ঘাস হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেই আয় দেড় লাখ টাকার বেশি

সুপার বোল হাফটাইম শো মানেই অবিশ্বাস্য সব সেট ডিজাইন আর চোখধাঁধানো পারফরম্যান্স। কিন্তু পুয়ের্তো রিকোর সুপারস্টার ব্যাড বানি ৮ ফেব্রুয়ারি যা দেখালেন, তা একেবারেই আলাদা; শোরগোল ফেলে দিয়েছে চারপাশে। ব্যাড বানির পারফরম্যান্সের সময় পুরো স্টেডিয়ামকে সাজানো হয়েছিল সবুজ ঘাসে। আসল ঘাস নয়, বরং ঘাস হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৫০০ মানুষ। আর এই ঘাস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য তাঁরা পেয়েছেন দেড় লাখ টাকার বেশি।

পুয়ের্তো রিকোর সুপারস্টার ব্যাড বানি ৮ ফেব্রুয়ারি যা দেখালেন, তা একেবারেই আলাদা
ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের পেশাদার আমেরিকান ফুটবল লিগ বা ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (এনএফএল) বার্ষিক চ্যাম্পিয়নশিপ সুপার বোল। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে বসে এই আসর। আর সুপার বোলের ফাইনালকে ধরা হয় যুক্তরাষ্ট্রের বছরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন।

পুরো দেশের সবাই তাকিয়ে থাকে এই ফাইনাল দেখার জন্য। তবে সুপার বোল ফাইনালে খেলার থেকে ‘ধুলা’ নিয়েই আলোচনা থাকে বেশি। এবার যেমন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন পুয়ের্তো রিকোর সুপারস্টার ব্যাড বানি ও তাঁর পারফরম্যান্সের সেট ডিজাইন।

কী ছিল ব্যাড বানির পারফরম্যান্সে

ব্যাড বানি কদিন আগেই গ্র্যামির মঞ্চে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে এক দফা তাতিয়ে দিয়েছেন মার্কিনদের। তাই আগ্রহ ছিল সুপার বোলের হাফটাইম শোয়ে কী করেন তিনি। স্প্যানিশ ভাষায় সংগীত পরিবেশন করে ঐক্য, সংস্কৃতি আর ভালোবাসার বার্তাই দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে।

পুরো আমেরিকা মহাদেশকে এক করে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিকে এক হাত নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে একই মঞ্চে ছিলেন লেডি গাগা, রিকি মার্টিন, পেদ্রো প্যাসকাল ও জেসিকা অ্যালবার মতো তারকারা।

ঘাসগুলোর ভেতরে ছিলেন একেকজন পারফরমার
ছবি: এক্স থেকে

কিন্তু এত কিছুর মধ্যে নজর কেড়ে নিয়েছে সেট ডিজাইন। পুরো মাঠ যেন হয়ে উঠেছিলেন পুয়ের্তো রিকোর প্রকৃতি, ঐতিহ্য আর ইতিহাসের অংশ। আখের গাছ আর বড় বড় ঘাসে ছেয়ে গিয়েছিল পুরো মাঠ। আখের গাছ কয়েকটি আসল হলেও, ঘাস কোনোটাই আসল ছিল না। বরং ঘাসের ভেতর ছিলেন একেকটি মানুষ।

আরও পড়ুন

কারা করেছেন এই ডিজাইন

হাফ টাইম শোয়ের মঞ্চ প্রস্তুত করার দায়িত্ব ছিল হলিউডের বিখ্যাত সেট ডিজাইনার হ্যারিয়েট ক্যাডফোর্ড ও ইয়োলো স্টুডিওর
ছবি: এক্স থেকে

হাফ টাইম শোয়ের মঞ্চ প্রস্তুত করার দায়িত্ব ছিল হলিউডের বিখ্যাত সেট ডিজাইনার হ্যারিয়েট ক্যাডফোর্ড ও ইয়োলো স্টুডিওর। কিন্তু সেট ডিজাইন করতে গিয়ে এক অদ্ভুত সমস্যার মুখোমুখি হন তাঁরা। যেহেতু ঘাসের মাঠে খেলা হচ্ছে, তাই মাঠে সরাসরি কোনো গাছ রাখার সুযোগ ছিল না। আর আসল গাছও কতটুকু রাখা যাবে, তা নিয়েও ছিল কড়াকড়ি।

কারণ, হাফ টাইম শোয়ের মঞ্চ তৈরি করতে গিয়ে তো আর খেলায় বিঘ্ন ঘটানো যাবে না। আর যদি মাঠের কোনো ক্ষতি হয়, তাহলে তো খেলোয়াড়দের চোটের একটা বাড়তি চিন্তা আছেই।

সবার আগ্রহ ছিল সুপার বোলের হাফটাইম শোয়ে কী করেন ব্যাড বানি
ছবি: এক্স থেকে

যে কারণে অন্য একটি পন্থার শরণাপন্ন হন তাঁরা। ঠিক করা হয়, প্রপগাছ হিসেবে শুধু আখের গাছগুলোই ব্যবহারের করা হবে। বাদ বাকি যেসব গাছ বা ঘাস ছিল, তার সব কটির ভেতরে থাকবে মানুষ। মানুষের গায়ে ঘাসের স্যুট পরিয়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে মাঠে। আর এর জন্য নারী-পুরুষ মিলিয়ে মোট ৫০০ জনের দরকার ছিল তাঁদের।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। পুরো দেশ থেকে আগ্রহীদের আহ্বান করা হয়। যদিও প্রথমেই বলা হয়নি, তাঁদের কাজ হবে ঘাস হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা। ব্যাড বানির পারফরম্যান্সে ব্যাকগ্রাউন্ড ড্যান্সার হিসেবে তাঁদের ডাকা হয়েছিল।

