ব্র্যান্ডের নাম ‘তাসা’ কেন?
তাসা আমার ডাকনাম। বাবা-মা খুব আদর করে নামটি রেখেছেন। বাবার নাম তানসেন, মায়ের নাম শান্তনা—দুটি নাম মিলিয়েই ‘তাসা’। নামটির সঙ্গে আমার আবেগ জড়িয়ে আছে। সব সময়ই এটাকে আমার জন্য শুভ মনে হয়েছে।
প্রথম আলো :
তাসা শুরু করলেন কেন?
প্রায় ১৩ বছর আগে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তাসার যাত্রা শুরু। প্রথমে শখের বশে কাজ করতাম। পরিবার আর বন্ধুরা পোশাকে নকশা করতে বলত। আমার পরিবারে অনেকেই শিল্পী—বাবা, মা, নানা, খালা, দাদি, চাচা। গান, নাচ, ছবি আঁকার মধ্য দিয়েই বড় হয়েছি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে আইন বিভাগে পড়াশোনা শেষ করলেও সেই বিষয়ে খুব আগ্রহ জন্মায়নি। ছোটবেলায় নানার কাছ থেকেই হাতেখড়ি পাওয়া। তাঁর রঙিন কাগজ কেটে নকশা বানানো আমাকে ভীষণ টানত। পরিবার কখনো চাপ দেয়নি যে বড় চাকরিই করতে হবে। সেই স্বাধীনতাই হয়তো শিল্পী হয়ে ওঠার সাহস দিয়েছে।
প্রথম আলো :
আর্ট বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আমাদের দেশে আর্টকে ছোট করে দেখা হয়—যেন যারা পড়াশোনায় ভালো নয়, তারাই এ পথে আসে। আমি ঠিক এটার উল্টোটা মনে করি। আমার আশপাশের শিল্পীরা অসাধারণ মেধাবী। তাঁদের দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছি। এ কারণেই আইন পড়লেও হৃদয় টেনেছে শিল্পের দিকেই।
পেশাগত কোনো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন?
২০১৫-১৬ সালের দিকে ভারতীয় ডিজাইনার মনীশ মালহোত্রার প্রতিষ্ঠানে অনলাইন ডিপ্লোমা কোর্স করি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে। শুরুতে বিদেশি শিক্ষার্থী নেওয়া হতো না। বহুবার যোগাযোগের পরও যখন কোনো রেসপন্স পাইনি, ভারতীয় এক বন্ধুর সহায়তায় ভর্তি হই। কিন্তু কিছুদিন ক্লাস করানোর পরই তারা বিষয়টি বুঝতে পারে। সমস্যার সমাধানও হয়েছে। সেখানে কনের পোশাক ও পুরুষদের পোশাকের ওপর ডিপ্লোমা কোর্স করি। এরপর আরও আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ শুরু করি।
প্রথম আলো :
তাসা কবে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে?
২০১৮ সাল থেকে। সে সময় আমার একটি নকশা নিয়ে বেশ কিছুদিন কাজ করার পর ক্লান্ত লাগে। মনে হয় নতুন কী করা যায়? আমার সঙ্গে যায় এমন কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করতে চাইছিলাম। মাথায় এল দেশীয় সুতির শাড়ি কিংবা শার্টের কথা। সেটা দিয়েই কাজ করা শুরু। কারণ, রং-তুলির নানা নকশা আনা যেত সেখানে। আমার প্রতিটি শাড়ির পেছনে একেকটা গল্প থাকে। সবাই বলে যে পোশাকের পেছনের গল্পটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেই গল্পগুলোকে নিয়ে আমি আরও কাজ করতে চাই। যেমন আমার শাড়ির ঝালর লাগানোর ভাবনা এসেছে আমার নানার কাটা রঙিন কাগজের টুকরা থেকে। ছোটবেলায় ওগুলো দেখে জিজ্ঞেস করতাম এই কাগজগুলো দিয়ে কি কাপড় বানানো যায়? নানা বলতেন, এখান থেকে ভাবনাটা নিতে পারো। তারপর বানাও।
প্রথম আলো :
তাসাতে এখন পর্যন্ত কী কী বানিয়েছেন?
