গরমে কেবল পানিই কি যথেষ্ট, বেশি প্রোটিন খেলে কি লাভ আছে?
প্রচণ্ড গরমের সময় অনেকেরই ক্ষুধা কমে যায়, ভারী খাবার খেতে ইচ্ছা করে না। আবার অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে বেরিয়ে যায় প্রচুর পানি ও খনিজ লবণ। এ সময় কেউ কেউ বেশি পানি খাওয়ার ওপর জোর দেন। আবার অনেকেই মনে করেন, গরমে শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়, তাই এই সময় বেশি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া ভালো। প্রচণ্ড গরমে কী খাবেন, কতটা পানি পান খাবেন, চা-কফি খাওয়া যাবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জেনে নিন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে।
১. শুধু পানি নয়, পানিসমৃদ্ধ খাবারও খান
অতিরিক্ত গরমে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পানি বেরিয়ে যায়। তাই শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করা জরুরি, নইলে পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন) দেখা দিতে পারে। সাধারণভাবে দিনে ৬ থেকে ৮ গ্লাস পানি খাওয়ার পরামর্শ দেয় যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)।
তবে অতিরিক্ত গরমে শরীরের পানির চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। তবে ঠিক কতটা পানি প্রয়োজন, তার নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞানী ড. শার্লট মিলসের ভাষায়, একজন ব্যক্তি বয়স, শারীরিক গঠন, দৈনন্দিন কাজের ধরন ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর পানির চাহিদা নির্ভর করে।
তবে শরীর আর্দ্র রাখতে শুধু পানি খাওয়াই যথেষ্ট নয়। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. আইসলিং ডেলি বলেন, ‘পানির পাশাপাশি পানিসমৃদ্ধ খাবারও খেতে হবে।’
তাই এ সময় ফল ও সবজি খেতে পারেন। কারণ, অধিকাংশ ফল ও সবজিরই ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পানি।
যেসব ফল ও সবজিতে ৯০ শতাংশের বেশি পানি আছে, তার মধ্যে আছে শসা, টমেটো, লেটুস, সেলারি, তরমুজ ও স্ট্রবেরি। আর আপেল, গাজর, নাশপাতি, কমলা, আঙুর ও আনারসে পানির পরিমাণ ৮০ থেকে ৮৯ শতাংশ। সেদ্ধ ডিমেও কিন্তু ৭৫ শতাংশ পানি থাকে।
শরীরে পর্যাপ্ত পানি আছে কি না, তা বোঝার সহজ একটি উপায় হলো প্রস্রাবের রং লক্ষ করা। প্রস্রাবের রং যদি হালকা হলুদ হয়, তবে সাধারণত শরীরে পানির পরিমাণ স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু গাঢ় হলুদ, কমলা বা বাদামি রং হলে তা পানিশূন্যতার লক্ষণ হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য তরল খাওয়া উচিত।
২. গরমে চা-কফি কি এড়িয়ে চলবেন?
প্রচণ্ড গরমেও অনেকের দিন শুরু হয় এক কাপ চা বা কফি দিয়ে। বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে এরও ব্যাখ্যা আছে। পুষ্টিবিদ ড. আইসলিং ডেলির মতে, ‘গরম বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানীয়ও শরীর ঠান্ডা রাখতে ঠান্ডা পানির মতোই কার্যকর হতে পারে।’
গবেষণায় দেখা গেছে, গরম পানীয় খেলে শরীর দ্রুত ঘামতে শুরু করে। সেই ঘামের মাধ্যমে অতিরিক্ত তাপ শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে ঠান্ডা পানি খেলে ঘাম কিছুটা ধীরে হয়। কারণ, শরীর সব সময় নিজের স্বাভাবিক তাপমাত্রা (৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করে। তবে এর অর্থ এই নয় যে গরম চা শরীরকে দ্রুত ঠান্ডা করে দেয়। শরীরকে পর্যাপ্ত পানি ও তরল দিয়ে আর্দ্র রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই শুধু গরমের কারণে কফি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে অতিরিক্ত ক্যাফেইন প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে শরীরে পানিশূন্যতা সৃষ্টি করতে পারে।
ড. ডেলির মতে, দিনে এক-দুই কাপ কফি বা চা খেলে সাধারণত পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে না। তবে অতিরিক্ত কফি বা চা না খাওয়াই ভালো। প্রচণ্ড গরমে খাবারের রুটিনেও কিছুটা পরিবর্তন আনলে স্বস্তি মিলতে পারে। দুপুরে ভারী খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। এ সময় হালকা খাবার, ফল বা শরবত খাওয়া যেতে পারে।
৩. অতিরিক্ত প্রোটিনের দরকার নেই
অনেকেই মনে করেন, প্রচণ্ড গরমে বেশি প্রোটিন খেলে শরীরে শক্তি বাড়ে। তবে পুষ্টিবিদেরা বলছেন, প্রচণ্ড গরমে শরীরের অতিরিক্ত প্রোটিনের প্রয়োজন হয় না।
পুষ্টিবিদ ড. আইসলিং ডেলির ভাষায়, ‘প্রচণ্ড গরমের সময় শরীরের অতিরিক্ত প্রোটিনের প্রয়োজন হয় না।’
বরং প্রোটিনকে হজম করতে শরীরকে তুলনামূলক বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয়। এতে শরীরে উল্টো বেশি তাপ উৎপন্ন হয়। তাই প্রচণ্ড গরমে অতিরিক্ত গরু বা খাসির মাংস খাওয়ার বদলে তুলনামূলক হালকা ও সহজপাচ্য প্রোটিন বেছে নেওয়াই ভালো।
প্রোটিনের উৎস হিসেবে খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন ডাল, ছোলা, ডিম, টক দই, টোফু, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, সেদ্ধ বা গ্রিল করা মাছ ও মুরগির মাংস। চাইলে এতে সামান্য পিনাট বাটারও যোগ করা যায়। এতে খাবারে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ে। মাছ খেতে চাইলে গরমের সময় রুই, কাতলা বা দেশি ছোট মাছের মতো তুলনামূলক হালকা ও সহজপাচ্য মাছ বেছে নেওয়াই ভালো।
মনে রাখুন
গরমে সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র হলো পর্যাপ্ত পানি খাওয়া, পানিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া এবং সহজপাচ্য সুষম খাদ্য বেছে নেওয়া। অতিরিক্ত প্রোটিনের চেয়ে শরীর আর্দ্র রাখা এবং হালকা খাবার খাওয়াই এ সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বিবিসি