স্কুলের যে জুতা পরছে এখন সবাই

বিশ্বের বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের নানা ব্র্যান্ডও বানাচ্ছে মেরি জেন স্টাইলের জুতাছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

একটি জুতার নকশা বা স্টাইল নিয়ে যখন পুমা আর অ্যাডিডাসের মতো দুটি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড লড়াই করে, তখন বুঝতে হবে, সেটা কোনো হেঁজিপেঁজি জুতা নয়। পুমার স্পিডক্যাট ব্যালে আর অ্যাডিডাসের তায়কোয়ান্দো মেরি ব্যালের মধ্যে কোনটা ভালো, এটা নিয়ে শখানেক টিকটকারের মতামত পেয়ে যাবেন।

পুমার স্পিডক্যাট ব্যালে
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

বলছি মেরি জেন স্টাইলের জুতার কথা। কিন্তু এই মেরি জেন স্টাইলের জুতা পরে পুরো ৯০ দশক আমরা স্কুলের মাঠে দৌড়ে বেড়িয়েছি। প্রতিবছর বাটা থেকে একই স্টাইলের কালো রঙের জুতাজোড়া কিনতাম। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার সেটা পলিশ করতাম। চকচকে জুতা পরে রোববার থেকে শুরু হতো আবার স্কুল।

অ্যাডিডাসের তায়কোয়ান্দো মেরি ব্যালে
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

এত বছর পর এসে জুতার এই স্টাইলটি বিখ্যাত হওয়ার কারণ কী? নস্টালজিয়া নাকি নারীশক্তির প্রতীকায়ন। যেটাই হোক, সত্য হচ্ছে বিশ্বের বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের নানা ব্র্যান্ডও বানাচ্ছে মেরি জেন স্টাইলের জুতা। আর সেগুলো পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে শিশু থেকে বয়স্ক—সবাই।

আরও পড়ুন

একদিকে আরাম অন্যদিকে সুন্দর

ফ্যাশনের কোন ধারা কতটা শক্ত অবস্থানে আছে, বোঝার কিছু মানদণ্ড আছে। প্রথমত, মানুষ সেটা কতটা পরছে, অনলাইনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে চোখে পড়ে কি না। দ্বিতীয়ত, সেটি কি সহজলভ্য, মানে দামি ও কম দামি ব্র্যান্ডে পাওয়া যাচ্ছে কি না। পাশাপাশি আমার কাছে মনে হয়, সাধারণ মিলেনিয়াল ফ্যাশনপ্রেমী হিসেবে আমি নিজেও সেটা পরব কি না। কারণ, সব ধারা অনুসরণ করা হয় না। আরাম ও সুন্দর নকশা—এই দুটি জায়গাতেই মেরি জেন স্টাইলের জুতাগুলো উতরে গেছে শতভাগ। ২০২৫ সালের অন্যতম ফ্যাশন অনুষঙ্গের তালিকায় মেরি জেন জুতা ছিল।

প্রাডা ব্র্যান্ডের মেরি জেন
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

হাই-ফ্যাশন বা ডিজাইনার লেভেলের জগতে মেরি জেনের নকশায় সাজানো জুতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে মিউ মিউ, প্রাডা, মার্ক জ্যাকবস, টোরি বার্চের মতো ব্র্যান্ড। আবার যাঁরা আরেকটু কম দামি ব্র্যান্ড থেকে কিনতে চেয়েছেন, তাঁদের জন্য স্যাম এডেলম্যান, মেইডওয়েল, কোচ, ফ্রি পিপল, ভ্যাগাবন্ড, স্টিভ ম্যাডেন, ডলচে ভিটা, লোসি, মাইকেল কোরস ব্র্যান্ডগুলো ছিল। সাশ্রয়ী ব্র্যান্ড হিসেবে এইচঅ্যান্ডএম, চার্লস অ্যান্ড কিথ, ফ্রাঙ্কো সার্টো, নাইন ওয়েস্ট, ন্যাচারালাইজার, লাইফস্ট্রাইড থেকে কিনেছেন অনেকেই।

