মেসি কি পেনাল্টি মিস করেছেন রোনালদোর অন্ধভক্ত আই শো স্পিডের কারণে, কে এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর
মিসরের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচ খেলার ১৫ মিনিটেই গোল খেয়ে বসে আর্জেন্টিনা। তবে ১৯ মিনিটেই ম্যাচে ফেরার সুযোগ পায় তারা। পেনাল্টি নেন লিওনেল মেসি। কিন্তু গোলপোস্টের ডান দিকে নেওয়া মেসির শটটি দুর্দান্ত দক্ষতায় আটকে দেন মিসরীয় গোলকিপার মোস্তফা শোবের। বলা হচ্ছে, মেসি যাতে পেনাল্টি মিস করেন, সে জন্য মিসরের গোলপোস্টের পেছনের গ্যালারিতে অদ্ভুত কাণ্ড ঘটান ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর অন্ধভক্ত ও জনপ্রিয় স্ট্রিমার আই শো স্পিড। কে এই আই শো স্পিড?
স্পেনের কাছে হেরে পর্তুগাল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ায় স্পিডের বেশ মন খারাপ ছিল। মেসি যখন পেনাল্টি কিক নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, স্পিড তখন মিসরের জার্সি পরে ঠিক গোলপোস্টের সোজা পেছনের গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
মেসি শট নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তাঁর মনোযোগ নষ্ট করার জন্য স্পিড জোরে জোরে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে থাকেন। একই সঙ্গে হাত-পা অদ্ভুতভাবে নাড়িয়ে অনবরত চিৎকার করতে থাকেন। মেসি যখন সত্যি সত্যি পেনাল্টি মিস করলেন, তখন স্পিড নিজেই অবাক হয়ে যান।
নিজের এই ‘চেষ্টা’ কাজ করেছে দেখে স্পিডের মুখ হাঁ হয়ে যায়। বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, মেসি গোল মিস করেছেন। এরপর লাইভ চ্যাটের দর্শকের উদ্দেশে আনন্দে চিৎকার করে বলেন, ‘এটা কি আসলেই কাজ করেছে? চ্যাট, এটা কি কাজ করেছে?’
মেসির পেনাল্টি মিস
লিওনেল মেসির ফুটবল বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত মোট আটটি পেনাল্টি শট নিয়ে ৪টিই মিস করেছেন। অর্থাৎ তাঁর অর্ধেক পেনাল্টিই গোল হয়নি, যা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
আইটিভির তথ্যানুযায়ী, মেসি বিশ্বকাপে এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড গড়েছেন। চলতি আসরে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করার পর, আর সর্বশেষ মিসরের বিপক্ষেও পেনাল্টিতে গোল করতে ব্যর্থ হন। এর মাধ্যমে টাইব্রেকার বাদে বিশ্বকাপের একই আসরে দুটি পেনাল্টি মিস করা ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় লিওনেল মেসি।
তবে স্পিডের অদ্ভুত কাণ্ডকারখানার কারণেই যে মেসি পেনাল্টি মিস করেছেন, এটা হলফ করে বলা যায় না। আর পেনাল্টি মিসের পরও শেষ পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেছে আর্জেন্টিনা।
কে এই আই শো স্পিড
আসল নাম ড্যারেন জেসন ওয়াটকিন্স জুনিয়র। তবে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ‘আই শো স্পিড’ বা ‘স্পিড’ নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওতে জন্ম নেওয়া স্পিড একাধারে অনলাইন স্ট্রিমার, ইনফ্লুয়েন্সার, ইউটিউবার ও র্যাপার।
লাইভ স্ট্রিমিংয়ে অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা, অতিরিক্ত উত্তেজনা আর চিৎকার চেঁচামেচির জন্য স্পিড বিশ্বজুড়ে পরিচিত। জেন-জি ও জেন–আলফার সদস্যারাই মূলত তাঁর সবচেয়ে বড় ভক্ত।
২০১৬ সালে স্পিড নিজের ইউটিউব চ্যানেল খোলেন। শুরুতে শুধু গেম খেলার ভিডিও দিলেও ২০২১ সালের দিকে লাইভ স্ট্রিমিংয়ে তাঁর মজার ও উগ্র প্রতিক্রিয়ার কারণে দ্রুত সবার নজরে আসেন। এরপর বিখ্যাত ইউটিউবার মিস্টার বিস্টের সঙ্গে বেশ কিছু ভিডিও করার সুযোগ পান। সেখান থেকেও বড় ধরনের ফলোয়ার আসে।