শর্ত হিসেবে ছিল উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি থেকে ৬ ফুটের মধ্যে হতে হবে। আর থাকতে হবে মার্চিং ব্যান্ড বা পারফরম্যান্সের অভিজ্ঞতা।

পারফরমারদের অভিজ্ঞতা

৫০০ জন ‘জীবন্ত ঘাস’-এর একজন ছিলেন ৩৩ বছর বয়সী ডিজিটাল মার্কেটার অ্যান্ড্রু আথিয়াস
ছবি: এক্স থেকে

এই ৫০০ জন ‘জীবন্ত ঘাস’-এর একজন ছিলেন ৩৩ বছর বয়সী ডিজিটাল মার্কেটার অ্যান্ড্রু আথিয়াস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনিই খোলাখুলিভাবে বলেছেন পুরো গল্প।  

ব্যাড বানির অন্ধ ভক্ত ফিলাডেলফিয়ার বাসিন্দা অ্যান্ড্রু। যখনই শোনেন সুপার বোলের হেডলাইনার ব্যাড বানি, তখনই মনে মনে ঠিক করে নেন এই শোয়ের অংশ হবেন তিনি। অ্যান্ড্রু বলেন, ‘এই কাজের জন্য আমাকে প্রতি ঘণ্টায় ১৮ ডলার ৭০ সেন্ট (প্রায় ২ হাজার টাকা) দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সত্যি বলতে, ব্যাড বানির জন্য আমি বিনা মূল্যেও এই কাজ করতে রাজি ছিলাম!’

টানা দুই সপ্তাহ চলেছে মহড়া। প্রথম দিন প্রত্যেকের শরীরের মাপ নিয়ে সে অনুযায়ী তৈরি করে আনা হয়েছে ঘাস। পুরো স্যুটের ওজন ছিল প্রায় ২২ কেজি। এই স্যুট নিয়েই ৭ দিন টানা ৮ ঘণ্টা করে চলেছে মহড়া।

৫ ঘণ্টা স্যুটের ভেতর থাকার পর ১৫ মিনিটের পারফরম্যান্সে অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে ৫০০ ব্যাকগ্রাউন্ড আর্টিস্টের
ছবি: এক্স থেকে

অতঃপর ৮ ফেব্রুয়ারি সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে সবার। ৫ ঘণ্টা স্যুটের ভেতর থাকার পর ১৫ মিনিটের পারফরম্যান্সে অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে ৫০০ ব্যাকগ্রাউন্ড আর্টিস্টের। আর এর পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে পারফরমারদের ভিডিও।

অ্যান্ড্রু বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল, কোনোভাবেই যাতে নড়াচড়া না করি। কারণ, পুয়ের্তো রিকোতে খুব একটা বাতাস নেই। তাই একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল ১৫ মিনিট।’

আরও পড়ুন

নিয়ম ছিল কড়া

টানা দুই সপ্তাহ চলেছে মহড়া
ছবি: এক্স থেকে

তবে পারফরম্যান্সের থেকেও কঠিন ছিল মুখে কুলুপ এঁটে থাকা। পুরো পারফরম্যান্সের ব্যাপারে বাইরের কাউকে জানানোর কোনো সুযোগ ছিল না। প্রত্যেককে স্বাক্ষর করতে হয়েছে বাধ্যতামূলক এনডিএ বা প্রকাশ না করার চুক্তিপত্রে।

শোনা গেছে, ১০-১৫ জন মূল পর্বের জন্য প্রস্তুত থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগেভাগেই ছবি শেয়ার করায় তাঁদেরকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কঠিন পরীক্ষা সামলে অবশেষে ঘাস হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়েছে তাঁদের।

কস্টিউমের একটি অংশ বাসায় নিয়ে যেতে পেরেছেন সবাই। আর প্রতি ঘণ্টায় ১৮ ডলার ৭০ সেন্ট করে মহড়া ও মূল অনুষ্ঠানসহ মোট ৭০ ঘণ্টায় প্রত্যেকে আয় করেছেন ১ হাজার ৩০০ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

এ ছাড়া দুই সপ্তাহ ফিলাডেলফিয়ায় থাকা-খাওয়া ছিল সম্পূর্ণ ফ্রি। তবে অ্যান্ড্রু আথিয়াসের মতো পাগলামির ফলেই সফল হয়েছে এই আয়োজন।

পুরো পারফরম্যান্সের ব্যাপারে বাইরের কাউকে জানানোর কোনো সুযোগ ছিল না
ছবি: এক্স থেকে

অ্যান্ড্রু বলেন, ‘আমি সেই পাগলদের একজন, যারা শুধু ব্যাড বানির হাফটাইম শোয়ের অংশ হতে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে উড়ে এসেছি। দুই সপ্তাহের কঠোর পরিশ্রমের পর যখন মূল পারফরম্যান্স শেষ হলো, মনে হলো, এই পরিশ্রম সার্থক!’

সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার, কমপ্লেক্স ডটকম, এল ডেকোর

আরও পড়ুন