জোনাকি পোকা হারিয়ে যাচ্ছে কেন
জোনাকি পোকা প্রথম দেখেছিলাম ছোটবেলায়, গ্রামে। বড় হয়ে যখন গ্রামে গেলাম, সেই জোনাকি পোকা আর দেখিনি! ঢাকা শহরে এক জোনাকি সিনেমা হলের দালানটি ছাড়া অন্য কোনো জোনাকির কথা তো কল্পনাই করা যায় না। কেন হারিয়ে যাচ্ছে আলো জ্বালানো জোনাকি?
অনেক বছর আগের কথা। গরমের ছুটিতে নানাবাড়িতে গিয়েছি। সারা দিন মাঠ–ঘাট আর নদীর ধারে ঘুরে সন্ধ্যার আগে বাড়িতে ফিরতাম। সন্ধ্যা নামলেই কখনো কখনো বিদ্যুৎ চলে যেত। তখন বারান্দায় বসত গল্পের আসর।
এমনই এক অমাবস্যার রাতে অন্ধকারে ভূতের গল্প শুনছি। হঠাৎ পুকুরপাড়ের ঝোপঝাড়ের দিকে চোখ গেল। গভীর অন্ধকারের মধ্যে ছোট ছোট আলোর বিন্দু জ্বলছে আর নিভছে। সেই প্রথম আমার জোনাকি দেখা।
পাশের বাড়ির ছোটরা ‘জুনি পোকা! জুনি পোকা!’ বলে জোনাকি ধরতে ছুটে গেল। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, ওদের হাতের তালুতে ছোট্ট পোকাটার আলো মিটিমিটি জ্বলছে।
কিন্তু বড় হয়ে যখন গ্রামে গেলাম, সেই জোনাকি পোকা আর দেখিনি! ঢাকা শহরে এক জোনাকি সিনেমা হলের দালানটি ছাড়া অন্য কোনো জোনাকির কথা তো কল্পনাই করা যায় না।
কয়েক দিন আগে ইন্টারনেটে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছিল, আমরাই নাকি শেষ প্রজন্ম, যারা জোনাকি দেখেছি। কথাটা পুরোপুরি সত্য না হলেও জোনাকি যে অনেক জায়গায়ই কমে যাচ্ছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদেরও দুশ্চিন্তা আছে। কেন কমছে এই ছোট্ট আলোর পোকা?
কীভাবে আলো জ্বালে
জোনাকির সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলো, নিজের শরীরের ভেতরই আলো তৈরি করতে পারে এই পোকা। জীবন্ত প্রাণীর শরীরে এভাবে আলো তৈরির ঘটনাকে বলে ‘জৈবদ্যুতি’।
জোনাকির শরীরের বিশেষ একটি অঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় এ আলো। এতে লুসিফেরিন নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ ও লুসিফারেজ নামের একটি এনজাইম (শরীরের ভেতরের বিশেষ পদার্থ, যা রাসায়নিক বিক্রিয়াকে দ্রুত ঘটতে সাহায্য করে)সহ আরও কয়েকটি উপাদান কাজ করে। অক্সিজেন পৌঁছালেই রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়, জ্বলে ওঠে আলো।
এ আলো কিন্তু আমাদের বৈদ্যুতিক বাতির মতো গরম নয়। তাই জোনাকি আলো জ্বালালেও নিজের শরীর পুড়িয়ে ফেলে না।
আলো জ্বলা-নেভা নিয়ন্ত্রণও করতে পারে জোনাকি। শরীরে অক্সিজেনের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ওরা প্রয়োজনমতো আলো জ্বালায় ও নিভিয়ে দেয়।
এই আলো দিয়ে কী বলে
জোনাকির আলো শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়। এটি ওদের একধরনের ভাষা। পূর্ণবয়স্ক জোনাকিরা আলো জ্বালিয়ে একে অপরের সঙ্গে ‘কথা’ বলে।
বিশেষ করে পুরুষ জোনাকি নির্দিষ্ট ছন্দে আলো জ্বালিয়ে স্ত্রী জোনাকির দৃষ্টি আকর্ষণ করে। স্ত্রী জোনাকি সেই আলোর সংকেত দেখে সঙ্গী বেছে নেয়।
জোনাকির বাচ্চারাও আলো তৈরি করতে পারে। এ আলো দিয়ে ওরা শিকারিদের সতর্ক করে, যেন বলতে চায়, ‘আমাকে খাবে? খেলে কিন্তু বিপদ আছে!’