নানা নকশার মেরি জেন
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

সাধারণত গ্রীষ্মপ্রধান দেশে গরমের সময় খোলা নকশার স্যান্ডেলই পরা হয় বেশি। মুখবন্ধ জুতা হওয়া সত্ত্বেও সেসব দেশেও এ বছর বেশ দাপটের সঙ্গে ছিল মেরি জেন। পলিয়েস্টার, নাইলন, রিসাইকেল প্লাস্টিক, পিভিসি ছাড়াও ঋতুভেদে প্রাধান্য পেয়েছে চামড়া, সুয়েড, সুতি, ক্যানভাস, ভেলভেট ইত্যাদি উপকরণ। প্ল্যাটফর্ম আর হিল সংস্করণ এটিকে দিয়েছে ক্ল্যাসিক লুক, বছরের পর বছর ধরে যেটি পরা যায়। আবার এর সরল নকশায় প্রকাশ পায় আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ।

আরও পড়ুন

ফিরে দেখা

২০২৩ সালের দিকে ‘স্কুলজীবনের মতো পোশাক’ পরার ধারণাটি নতুন করে ট্রেন্ডি হয়ে ওঠে। এই প্রবণতার পেছনে ছিলেন সেসিলি বানজেন, ইয়ুন আহন ও স্যান্ডি লিয়াংয়ের মতো ডিজাইনাররা। তাঁদের কাছে স্কুলজীবন ছিল অনুপ্রেরণা। ফলে তাঁদের পোশাকের সংগ্রহগুলোয় ফিরে আসে প্লিটেড স্কার্ট, বোতাম দেওয়া শার্ট ও মেরি জেন স্টাইলের জুতা। ইউজিজি, অ্যাম্বুশ, মার্জিয়েলাসহ আরও নানা ব্র্যান্ড ও ডিজাইনারের সহযোগিতায় আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে মেরি জেন স্টাইলটি।

সেসিলি বানজেনের নকশা করা মেরি জেন
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

২০২৩ সালে নারীর ক্ষমতায়নে নতুন ঢেউ তোলে বার্বিও প্রিসিলার মতো চলচ্চিত্র। ফ্যাশনেও পড়ে এর প্রভাব। যেসব সিলুয়েট দীর্ঘদিন ধরে নারীত্বের প্রতীক ছিল, সেগুলো আবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মেরি জেন সেটার অন্যতম উদাহরণ। এই জুতার প্রতি ডিজাইনার সেসিলি বানজেনের আকর্ষণের পেছনেও ছিল সেই দ্বৈততা—নস্টালজিয়া ও আধুনিকতা, কোমলতা ও শক্তির মিশেল। এ কারণে বিশেষ করে জাপানি স্পোর্টসওয়্যার ও ফুটওয়্যার ব্র্যান্ড অ্যাসিক্সের সঙ্গে ২০২৩ সালে মেরি জেন নকশার জুতা বানান সেসিলি।

এবারের মেরি জেন স্টাইলটিতে নতুন যোগ হয়েছে সামনের চারকোনা বা স্কয়ার টো
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

বানজেন একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘মেরি জেন আমার কাছে সব সময়ই একধরনের নস্টালজিয়া। এটি ঐতিহ্য আর নারীত্বের একটি সিলুয়েট। ২০২২ সালে অ্যাসিক্সের সঙ্গে প্রথম স্নিকার ডিজাইনের কাজ শুরু করার সময় আমরা জুতার আকার ও গঠন নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলাম, কাটাছেঁড়া করেও দেখেছি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে এই রূপটি তৈরি হয়, যা একই সঙ্গে অপ্রত্যাশিত, আবার খুবই স্বাভাবিক।’

আরও পড়ুন

কার নামে নাম

নিঃসন্দেহে এই মুহূর্তে মেরি জেন ‘কুল’ একটি জুতা। তবে এর ইতিহাস কিন্তু আজকের না। ১৯০২ সালের আমেরিকান কমিক স্ট্রিপ ‘বাস্টার ব্রাউন’ থেকে মেরি জেন জুতার নামটা এসেছে। কমিকে মেরি জেন ছিল মূল চরিত্র বাস্টার ব্রাউনের বোন। দুজনেই পরতেন একটি বিশেষ ধরনের টি-বার স্ট্র্যাপ দেওয়া জুতা। অল্প সময়ের মধ্যেই এই জুতা চরিত্রের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে যায় যে ধীরে ধীরে এটি বিশেষ একটি স্টাইলের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। ১৯০৪ সালে তখনকার জনপ্রিয় ব্রাউন শু কোম্পানি তাদের তৈরি ‘বার শু’র নাম রাখে মেরি জেন। সেই মুহূর্ত থেকে ফ্যাশনের ইতিহাসে ‘মেরি জেন’ নামটি স্থায়ী হয়ে যায়।

