ধর্ষকদের ভয়ডর কি কমে গেছে
ধর্ষকদের ভয়ডর কি কমে গেছে?
প্রশ্নটার জন্ম দিল প্রথম আলো অনলাইন ও ছাপা পত্রিকার কিছু সংবাদ শিরোনাম। ‘প্রতিবাদ করায় ধর্ষণের শিকার’, ‘গাজীপুরে বাস থেকে স্বামীকে ফেলে দিয়ে স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ’, ‘প্রথমে ধর্ষণ করল দুই বন্ধু, সাহায্য চেয়ে আবার দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার স্কুলছাত্রীটি’, ‘ভিজিএফ কার্ড দেওয়ার কথা বলে গৃহবধূকে ধর্ষণ, ইউপি সদস্য গ্রেপ্তার’—১ থেকে ১৪ আগস্ট এই শিরোনামে সংবাদগুলো প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনামগুলো থেকেই কিছুটা হলেও ঘটনার আঁচ পাওয়া সম্ভব। ভিজিএফ কার্ড দেওয়ার কথা বলে বা ধর্ষণের শিকার মেয়ে যাদের কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল, তারাই আবার ধর্ষণ করেছে। ঘটনাগুলো শুনলে মনে হয়, বাস্তবে না, এগুলো বুঝি গল্প, উপন্যাস বা সিনেমায় ঘটছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করেও তো লাভ হচ্ছে না। পথে-ঘাটে-প্রকাশ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। দেশের মেয়ে ও নারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছেন। ঘটনা ঘটার পর ঘটা করে আসামি গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিন্তু দ্রুত বিচার করে আসামির সাজা কার্যকর হচ্ছে, তেমন নজির তো দেখা যাচ্ছে না।
মন খারাপ করা সংবাদ
৩ আগস্ট। কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেসের একটি বাস কয়েক ঘণ্টার জন্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এক দল ডাকাত। অস্ত্রের মুখে চালক, সহকারী ও যাত্রীদের হাত, পা ও চোখ বেঁধে ফেলে তারা। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন এক নারী যাত্রী। কিন্তু তাঁকে রক্ষায় কেউ এগিয়ে যেতে পারেননি। একাধিক নারীর শ্লীলতাহানিও করে ডাকাতদল। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ধর্ষণের আরেকটি খবর শিরোনাম হয়। বাসে নওগাঁ থেকে আসা এক দম্পতি গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস এলাকায় নামেন। সেখান থেকে তাকওয়া পরিবহনের একটি বাসে করে মাওনা রওনা করেন। বাসটিতে আগে থেকেই তাকওয়ার দুজন কর্মী ছিলেন, চন্দনা চৌরাস্তায় উঠে আরও তিনজন। পরে অন্য যাত্রীরা নেমে গেলে কর্মীরা ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে স্বামীকে ফেলে দেন এবং বাসের ভেতরেই তাঁর স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হয়।
৭ আগস্টের ঘটনাটি পঞ্চগড়ের। বছরখানেক আগে মুঠোফোনে পরিচয়ের সূত্রে এক স্কুলছাত্রীর সঙ্গে একজনের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে মুঠোফোনে ওই স্কুলছাত্রীকে পঞ্চগড় শহরে ডেকে আনেন ওই প্রেমিক। পরে ওই ছাত্রীকে নিয়ে এক বন্ধুর মোটরসাইকেলে করে বিভিন্ন এলাকায় ঘোরে। রাতে প্রেমিক ও তাঁর বন্ধু মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। কিশোরীর সঙ্গে এ দুজনের বাগ্বিতণ্ডা চলার সময় সেখানে আরও পাঁচ ব্যক্তি আসেন। আগের দুজন মেয়েটিকে রেখে পালিয়ে যান। ওই পাঁচ ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাইলে তাঁরাও মেয়েটিকে ধর্ষণ করেন।
আর এর পরের ঘটনাটি মানিকগঞ্জের। ভিজিএফের কার্ড দেওয়ার কথা বলে এক গৃহবধূকে ধর্ষণ করে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) এক সদস্য। অভিযুক্ত ইউপি সদস্যকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ।
খণ্ডিত পরিসংখ্যান
প্রথম আলোসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং অনলাইনে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই অর্থাৎ সাত মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫৪৬ জন মেয়েশিশু ও নারী। তাঁদের মধ্যে ২৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। আত্মহত্যা করেছেন সাতজন।
গণপরিবহনে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের সার্বিক হিসাব পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৯—এই চার বছরে গণপরিবহনে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে ১৩৪টি। এর মধ্যে ৪২টি দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ৯১টি যৌন নিপীড়ন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষককে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আইনের ফাঁক গলে আসামি যাতে বের হতে না পারে এবং ভিকটিম যাতে ন্যায্য বিচার পান, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হলেই চলবে না, সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সবাইকেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
ধর্ষণের মতো অপরাধে তরুণেরা জড়িয়ে পড়ছে। পর্নোগ্রাফির ছড়াছড়ি, মাদকের ভয়াল থাবা, রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি—এ বিষয়গুলোতে হাত দেওয়া না হলে ধর্ষণের মতো অপরাধ ঘটতেই থাকবে। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ধর্ষণ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের যার যার ভূমিকা, তা পালন করতে হবে বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি
সুলতানা কামাল
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের সভাপতি
আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে, কিন্তু ঘটনা প্রতিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। কারণ, গ্রেপ্তারই বিচারের শেষ কথা নয়। বিচার অর্থ অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে তাঁর কৃতকর্মের জন্য শাস্তি পাওয়া এবং অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করা। আমাদের অভিজ্ঞতা এবং গবেষণালব্ধ তথ্য থেকে জানতে পারি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন, বিশেষত ধর্ষণ মামলার বিচার সেই পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারে না। মামলা দায়ের, তদন্ত, চিকিৎসকের প্রতিবেদন, অপরাধের সাক্ষ্য প্রমাণ জোগাড়, সাক্ষীদের সময়মতো হাজির হওয়া বা করা—এতগুলো ধাপ পেরিয়ে ধর্ষণের শিকার নারীর বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব থেকে গেছে। কিছুদিন আগপর্যন্ত আইনেও ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি বৈরী ধারা বহাল ছিল। এর সঙ্গে যাঁরা বিচারব্যবস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, তাঁদের অনেকেরই মনমানসিকতা পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে নারীর বিরুদ্ধে যেতে প্রভাবিত করে। অতএব, ধর্ষক নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে বলে মনে করে। তার ফলে সমাজে এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা প্রকট আকার ধারণ করে। আর একটি বিষয় অনুধাবনযোগ্য, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সমাজের আইন হচ্ছে সে সমাজের ন্যায়বিচার বোধের প্রতিফলন, যা সেই সমাজের নৈতিকতাবোধ প্রসূত।
অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, বাংলাদেশে সামাজিক সংস্কৃতিতে সেই নৈতিকতা বোধের চর্চা একবারেই উধাও হয়ে গেছে। বরং অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে অপরাধ করে বিচারের আওতার বাইরে থেকে, সামাজিকভাবে কোনো জবাবদিহির সম্মুখীন না হয়ে সসম্মানে ঘুরে বেড়াতে পারে অপরাধী। নয়তো অপরের সামনে, প্রকাশ্যে, দল বেঁধে ধর্ষণ করার মতো ঘটনা ঘটতে পারে না। আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সেই নৈতিকতা বোধ ফিরিয়ে আনতে হবে, যা মানুষকে নিজে থেকে এ ধরনের নিকৃষ্ট অপরাধমূলক আচরণ থেকে বিরত রাখবে।