শাড়ি, সুতির শার্ট, চুড়ি, চুলের ফিতা, কুচি করা পেটিকোট ইত্যাদি বানিয়েছি। সামনে আমার ছেলেদের পোশাক নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে। মিলেনিয়েলরা না পরলেও জেন–জিরা পছন্দ করে রঙিন পোশাক। তারা স্টাইল নিয়ে বেশ সচেতন। মেয়েদের জন্য বানালেও আমার তৈরি করা শ্যাকেটগুলো ছেলেরা পছন্দ করেছে। সামনে ব্রাস মেটাল, নারকেলের ছোবড়া, প্লাস্টিকের বোতলের মুখ, আলতা দিয়ে নতুন কিছু বানানোর পরিকল্পনা আছে। আমার কাজটাই যেহেতু বোহো ধাঁচের, প্রকৃতি থেকে নেওয়া উপকরণগুলোই বেশি ব্যবহার করা হয়। এখন পর্যন্ত সুতার কাজ, কড়ি, কাচ, ঘুঙুর ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেছি।
পোশাক বানানোর সময় কোন চিন্তাটা মাথায় আসে আগে?
আমি পরব, এটা চিন্তা করেই বানাই। স্টাইলিংটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেটা নিয়েও চিন্তা করি তখন।
প্রথম আলো :
বৈশ্বিক ধারা কি অনুসরণ করেন?
না, আমি আমার নিজস্ব ধারাতেই থাকি। তবে উদ্যোক্তা আর শিল্পী—দুটি ভূমিকায় ভারসাম্য রাখা কঠিন। শিল্পীসত্তা বজায় রাখতে গেলে ব্যবসা কম হয়, আবার ব্যবসা বাড়াতে গেলে শিল্পীসত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। না চাইলেও কিছু কাজ করি দিবস বা উৎসব ধরে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য।
প্রথম আলো :
তাসার কি আলাদা শোরুম আছে?
তাসার আলাদা কোনো শোরুম নেই। ‘যাত্রা মেলা’র ভেতরে আছি তিন বছর ধরে। এর আগে ‘খুঁত’–এর ভেতর ছিলাম।
প্রথম আলো :
ব্যবসায়িকভাবে কতটুকু সফল?
২০১৮ সালের পর থেকে প্রতিবছর ৬-৭ লাখ টাকা করে লাভ হচ্ছে। শিল্পী মনোভাবের কারণে খুব বেশি লাভ করতে পারিনি। আমি খুব ভাবুক, এটা একটা কারণ।
প্রথম আলো :
কোথায় বানান তাসার জিনিসগুলো?
মূলত ঢাকাতেই কাজ করা হয়। ভারী সুতার কাজগুলো ত্রিশালে তৈরি করা হয়।
মডেল হিসেবে কাদের বেছে নেন।
আমি সাধারণ মানুষদের দিয়ে কাজ করাতে বেশি পছন্দ করি।
প্রথম আলো :
আপনার স্টাইলিং কি সবাই বোঝে?
বাংলাদেশের তরুণেরা পোশাক নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করে। ওরা এখন অনেক সচেতন। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করতে চায় স্টাইলিং নিয়ে। তবে আর্কা ফ্যাশন উইকের ফ্যাশন শোতে যখন পোশাক তুলে ধরি, অনেকেই প্রশ্ন করে, এটা পরে আমি কই যাব। ফ্যাশন শোর পোশাক পরে মুদির দোকানে কেউ যায় না। এটার একটি আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে, আলাদা একটি ভাবধারা আছে। যেমন এবারের বসন্তে আমি চেয়েছিলাম বাদামি রঙের শাড়ি নিয়ে কাজ করব। কেউ যদি চান, সবার থেকে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরব। এটা ভেবেই আমি বাদামি রঙের শাড়িটি বানিয়েছিলাম। এতে ফুলেল ছোঁয়া দেওয়ার চেষ্টা করেছি, স্টাইলিংও সেভাবেই রেখেছি। তবে এই শাড়িগুলো যেভাবে আমি দেখিয়েছি, সেভাবেই পরতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। চাইলে একেবারে সাধারণভাবেও, নিজের মতো করে পরা যায়।
প্রথম আলো :
আপনি আমাদের সংস্কৃতিকে কীভাবে দেখেন?
