেবে অবহেলা না করাই ভালো; আপনার সামান্য সচেতনতা একটি শিশুর মস্তিষ্ক ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে পারে।

ডা. হিমেল বিশ্বাস, ক্লিনিক্যাল স্টাফ, নিউরোলজি বিভাগ, স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা

আরও পড়ুন