ঝুমু বলল, ‘ইমন ভাই, চোখ খুলে এবার আমার জন্মদিনের উপহারটা বের করেন’

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে লেখা আহ্বান করেছিল প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভালোবাসার টক–ঝাল–মিষ্টি গল্প লিখে পাঠিয়েছেন পাঠক। কেউ লিখেছেন দুরন্ত প্রেমের গল্প, কেউবা শুনিয়েছেন দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়ার অনুভূতি। তেমনই একটি লেখা পড়ুন এখানে।

ছবি: এআই/প্রথম আলো

ঝুমু আমাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল! ওর অবাক হওয়া দেখে মনটা আমার খারাপ হলো। এমন তো নয়, সে আমাকে আগে দেখেনি। ঝুমুর বাবা বাহার সাহেব, আমার অফিসের সহকর্মী ছিলেন। গত বছর নিজের রিটায়ারমেন্টের অনুষ্ঠানে বিদায় ভাষণ দিতে গিয়ে ভদ্রলোক অজ্ঞান হয়ে যান। একটু সুস্থ বোধ করলে বাহার সাহেবকে আমি বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসি।

সেদিনই প্রথম ঝুমুকে দেখি। মেয়েটি সুন্দরী কি না, জানি না; কিন্তু সেদিন বিকেলে ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে পারছিলাম না। বাহার সাহেবকে অসুস্থ অবস্থায় দেখে তার পরিবারের কে কী বলছিল, কিছুই আমার কানে ঢোকেনি সেদিন। আমি শুধু ঝুমুর দুই হাতে রাঙানো মেহেদির লালচে আভায় ডুবে ছিলাম।

ঝুমুকে আবার দেখার ইচ্ছায় কদিন পরই ওদের বাসায় গেলাম। হঠাৎ ব্যস্ততায় হারানো বাহার সাহেব আমাকে দেখে খুশি হলেন। আমার সঙ্গে দেশের নির্বাচন-পূর্ব সার্বিক অবস্থা, এলপিজি সিলিন্ডার বাজার থেকে উধাও হয়ে কই গেল…ইত্যাদি বিষয়ে আলাপ শুরু করলেন।

আমার দুচোখ তখন মেহেদির নকশায় জড়ানো আশ্চর্য মায়াবী দুটি হাত খুঁজছে।

অবশেষে রাজকন্যার দেখা পাওয়া গেল। বাহার সাহেবের রিটায়ারমেন্ট–পরবর্তী অসুস্থতার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য ঝুমুর নাম্বারটিও হস্তগত করলাম।

ফেসবুকে ‘খোঁজ’ লাগিয়ে ঝুমুর প্রোফাইলটিও পাওয়া গেল! বাহার সাহেবের জন্য চিন্তার শেষ নেই... এ রকম কিছু লিখে ঝুমুকে রিকোয়েস্টও পাঠালাম।

বোকা নাকি অতি চালাক মেয়েটা বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণও করে ফেলল।

তারপর...

অফিস শেষে মেসে ফিরে শুধুই আমি আর ঝুমু। মানে ঝুমুর প্রোফাইলে ঘাঁটাঘাঁটি। জানলাম, ঝুমু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খটমটে সাবজেক্ট রসায়নে পড়ে। ভরতনাট্যম শিল্পী ঝুমুর ইচ্ছা বাচ্চাদের জন্য নাচের স্কুল খোলা। ফেসবুকই জানাল, ঝুমু বেশ আড্ডাবাজ, ছেলে বন্ধু আছে যথেষ্ট!

২.

আমি এখন ঝুমুর অবাক মুখের সামনে বসা।

‘ভাইয়া, এই অসময়ে কোত্থেকে?’

‘শুভ জন্মদিন, ঝুমু। মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্নস!’ এটুকু বলতেই আমার গলা শুকিয়ে কাঠ।

‘থ্যাঙ্ক ইউ, কিন্তু আপনি তো ফেসবুকেই উইশ করতে পারতেন। কষ্ট করে বাসায় না এলেও হতো।’

মনে মনে বললাম, ২৭ দিন পর তোমাকে আবার দেখলাম ঝুমু।

ইতিমধ্যেই বাহার সাহেব এলেন, ‘দেশের অবস্থাটা কী বল তো ইমন? নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অবস্থা কেমন দাঁড়াবে?’

বাহার সাহেব দীর্ঘ রাজনৈতিক টক শোর প্রস্তুতি নিয়ে বসলেন।

ঝুমু বলল, ‘আপনি বাবার সঙ্গে গল্প করেন! আমি রেডি হয়ে আসি। আজ বিকেলে বন্ধুরা টিএসসিতে আমার জন্মদিনের কেক কাটবে!’

আধঘণ্টা পর বাহার সাহেব যখন ইঙ্গ–মার্কিন ষড়যন্ত্র ও দেশের আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা নিয়ে তার দীর্ঘ বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন ভেতর থেকে ঝুমু এল।

নীল একটা শাড়ি পরেছে ঝুমু! নীল অপ্সরাদের দিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না! আমি চোখ নামিয়ে নিলাম।

‘বাবা, আমি ইমন ভাইকে নিয়ে গেলাম। দেশের যা অবস্থা।’ আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিল ঝুমু। বাহার সাহেব আলোচনায় বিঘ্ন ঘটাতে মনঃক্ষুণ্ণ হলেও মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে সম্মতি দিলেন।

রিকশায় ঝুমুর পাশে বসে চোখ বুজে ফেললাম। কবি বলেছেন, অবিশ্বাস্য সুন্দর মুহূর্তগুলো চোখ বুজে উপভোগ করতে হয়।

ঝুমু বলল, ‘ইমন ভাই, চোখ খুলে এবার আমার জন্মদিনের উপহারটা বের করেন।’

‘তুমি কি আসলেই বন্ধুদের সাথে আজকে কেক কাটবে?’ ফিসফিসিয়ে বলি।

‘নির্ভর করছে আপনি আজকে কী গিফট দিচ্ছেন তার ওপর’, মুচকি হাসল ঝুমু।

পকেট থেকে একটা রুপার নূপুর বের করে ওর হাতে দিলাম।

‘আরেকটা কই?’

‘বিয়ের দিন পরিয়ে দেব!’ অনন্ত সাহস নিয়ে বলে ফেলি।

আরও পড়ুন