আমি আমাদের সংস্কৃতির ভিত্তিটাকে গভীরভাবে ভালোবাসি। যদিও আমি ইন্দো-ওয়েস্টার্ন ধাঁচের পোশাক বানাই। তবু মনে করি, বৈশাখের জন্য সাদা-লালই সবচেয়ে মানানসই। আর্থিক লাভের জন্য কখনোই সংস্কৃতিকে ছোট করতে চাই না।
আমি যখনই কোনো কাজ করি, প্রথমেই ভাবি—এটা কি আমার শিকড়ের সঙ্গে যায়? অনেকের কাছে হয়তো মনে হতে পারে, আধুনিক উপস্থাপন মানেই শিকড় থেকে সরে আসা। কিন্তু আমার নিজের গল্প, আমার বেড়ে ওঠা, আমার ভাবনার ভেতরেই সেই সংযোগ আছে। আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি আমার কাজের সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্ক দেখাতে পারব।
যেমন বিবি রাসেল আমাদের সংস্কৃতিকে আধুনিকভাবে তুলে ধরেছেন, আবার নিজের স্বতন্ত্র স্টাইলও তৈরি করেছেন। সিগনেচার তৈরি করতে গেলে সংস্কৃতির ভেতর থেকেই একটু আলাদা করে ভাবতে হয়। আমিও ঠিক সেই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে কাজ করতে চাই—শিকড়ের ভেতর থেকেই নিজস্বতা তৈরি করে।
আপনার কাছে ফ্যাশন কী?
আমার মনে হয়, আপনি যা পরেন—সেটাই আপনার ফ্যাশন। প্রত্যেক মানুষের আলাদা রুচি, আলাদা ভাবনা, আলাদা পটভূমি আছে। কেউ লাল শাড়ি পরলেন—তার পেছনেও একটি ব্যক্তিগত গল্প থাকে, একটি নিজস্ব নান্দনিকতা কাজ করে। তাই ফ্যাশন আমার কাছে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়।
তবে আমাকে যদি ব্যক্তিগতভাবে জিজ্ঞেস করেন, আমি কেমন ফ্যাশন পছন্দ করি—তাহলে বলব, আমি সব সময় নতুন কিছু চেষ্টা করতে ভালোবাসি। প্রচলিত ধারার বাইরে একটু আলাদা থাকতে চাই। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাটাই আমার কাছে ফ্যাশন।
যেমন আলতা—অনেকের কাছে এটি কেবল ঐতিহ্যের অংশ, কিন্তু আমার কাছে এটি একটি স্টাইল স্টেটমেন্ট। চশমা যেমন কারও পুরো লুককে পূর্ণতা দেয়, তেমনি আলতাও আমার সাজকে আলাদা মাত্রা দেয়। যদিও সব সময় পরা সম্ভব হয় না—বাচ্চাদের সঙ্গে থাকলে লেগে যায়, একবার তো খাওয়াতে গিয়ে দেখি হাতের আলতা লেগে ভাতও লাল হয়ে গিয়েছিল! তখন থেকে নিয়মিত পরা কমিয়েছি।
আমি নাচের একটি ভিডিও করার কথাও ভেবেছিলাম, কিন্তু পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে সবকিছু করা যায় না। তবু আমার বিশ্বাস—ফ্যাশন মানে নিজের মতো করে নিজেকে প্রকাশ করা। সেটা যত সহজ হোক বা যত ভিন্নই হোক না কেন।
প্রথম আলো :
বড় কোনো বাধা ছিল তাসার এই পথচলায়?