আমেরিকান কমিক স্ট্রিপ ‘বাস্টার ব্রাউন’ থেকে মেরি জেন জুতার নামটা এসেছে
ছবি: সংগৃহীত

১৯৬০-এর দশকে, ইভ সাঁ লঁর’র মতো ডিজাইনার এবং মোড ফ্যাশনের উত্থানের সঙ্গে উঁচু হিল, পেটেন্ট লেদারের ঝকঝকে ফিনিশ এবং সাহসী রঙে এটি তরুণ প্রজন্মের কাছে উচ্ছ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৯০-এর দশকে আবারও ফিরে আসে মেরি জেন স্টাইল। গথ, পাঙ্ক ও গ্রাঞ্জ সংস্কৃতির অনুসারীরা জুতাটিকে নতুনভাবে গ্রহণ করে। প্লিড দেওয়া স্কার্ট, টাইটস বা ছেঁড়া জিনসের সঙ্গে মোটা তলার মেরি জেন স্টাইলের জুতা হয়ে ওঠে বিদ্রোহ আর নারীত্বের এক অনন্য মেলবন্ধন—একদিকে সাহসী মনোভাব, অন্যদিকে কোমল নকশা। এরপর আবার আলোচনায় চলে আসে ২০২৩ সালে।

এ দেশেও পায়ে পায়ে

মেরি জেন স্টাইলটি নিয়ে কাজ করছে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড
কৃতজ্ঞতা: এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড, ছবি: কবির হোসেন

বাংলাদেশে মেরি জেন স্টাইলটি নিয়ে কাজ করছে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড। সামনের ঈদেই নতুন সংগ্রহ আসছে বলে জানালেন এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের নিনো রসি গ্রুপের প্রোডাক্ট ম্যানেজার তাসমিয়া জাকির। এই স্টাইল আমাদের দেশে আগেও এসেছিল। এবারের মেরি জেন স্টাইলটিতে নতুন যোগ হয়েছে সামনের চারকোনা বা স্কয়ার টো। বাংলাদেশের ক্রেতারাও সেটা পছন্দ করছেন।

আরও পড়ুন

কাছাকাছি হলেও এক নয়

অনেকে মেরি জেন আর ব্যালে জুতাকে এক করে ফেলেন। দুটির মধ্যে পার্থক্য নিয়ে এসেছে জুতার ওপরে ব্যবহার করা স্ট্র্যাপটা। পাশাপাশি মেরি জেনের সামনের অংশটাকে নিয়ে অনেকেই নিরীক্ষা করেছেন। কখনো সেটা ছিল চারকোনা, কখনো গোলাকৃতি। অনেক প্রতিষ্ঠান মেরি জেনের সামনের অংশটি আবার কাঠবাদামের মতো আকারও দিচ্ছে।

বছরজুড়েই এই জুতার কদর থাকবে
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

প্রাডা যেমন স্কুলশিষ্টতা আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল বিদ্রোহ—দুটি নকশাই নিয়ে এসেছে। মিউ মিউ ব্র্যান্ডটি আবার পেটেন্ট লেদার ব্যবহার করে ঝকঝকে ও পরিণত ছাঁচ দিয়েছে। শ্যানেল আবার ঐতিহ্যবাহী নকশা হিসেবে জুতাজোড়ায় লাগিয়েছে মুক্তা। ডিজাইনাররা এই একটি জুতার নকশা নিয়ে পরীক্ষা করছেন নানাভাবে।

শৈশবে পরা জুতা হঠাৎ করেই ‘কুল’ আর সমসাময়িক হয়ে উঠেছে, এর মধ্যে যেন আছে অন্য একধরনের আনন্দ। যদিও কিছু ব্লগার এর বিরুদ্ধে গেছেন। নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে অফিস, ক্লাস, আন্দোলনে, বাজারে, দাওয়াতে—সব জায়গাতেই এটি পরা হচ্ছে। নকশাও সেভাবেই করা হচ্ছে। শীতের সময় তো বটেই, ধারণা করা হচ্ছে বছরজুড়েই এই জুতার কদর থাকবে।

আরও পড়ুন