তবে সব জোনাকি আলো জ্বালাতে পারে না। কিছু প্রজাতি সঙ্গী খুঁজতে আলোর বদলে বিশেষ গন্ধ ব্যবহার করে।
জোনাকি কমছে কেন
আবার আসি মূল প্রশ্নে। জোনাকির জীবনচক্র বেশ দীর্ঘ। পূর্ণাঙ্গ জোনাকি হয়ে ওড়ার আগে অনেক প্রজাতির লার্ভা বা শূককীটকে এক থেকে কয়েক বছর মাটির নিচে, ঝরা পাতার স্তূপে কিংবা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় থাকতে হয়। এসব জায়গা নষ্ট হলেই বিপদ।
কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মাটি ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার জোনাকির লার্ভা ছোট শামুক, কেঁচো ও অন্যান্য পোকা খেয়ে বেঁচে থাকে। কীটনাশকের কারণে এসব খাবারও কমে গেছে।
শুধু তা–ই নয়; পুকুর, নদী কিংবা জলাভূমির আশপাশের ঝোপঝাড় কেটে সেখানে বাড়িঘর তৈরি করার ফলে জোনাকির নিরাপদ আবাসস্থল হারিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের খুব পরিচিত একটি অভ্যাসও জোনাকির জন্য সমস্যা তৈরি করছে। বাড়ির বাগানের সব ঝরা পাতা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে ফেলার কারণে সেখানে লুকিয়ে থাকা জোনাকির লার্ভার আশ্রয় নষ্ট হচ্ছে।
কৃত্রিম আলোও বিপদ
জোনাকির জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো কৃত্রিম আলো। রাতের অন্ধকারে জোনাকির আলো দূর থেকে সহজেই দেখা যায়। সেই আলোই ওদের নিজেদের ‘ভাষা’।
কিন্তু বাড়ির আলো, রাস্তার বাতি ও গাড়ির হেডলাইটের দাপটে জোনাকির ছোট্ট আলোর সংকেত অনেক সময় আর চোখেই পড়ে না।
ফলে সঙ্গী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আর সঙ্গী না পেলে নতুন প্রজন্মও আসে না।
জলবায়ু পরিবর্তনও জোনাকির জন্য বড় সমস্যা। অতিরিক্ত গরম, খরা কিংবা দীর্ঘ সময় মাটি শুকিয়ে থাকার কারণে জোনাকি প্রয়োজনীয় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ পাচ্ছে না।
জোনাকিকে কীভাবে বাঁচাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার প্রাক্তন শিক্ষার্থী নিলয় হাওলাদার। তিনি এখন ইতালির পাদোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, জোনাকিকে ফিরিয়ে আনতে হলে কী করতে হবে?
নিলয় হাওলাদার বলেন, ‘জোনাকি বাঁচাতে খুব বড় কোনো কাজ আমাদের করতে হবে না। বাড়ির আশপাশে কিছু গাছপালা ও ঝোপঝাড় থাকতে দেওয়া, অকারণ কীটনাশক ব্যবহার না করা এবং রাতের অপ্রয়োজনীয় আলো কমানো—এসবই কাজে আসতে পারে। ঝরা পাতার সবটুকু পরিষ্কার না করে কিছু জায়গা স্বাভাবিকভাবে পড়ে থাকতে দেওয়া যায়। এতে জোনাকির লার্ভাসহ আরও অনেক ছোট প্রাণী আশ্রয় পাবে। আর জোনাকি দেখলে ধরার বদলে দূর থেকে মিটিমিটি আলো দেখলেই ওরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে।’
সূত্র: ডিসকভার অ্যান্ড শেয়ার ডটওআরজি