একই মোজা কি একাধিক দিন পরা ঠিক?

জিনস, টি–শার্ট বা সোয়েটার—এসব আমরা অনেক সময় একাধিক দিন পরেই ধুয়ে নিই। কিন্তু মোজার বেলায় বিষয়টি কি একই রকম? এক দিন পরা মোজা আবার পরলে আদতে কী হয়, তা জানলে হয়তো দ্বিতীয়বার ভাববেন।

মোজা ঘাম আটকে রাখে, ফলে ব্যাকটেরিয়া আরও দ্রুত বাড়ে
ছবি: পেক্সেলস

মোজার ভেতরে থাকে অদৃশ্য এক জগৎ

আমাদের পা দেখতে পরিষ্কার লাগলেও সেখানে থাকে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের (ফাঙ্গাস) বিশাল বসতি। গবেষণা বলছে, মানুষের পায়ে একসঙ্গে প্রায় হাজার ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক থাকতে পারে।

শরীরের অন্য যেকোনো অংশের তুলনায় পায়ে ছত্রাকের বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি। এর একটা বড় কারণ পায়ে ঘামগ্রন্থি অনেক। ঘাম, মৃত চামড়া আর উষ্ণ পরিবেশ মিলেই ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের জন্য আদর্শ জায়গা তৈরি করে, বিশেষ করে আঙুলের ফাঁকে।

দুর্গন্ধের পেছনের বিজ্ঞান

পায়ের ব্যাকটেরিয়াগুলো ঘাম ও মৃত চামড়া খেয়ে বেঁচে থাকে। এদের তৈরি বর্জ্য থেকেই মূলত দুর্গন্ধ হয়।

যেমন—

  • স্ট্যাফিলোককাস হোমিনিস নামের ব্যাকটেরিয়া ঘাম থেকে এমন একধরনের অ্যালকোহল তৈরি করে, যার গন্ধ পচা পেঁয়াজের মতো।

  • স্ট্যাফিলোককাস এপিডারমিস তৈরি করে চিজের মতো গন্ধ।

  • কোরিনেব্যাকটেরিয়াম নামের ব্যাকটেরিয়া এমন একধরনের অ্যাসিড তৈরি করে, যার গন্ধ অনেকের কাছে ছাগলের গায়ের গন্ধের মতো লাগে।

  • পা যত বেশি ঘামে, ব্যাকটেরিয়ার খাবার তত বাড়ে আর গন্ধও হয় তত তীব্র।

আরও পড়ুন

কেন একই মোজা বারবার পরা ঝুঁকিপূর্ণ

মোজা ঘাম আটকে রাখে। ফলে ব্যাকটেরিয়া আরও দ্রুত বাড়ে। শুধু তা–ই নয়, এই ব্যাকটেরিয়া কাপড়ের ওপর দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, সুতি কাপড়ে ব্যাকটেরিয়া ৯০ দিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। এক গবেষণায় দেখা যায়, এক দিন পরা পোশাকগুলোর মধ্যে মোজায় সবচেয়ে বেশি জীবাণু থাকে।

সংখ্যাটা চমকে দেওয়ার মতো—

এক জোড়া মোজায়: প্রায় ৮–৯ মিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া

একটি টি–শার্টে: গড়ে ৮৩ হাজার ব্যাকটেরিয়া

অর্থাৎ মোজা আবার পরলে আপনি আগের দিনের জীবাণুকেই নতুন করে বাড়তে সাহায্য করছেন।

মোজায় শুধু পায়ের জীবাণুই থাকে না, ঘরের মেঝে, জিমের ফ্লোর বা বাইরের মাটি থেকেও জীবাণু মোজায় লেগে যায়
ছবি: পেক্সেলস

শুধু পায়ের জীবাণু নয়

মোজায় শুধু পায়ের জীবাণুই থাকে না। ঘরের মেঝে, জিমের ফ্লোর বা বাইরের মাটি থেকেও জীবাণু মোজায় লেগে যায়। এদের মধ্যে কিছু ছত্রাক আছে—যেমন অ্যাসপারজিলাস, ক্যান্ডিডা, ক্রিপটোককাস—এসব শ্বাসনালি বা পেটের সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

এ ছাড়া মোজার জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে—

  • জুতা

  • বিছানা

  • সোফা

  • ঘরের মেঝেতে

এ কারণেই অপরিষ্কার মোজা থেকে অ্যাথলিটস ফুট (পায়ের আঙুলের ফাঁকের ছত্রাকজনিত সংক্রমণ) ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।

আরও পড়ুন

জুতাতেও ছড়িয়ে পড়ে জীবাণু

মোজার জীবাণু জুতার ভেতরও বাসা বাঁধে। তাই প্রতিদিন একই জুতা পরা ভালো নয়। এক দিন পরার পর জুতা পুরোপুরি শুকানোর সময় দিলে জীবাণু ও দুর্গন্ধ কমে।

অপরিষ্কার মোজা থেকে অ্যাথলিটস ফুট (পায়ের আঙুলের ফাঁকের ছত্রাকজনিত সংক্রমণ) ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে
ছবি: পেক্সেলস

পা ও মোজা পরিষ্কার রাখবেন যেভাবে

পা পরিষ্কার রাখুন
দিনে অন্তত একবার (ঘাম বেশি হলে দুবার) পা ধুয়ে নিন। এতে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমে।

ঘাম কমান
পায়ের জন্য আলাদা অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে, যা ঘাম কমাতে সাহায্য করে।

সঠিক কাপড়ের মোজা কিনুন
ব্যাম্বু মোজা বাতাস চলাচল সহজ করে। রুপা বা জিংকযুক্ত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল মোজা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে। এই ধরনের মোজা কিছু ক্ষেত্রে একাধিকবার পরা গেলেও সাধারণ সুতি বা সিনথেটিক মোজার ক্ষেত্রে তা নিরাপদ নয়।

মোজা ধোয়ার নিয়ম

মোজা রোদে শুকানো সবচেয়ে ভালো, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি প্রাকৃতিকভাবে জীবাণু মারে
ছবি: পেক্সেলস
  • সাধারণ অবস্থায় ৩০–৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম পানিতে ধোয়া ঠিক আছে।

  • ভালোভাবে জীবাণু মারতে চাইলে এনজাইমযুক্ত ডিটারজেন্ট দিয়ে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধোয়া ভালো।

  • গরম পানিতে ধোয়া সম্ভব না হলে ধোয়ার পর গরম স্টিম আয়রন করলে জীবাণু ও ছত্রাক নষ্ট হয়।

  • রোদে শুকানো সবচেয়ে ভালো, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি প্রাকৃতিকভাবে জীবাণু মারে।

শেষ কথা

মোজা আমরা অনেক সময় অবহেলায় আবার পরে ফেলি। কিন্তু জীবাণুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে, প্রতিদিন পরিষ্কার মোজা পরাই সবচেয়ে নিরাপদ অভ্যাস। এতে পা থাকে সতেজ, দুর্গন্ধ কমে, আর সংক্রমণের ঝুঁকিও অনেকটাই এড়ানো যায়। জীবনযাপনের ছোট অভ্যাসই কিন্তু বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।

সূত্র: দ্য কনভারসেশন

আরও পড়ুন