২০২২ সাল থেকে স্পিড ফুটবল নিয়ে ভিডিও বানাতে শুরু করেন। নিজেকে পর্তুগিজ ফুটবল তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর একজন অন্ধভক্ত হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। মূলত রোনালদোকে কেন্দ্র করেই স্পিডের বেশির ভাগ ফুটবল ভিডিও।
র্যাপার হিসেবেও স্পিড বেশ পরিচিত। চলতি ফুটবল বিশ্বকাপের অফিশিয়াল অ্যালবামেও তাঁর ‘চ্যাম্পিয়নস’ গানটি জায়গা করে নিয়েছে। শখ থেকে বানানো গানটি সবাই এত বেশি পছন্দ করেছিল যে পরবর্তী সময় ফিফা এটিকে তাদের মূল অ্যালবামে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
স্পিড বেশ কয়েকবার বিশ্বের সেরা ‘স্ট্রিমার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জিতেছেন। এই জনপ্রিয়তার কারণেই ফিফা তাঁকে অফিশিয়াল স্ট্রিমার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ফিফার হয়ে স্ট্রিমিং করার জন্যই তিনি সরাসরি মাঠে গিয়ে খেলা দেখার সুযোগ পান। আর নিত্যনতুন অদ্ভুত সব বিতর্কের জন্ম দেন।
বর্তমানে ইউটিউবে স্পিডের সাবস্ক্রাইবার ৫৭ মিলিয়নের বেশি। পাশাপাশি ইনস্টাগ্রামে ৪৫ মিলিয়ন ও টিকটকে ৪৭ মিলিয়ন ফলোয়ার নিয়ে বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় ইন্টারনেট সেলিব্রেটি।
যে দলেরই জার্সি পরছেন, সে দলই হারছে
আর্জেন্টিনা ও মিসরের খেলা শুরু হওয়ার আগেই ফেসবুকে স্পিডের একটি ছবি বেশ ভাইরাল হয়। সেই ছবিতে স্পিডকে আর্জেন্টিনার জার্সি পরা অবস্থায় দেখা যায়। আর তা দেখেই আর্জেন্টিনার ভক্তদের মাথায় হাত।
ভক্তদের এই চিন্তার পেছনে একটা বড় কারণও ছিল। স্পিড এর আগে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যে দলের জার্সি পরে মাঠে খেলা দেখতে গেছেন, সেই দলই হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে। তাই ভক্তদের মনে ভয় ছিল।
তবে স্পিডের আর্জেন্টিনার জার্সি পরা ছবিটি আদতে এআই দিয়ে তৈরি। বাস্তবে আর্জেন্টিনা ও মিসরের ম্যাচে স্পিড কিন্তু মিসরের জার্সি পরেই মাঠে এসেছিলেন। অনেকেই বলছে, এ কারণেই হয়তো এবার আর্জেন্টিনার বদলে মিসরের কপাল পুড়ল।
শুরুটা হয় আইভরিকোস্ট আর নরওয়ের ম্যাচ দিয়ে। সেই ম্যাচে স্পিড আইভরিকোস্টের জার্সি পরে মাঠে হাজির হন। দলটির জন্য গলা ফাটিয়ে, লাফালাফি করেও লাভ হয়নি। আইভরিকোস্ট সেই ম্যাচে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়।
এরপরের ঘটনা আর্জেন্টিনা আর কেপ ভার্দের ম্যাচে। এবার স্পিডের গায়ে ছিল কেপ ভার্দের জার্সি। গ্যালারিতে বসে উগ্র ভক্তদের মতো চিৎকার, লাফালাফি। এমনকি পাশের এক আর্জেন্টিনা–সমর্থকের সঙ্গে হাতাহাতি ও তর্কাতর্কিতেও জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু এবারও তাঁর সমর্থিত দল ম্যাচটি হেরে যায়।
তখনো বিষয়টা কেউ খেয়াল করেনি। এরপর স্পিড ব্রাজিল আর নরওয়ের ম্যাচে ব্রাজিলের জার্সি পরে খেলা দেখে যান। এই ম্যাচ নিয়ে ছিল সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা। পাঁচবারের বিশ্বকাপজয়ী দলকে হারিয়ে দিল নরওয়ে।
সবশেষে ছিল পর্তুগাল আর স্পেনের হাইভোল্টেজ ম্যাচ। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর অন্ধভক্ত স্পিড সেদিন স্বাভাবিকভাবেই পর্তুগালের জার্সি পরে গ্যালারিতে ছিলেন। কিন্তু ম্যাচ শেষে তাঁকে গ্যালারিতে কাঁদতে দেখা যায়। কান্নায় শেষ হয় রোনালদোর বিশ্বকাপ।
আর সেখান থেকেই আর্জেন্টিনা-বিরোধী ফুটবল–ভক্তরা মূলত আর্জেন্টিনার ওপর স্পিডের সেই জার্সি অভিশাপ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। তবে স্পিডের তুকতাক শেষ পর্যন্ত কাজ করেছে মিসরের পক্ষে।
সূত্র: ইয়াহু স্পোর্টস, অ্যাথলেটিক, ফোর্বস