ছুটির দিনে বাড়তি ঘুমিয়ে শরীরের ক্ষতি করছেন না তো?
অফিস বা কাজের ব্যস্ততা মধ্যেও সপ্তাহভরই আমরা সাপ্তাহিক ছুটির দিনটার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি। ভাবি, সারা সপ্তাহের না হওয়া ঘুমটা ওই দুই দিন পুষিয়ে নেব। সপ্তাহের কাজের দিনগুলোয় ভোরে উঠে ছুটির দিনে বেলা করে ঘুমানোর কারণে দেহঘড়িতে যে বিপর্যয় ঘটে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সেটাই ‘সোশ্যাল জেট ল্যাগ’। আপনি কি জানেন, এটি আপনার শরীরের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সোশ্যাল জেট ল্যাগ আসলে কী?
আমাদের শরীরের ভেতরে একটি প্রাকৃতিক ঘড়ি থাকে, যাকে বলে সার্কাডিয়ান রিদম। এটি আমাদের ঘুম ও জাগরণের সময় নিয়ন্ত্রণ করে। যখন আমাদের সামাজিক জীবনের ব্যস্ততা (যেমন: অফিস, স্কুল বা আড্ডা) আমাদের শরীরের এই প্রাকৃতিক ঘড়ির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তখনই তৈরি হয় সোশ্যাল জেট ল্যাগ।
সহজ কথায়, আপনি যদি কাজের দিনগুলোয় রাত ১১টায় ঘুমান এবং ভোর ৬টায় ওঠেন, কিন্তু ছুটির দিনে রাত ২টায় ঘুমান এবং সকাল ১০টায় ওঠেন—তবে আপনার শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়িটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এটি অনেকটা ভিন্ন টাইম জোনের দেশে ভ্রমণের ফলে হওয়া ‘জেট ল্যাগ’-এর মতোই প্রভাব ফেলে, যদিও আপনি আপনার নিজের বিছানাতেই থাকছেন।
এটি কি পরিচিত সমস্যা?
এখনকার আধুনিক জীবনযাত্রা অনেকটা অস্থির। সারাক্ষণ কাজ আর কাজ। ঘুমানোর জন্য সময় কোথায়? আবার বিভিন্ন সাইজের লম্বা সময়ের স্ক্রিন টাইম আমাদের সার্কাডিয়ান রিদমকে ব্যাপকভাবে ছন্দপতন ঘটাচ্ছে। এ ছাড়া যে পেশাগুলোয় দিন ও রাতের শিফট হিসেবে কাজ করতে হয়, তাঁদের সোশ্যাল জেট ল্যাগ বেশি হয়।
কেন এটি বিপজ্জনক?
গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল জেট ল্যাগ কেবল ক্লান্তি তৈরি করে না, বরং শরীরের বিপাকপ্রক্রিয়ায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
হৃদ্রোগের ঝুঁকি: ঘুমের সময়ের এ অনিয়ম হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় প্রায় ১১ শতাংশ।
মানসিক স্বাস্থ্য: মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। অবসাদ ও কাজের প্রতি অনীহা তৈরি হয়।
ডায়াবেটিস ও স্থূলতা: শরীরের ঘড়ির ছন্দ নষ্ট হলে ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করে না, ফলে ওজন বেড়ে যাওয়া এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি হয়।
মনোযোগের অভাব: এটি মস্তিকের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে কাজে ভুল হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
মানসিক সমস্যা: সোশ্যাল জেট ল্যাগের ফলে ইমোশনালি ভালো থাকা কমে যায়। মুড সুইং, অস্থিরতা এমনকি ডিপ্রেশন বেশি দেখা দেয়।
লক্ষণগুলো কী কী?
১. পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও সকালে ঘুম থেকে উঠতে প্রচণ্ড কষ্ট লাগে।
২. সপ্তাহের শুরুতে (বিশেষ করে রোববার) প্রচণ্ড ক্লান্তি বোধ হয়।
৩. দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম পায়।
৪. রাতে সময়মতো ঘুম আসে না।
প্রতিরোধের উপায়
এ সমস্যা থেকে বাঁচতে জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তনই যথেষ্ট।
একই রুটিন মেনে চলা: ছুটির দিন হোক বা কাজের দিন, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। সময়ের পার্থক্য যেন এক ঘণ্টার বেশি না হয়।
সকালের আলো: ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা খুলে দিন বা বাইরে যান। মাত্র ১৫ মিনিটের প্রাকৃতিক আলো আমাদের শরীরের ঘড়িকে সময় বুঝতে সাহায্য করে।
গ্যাজেট থেকে দূরে থাকুন: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল বা ল্যাপটপের নীল আলো থেকে দূরে থাকুন।
দুপুরের ঘুম পরিহার: ছুটির দিনে দুপুরে লম্বা সময় না ঘুমিয়ে বরং ২০ মিনিটের একটা পাওয়ার ন্যাপ নিন। এতেই আপনার শরীর চাঙা হবে, আবার রাতেও তাড়াতাড়ি ঘুমাতে পারবেন।