যেসব অবহেলায় বাড়ে নারীর ভোগান্তি
পরিবারের সবার যত্ন নেয় নারী। কিন্তু নারীর যত্ন নেয় কটা পরিবার? এমনকি নারী নিজেও কি নিজের যত্ন নেয়? সবার সব প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নিজের জন্য সময় থাকে না অনেক নারীরই। অথচ নারীজীবনের নানা পর্যায়ে কেবল অবহেলার কারণেই শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যা জটিল হয়ে ওঠে, বাড়ে ভোগান্তি। চলুন, আজ জেনে নিই বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন এ বিষয়ে।
কৈশোর থেকেই একটি মেয়ের আমিষ, আয়রন, ক্যালসিয়ামসহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি হতে পারে। দেশে এখনো এ ব্যাপারে সেভাবে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। আর্থিক সংগতি কম থাকলেও কীভাবে দামি খাবারের বিকল্প দিয়ে পুষ্টির চাহিদা মেটানো যায়, সে জ্ঞান অনেকেরই নেই।
আবার আর্থিক সংগতি থাকলেও কোনটা খাওয়া উচিত আর কোনটা নয়, সে ব্যাপারে অনেকে সচেতন নন। এমনটাই বলছিলেন টাঙ্গাইলের কুমুদিনী সরকারি কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শম্পা শারমিন খান।
শম্পা শারমিন খান আরও বললেন, বহু নারী ভোগেন আয়রনের ঘাটতিতে। আয়রনের ঘাটতি হলে রক্তস্বল্পতা ছাড়াও নানা সমস্যা দেখা দেয়। ক্যালসিয়ামের ঘাটতির কারণে হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে। হাড়ক্ষয়, হাঁটুব্যথা, কোমরব্যথা এবং সহজেই হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন একজন নারী। ত্বকের পর্যাপ্ত অংশে যথেষ্ট রোদ না পাওয়ার কারণে ভিটামিন ‘ডি’র ঘাটতিও হয়। এতে কমে যায় ক্যালসিয়ামের মাত্রা, হয় অন্যান্য জটিলতা।
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়—কৈশোর, তারুণ্য, গর্ভকাল, স্তন্যদান, এমনকি মেনোপজের সময়কার পুষ্টির চাহিদা না মিটলেও দেখা দিতে পারে নানাবিধ শারীরিক সমস্যা। ওজন বেশি, কিন্তু দেহে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি রয়েছে—এমনটাও দেখা যায়।
হরমোনের ব্যাপারস্যাপার
গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের হরমোন ও ডায়াবেটিস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. তানজিনা হোসেন বলছিলেন, ‘হরমোনজনিত সমস্যায় নারীরাই বেশি ভোগেন। অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের সমস্যার উপসর্গগুলো খুব একটা প্রকট হয় না। তাই সমস্যাটি শনাক্ত হতেই অনেক দেরি হয়ে যায়। ফলে জটিলতা বাড়ে।’ এ বিষয়ে তাঁর আরও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন তিনি।
মাসিকের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে অনেকেই সংকোচ বোধ করেন। আবার কিশোরী মাসিকজনিত সমস্যার কথা জানালেও অনেক সময় মা-খালারা বলে দেন, এগুলো স্বাভাবিক বিষয়। পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), বয়সের আগেই বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানো কিংবা নির্দিষ্ট বয়স পেরিয়ে গেলেও বয়ঃসন্ধি না হওয়ার মতো সমস্যাগুলোকেও গুরুত্ব দেয় না অনেক পরিবার।
সবার জন্য আবশ্যক শরীরচর্চার দিকটাও থাকে অবহেলিত। বরং মাসিকের সময় শরীরচর্চায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, একজন সুস্থ কিশোরীর জন্য যে নিষেধাজ্ঞার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ফিটনেস ধরে রাখতে যেসব ব্যায়াম আবশ্যক, সেগুলোর চর্চা করেন খুবই কমসংখ্যক নারী।
মেনোপজের সময়কার কষ্টগুলো কমাতে যে একজন হরমোনবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, এটা জানেনই না অনেকে। এ সময় একজন নারী ঘরে-বাইরে নানা অস্বস্তিতে পড়েন।
ডায়াবেটিসের তেমন উপসর্গ থাকে না। অথচ নীরবেই নানা জটিলতার কারণ হয়ে ওঠে এই রোগ। তাই ৪০ পেরোলে বছরে অন্তত একবার সবারই কিছু পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। অথচ অধিকাংশ নারী এসব পরীক্ষা করান না। পরিবারেরও এ বিষয়ে খেয়াল থাকে না। পরে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মতো জটিলতা সৃষ্টি হয়।
যে কষ্ট কেবল নারীর
মাসিকের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়েও সবাই সচেতন নন। অনেকেই বিয়ের সঠিক বয়সের দিকে খেয়াল রাখেন না। কোথাও মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় ১৮ হওয়ার আগে, কোথাও আবার ক্যারিয়ার গড়তে ৩০ পেরিয়ে যায়।
খুব কম বা খুব বেশি বয়সের মাতৃত্ব ঝুঁকিপূর্ণ। আর ৩০–এর পর গর্ভধারণের সম্ভাবনাও কমতে থাকে। এমনটাই বলছিলেন স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. আনিকা তাবাসসুম।
