জেনে নিন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু টিকার নাম

রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে টিকা। আমাদের ধারণা, টিকা বুঝি শুধুই শিশুদেরই লাগে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও টিকার প্রয়োজন আছে।

রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে টিকাছবি: সুমন ইউসুফ

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমতে থাকে। সেই সঙ্গে দেখা দেয় ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ, কিডনির সমস্যা, ক্যানসার ইত্যাদি। এসব রোগের কারণে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা আরও কমে যায়।

অনেকে বিভিন্ন সমস্যার জন্য নানা ধরনের ওষুধ (যেমন স্টেরয়েড, ইমিউনোথেরাপি, কেমোথেরাপি) সেবন করেন, যা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

এ ছাড়া প্রাপ্তবয়স্করা চাকরি, ব্যবসা, ভ্রমণ, অভ্যাস, জীবনযাত্রা ইত্যাদির কারণে নতুন নতুন রোগের ঝুঁকিতে থাকেন।

কেউ আবার দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যাকেন্দ্রে বা নার্সিং হোমে বসবাস করেন। কাউকে দূরদেশে ভ্রমণ করতে হয়। এসব জায়গায় অপরিচিত জীবাণুর বাস। এসব কারণে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরাও সহজেই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন, নানান জটিলতায় ভুগতে পারেন, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তাই বড়দেরও কিছু টিকা নিতে হয়। এসব টিকা যে শুধু নিজের সুরক্ষা দেয় তা নয়, টিকা গ্রহণের মাধ্যমে সংক্রামক রোগ বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করে অন্যদেরও সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু টিকার কথা জেনে রাখুন।

ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা

ফ্লু ভাইরাস সময়ের সঙ্গে ধরন বদলায়, তাই এই টিকা প্রতিবছর একবার নিতে হয়
ছবি: আনস্প্ল্যাশ

ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু থেকে বাঁচার জন্য যে টিকা, সেটিই ফ্লু ভ্যাকসিন বা ফ্লু টিকা। আমাদের দেশের আবহাওয়ার কারণে সারা বছরই ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের প্রকোপ দেখা যায়। বিশেষ করে কোভিড মহামারির পর ফ্লু ভাইরাসের গুরুত্ব বেড়েছে। ফ্লু থেকে শুধু যে সর্দি–জ্বর হয় তা নয়, এ থেকে প্রাণঘাতী নিউমোনিয়াসহ অন্য অনেক জটিলতা হতে পারে।

ফ্লু ভাইরাস সময়ের সঙ্গে ধরন বদলায়। তাই এই টিকা প্রতিবছর একবার নিতে হয়। সাধারণত ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী, যাঁদের বয়স ৬৫ বা এর বেশি, যাঁদের দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগ আছে, বিশেষ করে যাঁরা শ্বাসযন্ত্রের রোগ বা শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমায় এমন ওষধ সেবন করেন কিংবা যাঁরা পেশাগত কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছেন, এ রকম প্রত্যেকেরই বছরে একবার ফ্লু টিকা নেওয়া দরকার।

এই টিকা নিলে ফ্লু ভাইরাসের সংক্রমণের হার কমে। টিকা নেওয়া সত্ত্বেও ফ্লু হতে পারে, তবে এর তীব্রতা বা জটিলতা কম হয়। টিকা নেওয়ার মাধ্যমে ফ্লু ভাইরাসের বিস্তারও কমানো যায়। ফ্লু টিকা নিলে শরীরে তেমন কোনো সমস্যা সাধারণত হয় না, হালকা জ্বর জ্বর ভাব, গায়ে ব্যথা, টিকার স্থানে ব্যথা, ক্লান্তি—এসব হতে পারে।

নিউমোনিয়ার টিকা

এই টিকা স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনি নামের ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে। এই ব্যাকটেরিয়া ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটিয়ে যেমন নিউমোনিয়া বাধাতে পারে, তেমনি ঘটাতে পারে মেনিনজাইটিস নামে মস্তিষ্কের পর্দার প্রদাহ।

তবে এই টিকা ফ্লু টিকার মতো প্রতিবছর দিতে হয় না। টিকার প্রকারভেদ অনুযায়ী এবং চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে এটি শুধু একটি ডোজ কিংবা প্রতি পাঁচ বছরে একটি ডোজ নেওয়ার দরকার পড়ে।

নিউমোনিয়া রোগ হিসেবে বেশ মারাত্মক। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রাণঘাতীও হয়ে উঠতে পারে নিউমোনিয়া। আগে থেকেই যাঁদের হাঁপানি এবং অন্যান্য ফুসফুসের রোগ আছে, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ক্যানসার ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে, তাঁদের জন্য নিউমোনিয়া প্রতিরোধ খুব জরুরি।

