লা রিভ শুরু করার আগে যেমনটা ভেবেছিলেন এবং এখন যেখানে আছেন—দুইয়ের মধ্যে মিল কতটুকু?
১৬ বছর আগে যখন লা রিভ শুরু করি, তখন আমাদের টেক্সটাইল ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না। তাই শুরুর কিছু পরিকল্পনা পরে পরিবর্তন করতে হয়েছে। প্রথমে আমরা একটি পুরুষকেন্দ্রিক ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই বুঝতে পারি, বাংলাদেশের বাজারে ফিউশন ফ্যাশনের একটি বড় শূন্যতা রয়েছে। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য আধুনিক, আন্তর্জাতিক মানের ফিউশন পোশাক তৈরি করব।
একই সঙ্গে ডিজিটাল রূপান্তরেও আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। ওয়েবসাইটকে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ স্টোর হিসেবে দেখি। এখন আমাদের নিজস্ব অ্যাপ রয়েছে, ভার্চ্যুয়াল ট্রায়াল রুমের মতো নতুন প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছি। তবে একটি ইচ্ছা এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। শুরু থেকেই চেয়েছিলাম—৬৪টি জেলায় লা রিভের একটি করে স্টোর থাকবে। দেশের আটটি বিভাগে আমাদের শাখা রয়েছে। আশা করি, একদিন ৬৪ জেলাতেই লা রিভের শাখা থাকবে।
প্রথম আলো :
করোনার সময়টা কীভাবে সামলেছেন?
করোনার আগেই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ইনভেন্টরি পরিকল্পনা নতুন করে সাজাই। অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন না করে সীমিত পরিসরে সংগ্রহ তৈরি করি এবং মৌসুমভিত্তিক পরিকল্পনা করে রাখি। এতে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। আরেকটি বড় শক্তি ছিল আমাদের দল। কঠিন সময়ে যেন কাউকে চাকরি হারাতে না হয়, সে জন্য জ্যেষ্ঠ সহকর্মীরা স্বেচ্ছায় কয়েক মাস বেতনের অংশ ছেড়ে দিয়েছিলেন। লকডাউনের সময়ও আমরা গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করিনি। অনলাইনে নানা ধরনের কনটেন্ট, বৈশাখ ও ঈদের বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সব সময় যুক্ত থেকেছি।
কাদের কাজ আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?
২০১৬ সালে প্যারিসে একটি ফ্যাশন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে কিংবদন্তি ডিজাইনার ইভ সাঁ লরাঁর কাজ, তাঁর কাজের জায়গা, স্কেচ, পোশাকের উপকরণ সংগ্রহের পদ্ধতি—সব কাছ থেকে দেখেছি। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। মডেস্ট ফ্যাশনের ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়ার ডিজাইনার দিয়ান পেলাঙ্গির কাজও আমার খুব ভালো লাগে। তাঁর স্টাইলিং, রঙের ব্যবহার ও মডেস্ট ফ্যাশনকে আধুনিকভাবে উপস্থাপনের ধরন সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। এ ছাড়া ম্যাসিমো দুত্তি ও এইচঅ্যান্ডএমের মতো ব্র্যান্ডের পোশাকের ডিসপ্লে, চলতি ধারার উপস্থাপন এবং ফ্যাশন প্রেজেন্টেশনের ধরনও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকি।
প্রথম আলো :
আপনার নিজের প্রিয় কোনো ডিজাইন আছে?
আসলে নিজের সব ডিজাইনই আমার ভালো লাগে। তবে ২০১২ সালের একটি সালোয়ার-কামিজের ডিজাইন এখনো খুব প্রিয়। সেখানে হাতের কাজটি খুব সূক্ষ্ম ও সুন্দর ছিল।
শোনা যায়, আপনার প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ চাকরি ছাড়তে চায় না? বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
এখানে সবাইকে সহকর্মী হিসেবে দেখা হয়, কর্মচারী হিসেবে নয়। শুরু থেকেই সম্মান দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছে। অফিসে প্রায় সবাই একে অপরকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করেন। মতের অমিল হলেও সেটি সম্মান রেখেই প্রকাশ করা হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওনারশিপ। প্রত্যেকে নিজের কাজের দায়িত্ব নিজেই নেয়। নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমা দেওয়া হয়, এরপর সবাই স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায়। বিশেষ করে সৃজনশীল কাজে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করা হয় না। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি, স্বাধীনতা থাকলেই কাজের সেরাটা বেরিয়ে আসে। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সহকর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রথম আলো :
লা রিভের পোশাক নকশা করার সময় কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়?
