জাপানের ‘কাইজেন’ পদ্ধতি যেভাবে আপনার জীবন বদলে দিতে পারে
জীবনে একবার হলেও কখনো কি ভেবেছেন—কাল থেকে ‘ভালো’ হয়ে যাব? ভোরে উঠব, ব্যায়াম করব, বই পড়ব, স্ক্রিনটাইম কমাব...ইত্যাদি। পরদিন হয়তো অ্যালার্মটা নড়েচড়ে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু আপনার কোনো নড়নচড়ন হয়নি। কিংবা হয়তো কয়েকটা দিন নিজেকে জোর করে ‘লাইনে’ রেখেছেন, তারপর যেই লাউ সেই কদু!
তারপর হয়তো আপনাকে চেপে ধরেছে অপরাধবোধ, দ্বিধা, হতাশা—আমাকে দিয়ে হবে না, আমি পারব না।
অথচ সমস্যাটা কিন্তু আপনার সদিচ্ছায় নয়, পদ্ধতিতে। আপনি একটা বিশাল আগুন জ্বালিয়েছেন, যেটা হয়তো এক রাতেই নিভে গেছে। অথচ দরকার ছিল একটা ছোট্ট মোমবাতি, যেটা প্রতিদিন একটু একটু করে জ্বলে।
বড় লাফের বিভ্রম
আমরা বদলাতে চাইলে বিশাল কিছু করে ফেলতে চাই। এক রাতে সব ঠিক হয়ে যাবে, এক সিদ্ধান্তে জীবন ঘুরে যাবে—এই বিশ্বাস আমাদের ভেতরে গেঁথে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাউফুন নাহারের ভাষ্যমতে, ‘বর্তমানে তরুণদের মধ্যে নিজের ক্যারিয়ার বা জীবনে দ্রুত বদলে যাওয়ার একটা আকাঙ্ক্ষা বা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা বাইরে অন্যদের সফলতা দেখে, সফলতার ফলাফল উপভোগ করতে দেখে, কিন্তু সেই সফলতার পেছনের দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি দেখে না। ফলে নিজের জীবনেও দ্রুত পরিবর্তনের একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়।’
কিন্তু জীবনে যা কিছু টেকসই হয়েছে, সবকিছুই ধীরে ধীরে হয়েছে, অধ্যবসায়ের মাধ্যমে হয়েছে। মানুষ এক দিনে হাঁটতে শেখে না, এক দিনে কথা বলতেও শেখে না। তেমন সফলতাও কেউ এক দিনে পায় না।
তবু আমরা ভাবি বদলে যাওয়াটা হবে একঝটকায়, এক রাতের সিদ্ধান্তে, এক লাফে। কিন্তু পাহাড় তো কখনো একলাফে চড়া যায় না।
ছোট পদক্ষেপের শক্তি
জাপানি লেখক মাসাকি ইমাই তাঁর ‘কাইজেন: দ্য কি টু জাপানস কম্পিটেটিভ সাকসেস’ বইয়ে একটি সহজ কিন্তু গভীর ধারণা তুলে ধরেছেন। জাপানি শব্দ ‘কাই’ অর্থ পরিবর্তন, আর ‘জেন’ অর্থ ভালো। অর্থাৎ কাইজেন-এর মানে দাঁড়ায় ভালোর জন্য পরিবর্তন। তবে এই পরিবর্তন এক দিনে নয়, বিশাল লাফে নয়। বরং প্রতিদিন ছোট ছোট উন্নতির মাধ্যমে। ইমাইয়ের ভাষায় কাইজেন মানে প্রতিদিনের উন্নতি, সবার অংশগ্রহণে উন্নতি এবং জীবনের সর্বত্র উন্নতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপানে টয়োটাসহ বড় বড় প্রতিষ্ঠান এই দর্শন প্রয়োগ করে উৎপাদন ও মানের ক্ষেত্রে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে।
আর এই পথে টিকে থাকার জন্য যে শক্তি দরকার, মনোবিজ্ঞানী অ্যাঞ্জেলা ডাকওয়ার্থ তাঁর ‘গ্রিট: দ্য পাওয়ার অব প্যাশন অ্যান্ড পার্সিভিয়ারেন্স’ বইয়ে এর নাম দিয়েছেন গ্রিট। গ্রিট মানে শুধু লেগে থাকা নয়—একটি গভীর, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের প্রতি ভালোবাসা এবং সেই লক্ষ্যে অবিচল থাকার অধ্যবসায়। ডাকওয়ার্থ বলেছেন, মেধা দক্ষতা তৈরি করে, আর পরিশ্রম সেই দক্ষতাকে সাফল্যে পরিণত করে।
যেদিন থামবেন, সেদিনই হারবেন
ছোট পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করলেই সব সহজ হয়ে যায় না। মাঝপথে এমন দিন আসে, যেদিন কিছুই ভালো লাগে না। মনে হয় এত কষ্ট করে কী লাভ, কিছুই তো বদলাচ্ছে না। সেই দিনগুলোই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, পাহাড় চড়তে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ থামে মাঝপথে, শুরুতে নয়। শুরুতে উৎসাহ থাকে, শেষে গন্তব্য দেখা যায়। কিন্তু মাঝখানের সেই ধূসর জায়গাটায়, যেখানে না শুরুর উত্তেজনা আছে না শেষের আনন্দ; সেখানেই বেশির ভাগ স্বপ্ন থেমে যায়। এ ক্ষেত্রে অধ্যাপক রাউফুন নাহারের বক্তব্য, ‘শুধু অনুপ্রেরণার ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত ছোট পদক্ষেপ ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। পথে ব্যর্থতা বা বিরতি আসতেই পারে; সেগুলোকে শেখার অংশ হিসেবে দেখলে এগিয়ে থাকা সহজ হয়। নিজের মূল্যবোধ ও প্রয়োজনের সঙ্গে মিল রেখে লক্ষ্য ঠিক করলে দীর্ঘ মেয়াদে তা ধরে রাখার সম্ভাবনা বাড়ে।’
তাই যেদিন ইচ্ছে করবে না, সেদিন সবচেয়ে ছোট কাজটা করুন। শুধু একটাই করুন। সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করবেন না। বরং মনে রাখবেন, থামা যাবে না, থামলেই হারবেন। আর হাঁটতে থাকলে একদিন না একদিন লক্ষ্যে পৌঁছাবেনই।
কীভাবে শুরু করবেন
অতএব ‘কাল থেকে ভালো হয়ে যাব’—আচমকা এই বিরাট সিদ্ধান্ত না নিলেও চলবে। কাল সকালে বরং শুধু একটা কাজ করুন। এত ছোট একটা কাজ, যেটাতে ব্যর্থ হওয়ার কোনো উপায় নেই। পাঁচ মিনিট হাঁটুন। এক পাতা হলেও বই পড়ুন। আপনার সবচেয়ে পছন্দের ডায়েরিতে দুটো শব্দ হলেও লিখুন।
পাহাড়ের চূড়া নিশ্চয়ই নিচে দাঁড়িয়ে স্পর্শ করা যায় না। শুধু দেখা যায় ওপরে ওঠার পরের পথটা, যেটা ধরে আজকে হাঁটা শুরু করতে হবে। কাল আরেকটু এগোতে হবে। এভাবেই একদিন পেছনে তাকিয়ে দেখবেন—পাহাড়টা কখন পেরিয়ে এসেছেন, টেরই পাননি।