ক্যানসারজয়ী সুফিয়া জামান ভালো আছেন
নাতনির দেখভাল করতে চাকরি ছেড়েছিলেন সুফিয়া জামান। তবে কদিন পরই অসুস্থ হয়ে পড়েন। ধরা পড়ে জরায়ুমুখের ক্যানসার। চিকিৎসা শেষে এখন তিনি সুস্থ। করছেন রান্নাবান্নাসহ সংসারের বহু কাজ। দুই বছর বয়সী ছোট নাতনির দেখাশোনাও করছেন ঠিকঠাক। ক্যানসারজয়ী সুফিয়া জামানের জীবনের গল্প পড়ুন আজ। লিখেছেন রাফিয়া আলম।
সুফিয়া জামানের বাড়ি শরীয়তপুর। সেখানেই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন তিনি। স্বামী-সন্তান নিয়ে ছিমছাম সংসার। ছোট মেয়ে পড়াশোনা করছেন। বড় মেয়ে ব্যাংকার। বিয়েও হয়ে গেছে। ছোট একটি সন্তানও রয়েছে, তবে মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে বিপাকে পড়লেন মেয়ে। অফিসে চলে গেলে সারা দিন ছোট শিশুটিকে দেখবে কে!
এগিয়ে এলেন সুফিয়া জামান। ৩২ বছরের চাকরি ছেড়ে ২০২৪ সালে চলে এলেন ঢাকায়, মেয়ের কাছে। ১০ মাস বয়সী নাতনির দেখভালের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। তবে ঢাকায় আসার কিছুদিন পরই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন সুফিয়া। জ্বরের সঙ্গে হালকা পেটব্যথা। চিকিৎসায় কাজ হচ্ছিল না। এক মাস পর জ্বর কমতে শুরু করে, তবে এর পর থেকে মাসিকের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়।
বয়স হওয়ায় ধরে নেওয়া হয়েছিল, এটা হয়তো মেনোপজের লক্ষণ। তবে তিন মাস পর সুফিয়ার মনে পড়ল, বছর পাঁচেক আগে একবার চিকিৎসক বলেছিলেন তাঁর জরায়ুতে টিউমারজাতীয় কিছু একটা আছে। কাজের ব্যস্ততায় পরে আর চিকিৎসকের কাছে যাওয়া হয়নি।
সেই কথা মনে পড়ায় আবার চিকিৎসকের কাছে গেলেন সুফিয়া। সব শুনে কিছু পরীক্ষা দিলেন চিকিৎসক। বায়োপসিও করানো হলো কিন্তু বায়োপসির রিপোর্ট থেকে নিশ্চিতভাবে রোগটি নির্ণয় করা গেল না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে আবারও নমুনা সংগ্রহ করা হলো।
এবার ধানমন্ডির আনোয়ারা মেডিকেল সার্ভিসেসে নমুনা পরীক্ষা করানো হলো।
জানতেন না, কী হয়েছে
বায়োপসি রিপোর্টে জরায়ুমুখের ক্যানসার ধরা পড়ল। স্বজনদের অনুরোধে সুফিয়াকে রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হলো না। কারণ, যেকোনো বিষয়েই অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করেন সুফিয়া। উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস অস্ত্রোপচার করলেন।
ক্যানসারের বাকি চিকিৎসার জন্য তাঁকে যেতে হলো স্কয়ার হাসপাতাল। ক্যানসার বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. সেলিম রেজা ও অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. ফারিয়াহ্ শারমিনের তত্ত্বাবধানে বাকি চিকিৎসা করেন সুফিয়া। একই সঙ্গে কেমোথেরাপি আর রেডিওথেরাপি চলল। মোট ৫টি কেমো আর ২৫টি রেডিওথেরাপি দেওয়া হলো।। আরও দেওয়া হলো তিনটি বিশেষ রেডিওথেরাপি (ব্র্যাকিথেরাপি)।
চিকিৎসা চলাকালে রক্তচাপের তারতম্য হতো। ছিল আরও কিছু জটিলতা। বলছিলেন, ‘খাওয়ার রুচি একেবারেই ছিল না, মুখের ভেতরটা যেন সেদ্ধ হয়ে গেছিল। কোনোমতে দু–তিন নলা ভাত খেতাম। ১৫তম রেডিওথেরাপি নিয়ে ফেরার সময় মাথা ঘুরাচ্ছিল। পরে পরীক্ষা করিয়ে জানতে পারলাম, লবণশূন্যতার কারণে এ রকম হয়েছে। পাঁচ থেকে সাত দিন পর আবার শুরু হলো ক্যানসারের চিকিৎসা।’
রক্তশূন্যতা দেখা দেওয়ায় কয়েক ব্যাগ রক্তও নিতে হয়েছিল চিকিৎসার সময়। রক্ত যাতে কমে না যায়, সে জন্য আলাদা ইনজেকশনও নিতে হয়েছিল, তবে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তাঁর চুল পড়েনি।
চিকিৎসা–পরবর্তী সময়ে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায়। সেটির জন্য জীবনধারায় কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
এখন কেমন আছেন
ক্যানসারের চিকিৎসা শেষে এখন ভালো আছেন সুফিয়া জামান। নিয়ম করে ফলোআপ করছেন চিকিৎসকদের কাছে।
মাত্র সপ্তাহ তিনেক আগে জানতে পেরেছেন, তাঁর এই লড়াই ছিল ক্যানসারের বিরুদ্ধে। প্রতিপক্ষকে না চিনেই জয়ী হয়েছেন সুফিয়া। ‘এত বড় রোগ থেকে সুস্থ হয়ে চলাফেরা করতে পারছি, এটাই সবচেয়ে বড় কথা। সাংসারিক কাজও করতে পারছি, নাতনির দেখাশোনাও করতে পারছি। আমার বড় মেয়েটা নিশ্চিন্তে চাকরি করতে পারছে। ছোট মেয়ের পড়ালেখাও চলছে। সবাইকে নিয়ে ভালো আছি’, স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই কথাগুলো বললেন ৫০ বছর বয়সী এই নারী।