নতুন কোনো সংগ্রহ তৈরির আগে আমরা আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করি। তবে সেই ট্রেন্ডকে হুবহু অনুসরণ করি না। বরং বাংলাদেশের সংস্কৃতি, আবহাওয়া, মানুষের জীবনযাপন ও রুচির সঙ্গে মিলিয়ে সেটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি। আমাদের কাছে মূল গুরুত্ব পায় তিনটি বিষয়—রং, প্রিন্ট ও সিলুয়েট।
একটি পোশাক দেখতে সুন্দর হলেই হবে না, সেটি পরেও আরাম লাগতে হবে। তাই কাটিং, আর্মহোল, দৈর্ঘ্য, ফিটিং, পকেটসহ ছোট ছোট বিষয়ও আমরা গুরুত্ব দিই। কোনো ডিজাইন বাজারে আনার আগে নিজেরাই পরে পরীক্ষা করি এবং প্রয়োজন হলে পরিবর্তন আনি।
পোশাকের গুণগত মানও আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভালো মানের উপকরণ, প্রিন্ট, স্টিচিং ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পরীক্ষা নিশ্চিত করার পরই পোশাক বাজারে আসে। আমাদের অনেক গ্রাহকই বলেন, ১০-১২ বছর আগের লা রিভের পোশাকও এখনো ভালো অবস্থায় আছে।
প্রথম আলো :
অনেকে বলেন, লা রিভের পোশাকে বছরের পর বছর একই ঘরানার নকশা দেখা যায়?
কিছু ক্ল্যাসিক ডিজাইন আমরা সচেতনভাবেই ধরে রাখি। কারণ, সেগুলোর প্রতি গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের ভালোবাসা রয়েছে। তবে প্রতিটি মৌসুমে সিলুয়েট, প্রিন্ট, কাট ও রঙে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করি। আমরা প্রতিটি মৌসুমে আন্তর্জাতিক বাজারে ফ্যাশন ট্রেন্ডকে অনুসরণ করে তা আমাদের রুচি অনুযায়ী পরিবর্তন বা পরিমার্জন করে থাকি। এগুলো করার জন্য আমাদের রয়েছে একটি গবেষণা টিম।
আমরা সলিড বা একরঙা পোশাক নিয়েও কাজ করেছি, বিশেষ করে অফিস ওয়্যার সংগ্রহে। তবে আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, গ্রাহকেরা প্লেইন পোশাকের চেয়ে এমন ডিজাইন বেশি পছন্দ করেন, যেখানে কাট, প্যাটার্ন বা প্রিন্টের মাধ্যমে আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। তাই প্রিন্ট এখন লা রিভের ব্র্যান্ড পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। তবু আমরা সব সময় নতুনত্ব আনার চেষ্টা করি, যাতে পরিচিত ধারা বজায় রেখেও প্রতিটি কালেকশনে ভিন্নতার ছাপ থাকে।
প্রথম আলো :
পোশাকের দাম নির্ধারণ করেন কীভাবে?
অনেকে মনে করেন, পোশাকের দাম শুধু কাপড় ও সেলাইয়ের খরচের ওপর নির্ভর করে। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বিস্তৃত। একটি পোশাকের মূল্য নির্ধারণের সময় কাঁচামাল, উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি, শোরুমের ভাড়া, কর্মীদের বেতন, মূলধনের খরচ, পরিচালন ব্যয়সহ পুরো ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার খরচ বিবেচনায় নিতে হয়। এরপর একটি যৌক্তিক মুনাফা যোগ করে মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
প্রথম আলো :
একই সঙ্গে সিইও এবং ডিজাইনার হিসেবে কীভাবে কাজে ভারসাম্য রাখেন?
আসলে আমার কাছে ডিজাইনার ও সিইও—দুটি ভূমিকা একে অপরের পরিপূরক। ডিজাইন আমার ভালোবাসা, তাই যেখানেই থাকি না কেন, নতুন কোনো রং, কাট, স্টাইল বা চলতি ধারা চোখে পড়লেই সেটি নিয়ে ভাবি এবং ডিজাইন দলের সঙ্গে ভাগ করে নিই। আমার বিশ্বাস, একজন ডিজাইনারকে সব সময় শিখতে হবে এবং চারপাশ থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে।
সিইও হিসেবে পুরো ব্যবসার দিকটি দেখতে হয়। গ্রাহকের মতামত, বিক্রয় দলের অভিজ্ঞতা, ডিজিটাল ডেটা—সবকিছু বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনেক সময় একটি ছোট ফিডব্যাকও নতুন ডিজাইন বা ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা রাখে। আমি এখনো নিজেই সোর্সিং করি। যে উপকরণ আমি নিজে ব্যবহার করব না, সেটি কখনোই গ্রাহকের জন্য কিনি না। একইভাবে প্রায় প্রতিটি নতুন ডিজাইন নিজে পরে ট্রায়াল দিই। কারণ, একটি পোশাক হ্যাঙ্গারে যেমন দেখায়, পরার পর সেটার অনুভূতি একেবারেই আলাদা হয়। আমার কাছে কাজ শুধু দায়িত্ব নয়, ভালোবাসার জায়গা। তাই আমি সব সময় বলি—আপনি যদি কাজকে ভালোবাসেন, একসময় কাজই আপনাকে বলে দেবে পরের পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত। এই ভাবনাই আমাকে ডিজাইনার ও সিইও—দুই দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে।
লা রিভের প্রথম শাখা কোনটি? দেশে মোট কতটি শাখা আছে? সবচেয়ে বড় শাখা কোনটি?