আনিকা তাবাসসুম আরও জানান, গর্ভকালীন ও প্রসবজনিত জটিলতায় ভোগেন এ দেশের বহু নারী। এমন সমস্যা এড়াতে গর্ভকালে নিয়মমাফিক চেকআপ, জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি সম্পর্কে পরামর্শ নেওয়া, হাসপাতালে সম্ভব না হলেও প্রশিক্ষিত ধাইয়ের মাধ্যমে প্রসব, প্রসবের সময় জটিলতা হলে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া, জটিলতা থাকলে আগেই হাসপাতালে যাওয়া, গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন ঝুঁকিপূর্ণ উপসর্গ সম্পর্কে জানা—
এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। প্রসবজনিত জটিলতায় বা প্রসব–পরবর্তী বিশ্রামের অভাবে জরায়ু, প্রস্রাবের থলি বা পায়খানার থলি নেমে যেতে পারে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রস্রাব ঝরতে পারে।
সংকোচে বাড়ে জটিলতা
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ক্যানসার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তুষার দাস বলছিলেন, তাঁদের কাছে এমন বহু নারী আসেন, যাঁদের স্তন বা জরায়ুমুখের ক্যানসার অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রাথমিক অবস্থায় এলে এ ধরনের রোগ সহজেই নিরাময় করা সম্ভব। কিন্তু নারী চিকিৎসকের অপ্রতুলতার কারণে সংকোচে পড়েন এই রোগীরা। একেবারে জটিল পর্যায়ে পৌঁছালে তবেই যান চিকিৎসকের কাছে।
এ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সমর্থনও পান না অনেকেই। এ দেশের নারীদের মধ্যে সুস্থ অবস্থায় ক্যানসার স্ক্রিনিং করার প্রবণতাও কম। অথচ স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ক্যানসার ধরা পড়ে।
প্রতি মাসে নিজের হাতে নিজের স্তন পরীক্ষা করার মতো সহজ কাজটি নিয়েও সবাই সচেতন নন। জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে যে টিকা নেওয়া প্রয়োজন, সে সম্পর্কেও সচেতনতা কম। অথচ সরকারি টিকা গ্রহণের বয়স পেরিয়ে গেলেও এই টিকা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে দেশে।
সংকোচের কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি করায় ক্যানসার ছাড়াও বহু রোগের জটিলতা বাড়ে। সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সার্জন ডা. রেজা আহমদ জানালেন এ ব্যাপারে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা।
ঢাকার বাইরে নারী সার্জনের সংখ্যা খুবই কম। অথচ পায়ুপথের সমস্যার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো পুরুষ চিকিৎসকের কাছে বলতে চান না নারীরা। তাই সমস্যাগুলো দিনে দিনে বাড়তে থাকে। খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর না হওয়ায় অনেকে ভোগেন কোষ্ঠকাঠিন্যে। তা থেকেই হয় নানা জটিলতা।
নীরোগ ভেবেও…
ডায়াবেটিস ছাড়াও আরেক নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ। আবার রক্তে খারাপ চর্বি বেড়ে গেলেও অনেক সময়ই তেমন উপসর্গ দেখা দেয় না। অথচ এ ধরনের সমস্যা থেকেই বাড়ে দীর্ঘমেয়াদি বহু রোগের ঝুঁকি। এমনটাই বলছিলেন ঢাকার ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন–বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইফ হোসেন খান।
৪০ পেরোনোর পর প্রতিবছর কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ে জোর দিলেন ডা. সাইফ হোসেন খানও। আজ বাড়ির অনুষ্ঠান, কাল সন্তানের পরীক্ষা—এসব অজুহাতে পেছাতে থাকে একজন নারীর চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার তারিখ, হয়তো হারিয়েই যায় ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে।
ডা. সাইফ হোসেন খান বলেন, অনেক নারীই বাইরে গেলে ওয়াশরুম ব্যবহারের অস্বস্তিতে পানি খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দেন। লম্বা সময় প্রস্রাব আটকে রাখেন। এভাবে বারবার প্রস্রাবে সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েন তাঁরা, কিডনিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বিষয়েও সচেতনতা প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন নারীবান্ধব সামাজিক পরিবেশ।
শিকল পরা মন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী এবং পিএইচডি গবেষক হাজেরা খাতুন বলছিলেন, নানা কারণেই নারীরা মানসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন। হরমোন–সংশ্লিষ্ট কারণ যেমন থাকে, তেমনি থাকে পারিবারিক বৈষম্য ও সামাজিক অবহেলাও। নিজের সত্তাকেই হারিয়ে ফেলেন অনেকে। ভোগেন একাকিত্বে, বিষণ্নতায়। পথঘাটে, অনলাইন দুনিয়ায়, এমনকি নিজের বাড়িতেও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায় নারীর সঙ্গে।
তবে কোনো কারণে মানসিক সমস্যায় পড়লে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেও অনাগ্রহী থাকে বহু পরিবার। মানসিক সমস্যার চিকিৎসা নিতে গেলে সামাজিকভাবে অপদস্থ হওয়ার ভয়ও থাকে। তাই সবার আগে নিজের স্বাস্থ্য, সেটা পুরুষের বেলায় যেমন সত্য, নারীর বেলাতেও তা–ই।