তাই ৬৫ বছরের বেশি বয়সী এবং এই বয়সের নিচে যাঁরা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা যাঁদের কম, তাঁদের প্রত্যেকের নিউমোনিয়া টিকা নেওয়া উচিত।

শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো জনগোষ্ঠীতে সংক্রমণের হার কমাতে হলেও টিকা নেওয়া জরুরি
ছবি: পেক্সেলস

হেপাটাইটিসের টিকা

হেপাটাইটিস ভাইরাস কয়েক পদের হলেও টিকা দেওয়া হয় হেপাটাইটিস এ এবং বি–এর জন্য। এর মধ্যে হেপাটাইটিস এ ভাইরাস সাময়িক সংক্রমণ করলেও বি ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ করতে পারে। যা থেকে পরে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারও হতে পারে।

তাই হেপাটাইটিস বি টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হেপাটাইটিস বি–এর জন্য মোট তিনটি ডোজ টিকা দেওয়া হয় এবং এই তিনটি ডোজ টিকা গ্রহণের পর ৯৫ থেকে ১০০ শতাংশ মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধকারী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এটি শিশুদের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যেকোনো সময় এই টিকা নিতে পারেন। প্রথম ডোজের এক মাস পর দ্বিতীয় এবং ছয় মাস পর তৃতীয়টি নিতে হয়। পরে রক্তে অ্যান্টিবডির পরিমাণ দেখে এই টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

কারও কারও ক্ষেত্রে, বিশেষ করে দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষদের জন্য অতিরিক্ত ডোজের প্রয়োজন হতে পারে। এই টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। সামান্য জ্বর ভাব বা টিকার স্থানে ফোলা বা ব্যথা হতে পারে, তবে তা কয়েক দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায়।

হেপাটাইটিস এ–এর জন্য টিকার দুটি ডোজ প্রয়োজন হয়। যা মোটামুটি ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর।

এইচপিভির টিকা

এইচপিভি (হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস) টিকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ টিকা। যা জরায়ুমুখের ক্যানসার ও অন্যান্য প্রজননতন্ত্র–সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে কার্যকর। হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস নামে এক ভাইরাসের বিরুদ্ধে এই টিকা কাজ করে।

সাধারণত ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীদের জন্য দুটি ডোজে এই টিকা দেওয়া হয়। ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত চিকিৎসকের পরামর্শে এটি নেওয়া যায়।

তবে ১৫ বছরের পর সাধারণত তিনটি ডোজ দেওয়া হয়। এই টিকা ভরা পেটে দেওয়া উচিত। টিকাটি একবার নিলে ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে। এই টিকারও তেমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। হালকা জ্বর, শরীরব্যথা, ক্লান্তি বা টিকার স্থানে ফোলা বা ব্যথা ছাড়া অন্য সমস্যা সাধারণত হয় না।

টিটেনাসের টিকা

টিটেনাস রোগের জন্য টিকা সাধারণত ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে শৈশবেই দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে প্রতি ১০ বছরে একটি বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় এই টিটেনাস টিকা দেওয়া হয়। এতে হবু মা ও গর্ভস্থ শিশুর সুরক্ষা হয়। আবার কোনো আঘাত বা ক্ষত, কাটা ইত্যাদির জন্যও টিটেনাস টিকা দরকার হতে পারে।

আরও কিছু টিকা

এ ছাড়া কোভিডকালীন কোভিডের টিকা দেশের অধিকাংশ মানুষই নিয়েছেন। টিডিপি টিকা নামে টিকা আছে, যা টিটেনাস, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশির বিরুদ্ধে কাজ করে। এটি প্রতি ১০ বছর পর একটি করে বুস্টার ডোজ নিতে হয়।

এ ছাড়া আছে হারপিস জোস্টারের টিকা। ডেঙ্গু ভাইরাসের টিকাও কোনো কোনো দেশে দেওয়া শুরু হয়েছে। আছে টাইফয়েডের টিকা, যা টাইফয়েড জ্বরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা প্রদান করে।

 টিকা নিয়ে মানুষের মনে নানা ধরনের সংশয়, সন্দেহ বা দ্বিধা কাজ করে। টিকার বিরুদ্ধাচরণ করেন কেউ কেউ। কিন্তু শরীরে সংক্রমণ রুখতে হলে, রোগ বা রোগের জটিলতা কমাতে হলে টিকার বিকল্প নেই।

শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো জনগোষ্ঠীতে সংক্রমণের হার কমাতে হলেও টিকা নেওয়া জরুরি। তাই সব সংশয় মুছে ফেলে আপনার প্রয়োজনীয় টিকাগুলো গ্রহণ করুন, সুস্থ থাকুন।

*লেখাটি ‘বর্ণিল ভালো থাকুন ২০২৬’–থেকে নেওয়া।

আরও পড়ুন