কোভিডের সময়টা আমার জীবনে সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। ঠিক তার আগেই আমি ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলাম। টালি অফিসে বড় সেটআপ, বাসাতেও আলাদা কাজের জায়গা—সব মিলিয়ে বিশাল আয়োজন। ঋণের টাকা নিয়ে ছয় মাসের মতো কোনোভাবে কারিগরদের পারিশ্রমিক চালিয়েছি। তখন চারদিকে কথা হচ্ছিল—দিনমজুরদের পাশে দাঁড়াতে হবে, তাঁদের কথা ভাবতে হবে। আমিও সেই দায়বদ্ধতা থেকে কারিগরদের টাকা বন্ধ করিনি।
কিন্তু ব্যবসায়িকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়ি। তবু সিদ্ধান্ত নিই—টিকে থাকতে হবে। তখনই ভাবলাম, এমন কিছু করতে হবে, যা কম দামে মানুষ কিনতে পারবে। পোশাক না কিনলেও ১৫০-২০০ টাকার গয়না তো অনেকেই কিনবে। সেখান থেকেই জুয়েলারি লাইন শুরু করার চিন্তা।
আমি আগে দেখেছিলাম আড়ং সুতা দিয়ে কাজ করছে। তবে আমি কাপড় ব্যবহার করে চুড়ি বানানো শুরু করি। ধীরে ধীরে সেটি সাড়া পায়। পরে দেখলাম অনেকেই চুড়ি নিয়ে কাজ করছেন। এমনও হয়েছে, আমার ডিজাইনের চুড়ি বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হচ্ছে, এমনকি আমার হাতের ছবি নিয়েও অনেকে নিজেদের পেজে ব্যবহার করেছে।
শুরুর দিকে খুব রাগ হতো। মনে হতো—এটা তো আমার সৃষ্টি। পরে নিজেকে বুঝিয়েছি, শিল্পের জগতে অনুকরণ থাকবেই। না চাইতেও মেনে নিতে শিখেছি। বরং ভাবলাম, যদি আমার কাজ অন্যকে অনুপ্রাণিত করে, সেটাও একধরনের স্বীকৃতি।
সংকটের সময়েই বুঝেছি—টিকে থাকার জন্য নতুন করে ভাবতে হয়। আর সেখান থেকেই আমার ব্যবসার নতুন অধ্যায় শুরু।
তাসার অন্যতম জনপ্রিয় পণ্য কী?
চুড়ি এখন আমার প্রধান পণ্য হয়ে গেছে। শুরুতে সবাই আমাকে পোশাকের জন্য চিনত, কিন্তু পরে বলতে শুরু করল—আপু, এখন তো আপনি মূলত জুয়েলারিই করছেন! বিশেষ করে লাল রঙের হৃদয় লাগানো চুড়ি, মোটা লাল চুড়িতে কাচ বসানো নকশা—এসব খুব জনপ্রিয় হয়ে যায়। এতটাই পরিচিতি পায় যে সেখান থেকে আর বের হতে পারিনি। ভাবলাম, থাক, চুড়িটাই থাকুক আমার সিগনেচার হিসেবে।
একবার শ্বশুরবাড়ির পেছনের বাজারে জরুরি কিছু উপকরণ কিনতে গিয়েছিলাম। খুব সাধারণভাবে বের হয়েছিলাম—কাজল, লিপস্টিক কিছুই দিইনি। হঠাৎ এক মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘আপু, আপনি কি তাসার স্বত্বাধিকারী?’ আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ।’ মনে হচ্ছিল, এই অবস্থায় কেউ চিনে ফেলল! মেয়েটি বলল, ‘আপনার পেজ দেখে আমি চুড়ির ব্যবসা শুরু করেছি। আপনার মতো করেই নাম রেখেছি।’ প্রথমে মাথা একটু গরম হয়েছিল। কিন্তু সে খুব আন্তরিকভাবে বলল, ‘আপুকে দেখেই আমরা অনেকেই শুরু করেছি।’ তখন বুঝলাম, এটা রাগের নয়, গর্বের জায়গা।