লা রিভের যাত্রা শুরু হয় ২০০৯ সালে উত্তরার আরকে টাওয়ারে প্রায় ৫৫০ বর্গফুটের একটি ছোট্ট আউটলেট দিয়ে। এখনো সেই শাখা আমাদের অন্যতম সফল শাখা। বর্তমানে দেশে আমাদের মোট ২৯টি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় শাখাটি মিরপুরে, আয়তন প্রায় ১৬ হাজার বর্গফুট। বড় শাখা হওয়ায় এখানে পণ্যের বৈচিত্র্যও বেশি রাখা সম্ভব। যমুনা ফিউচার পার্কসহ আরও কয়েকটি বড় শাখা রয়েছে। অনেকে জানতে চান, গুলশানে কোনো শাখা নেই কেন। আসলে আমরা শুধু ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য কোনো শাখা খুলতে চাই না। আমাদের লক্ষ্য হলো প্রতিটি শাখা শুরু থেকেই টেকসই ও লাভজনক হওয়া। গুলশানে ভাড়া তুলনামূলক অনেক বেশি, তাই সেখানে বড় বিনিয়োগের পরিবর্তে আমরা পুলিশ প্লাজায় নিজস্ব আউটলেটের মাধ্যমে সেই এলাকার গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছি। সিঙ্গাপুরে লা রিভের নিজস্ব স্টোর রয়েছে। ভবিষ্যতে আসিয়ান ও গালফ অঞ্চলে শক্ত অবস্থান তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।
প্রথম আলো :
আপনাদের তো একটি প্রিমিয়াম সাব-ব্র্যান্ডও আছে?
‘নার্গিসাস’। এই ব্র্যান্ডটি মূলত উচ্চমধ্যবিত্ত ও প্রিমিয়াম গ্রাহকদের কথা ভেবে তৈরি করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য, প্রতিটি পোশাককে যেন একটি বিশেষ সৃষ্টি হিসেবে গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়া যায়। তাই নার্গিসাসের প্রতিটি কালেকশন সীমিত সংখ্যায় এবং অনেক যত্নের সঙ্গে তৈরি করা হয়। লা রিভের নিয়মিত কালেকশনের তুলনায় নার্গিসাসে ব্যবহৃত হয় উন্নত মানের উপকরণ, যেমন সিল্ক ও বিশেষভাবে সংগ্রহ করা কাপড়। হাতের কাজ, সূক্ষ্ম কারুকাজ, বিশেষ ধরনের প্রিন্ট ও নিখুঁত স্টিচিং—সবকিছুর দিকেই বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
লা রিভের ৫টি বৈশিষ্ট্যের কথা বলুন, যেটা অন্য ব্র্যান্ড থেকে একে আলাদা করেছে।
আমার মতে, লা রিভকে অন্য ব্র্যান্ড থেকে আলাদা করেছে কয়েকটি বিষয়। প্রথমত, আমাদের একটি স্পষ্ট ভিশন আছে, যা শুরু থেকেই আমাদের পথ দেখিয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে আমরাই প্রথম দিকের ব্র্যান্ড, যারা শুধু ঈদ, বৈশাখ বা পূজা নয়, মৌসুমভিত্তিক সংগ্রহ চালু করেছি। তৃতীয়ত, আমরা গ্লোবাল ট্রেন্ড ফোরকাস্টিং করে সেটিকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, আবহাওয়া ও গ্রাহকের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে ডিজাইন তৈরি করি। এসব গবেষণা করার জন্য আমাদের আলাদা দল রয়েছে। তারা রং, প্রিন্ট, সিলুয়েট ও চলতি ধারা নিয়ে গবেষণা করে ডিজাইন দলকে দিকনির্দেশনা দেয়। চতুর্থত, মার্কেটিং ও ডিজিটাল উপস্থিতি আমাদের বড় শক্তি। শোরুম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, বিলবোর্ড ও বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে আমরা সব সময় গ্রাহকদের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি। সবশেষে, আরাম ও পণ্যের মান—এই দুটি বিষয়ে আমরা কখনো আপস করি না।