রান্নার কোন পর্যায়ে লবণ ব্যবহার করলে আয়োডিনের অপচয় কম হয়

আয়োডিন মানবদেহের জন্য একটি অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদানছবি: পেক্সেলস

আয়োডিন মানবদেহের জন্য একটি অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদান। যদিও দেহের জন্য এর দৈনন্দিন চাহিদা অনেক কম, কিন্তু থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই হরমোন শরীরের বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া এবং মস্তিষ্কের বিকাশে অপরিহার্য। 

অতীতে বাংলাদেশে আয়োডিনের ঘাটতি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা ছিল। এর ফলে গলগণ্ড, বুদ্ধিমত্তার স্বাভাবিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা, বন্ধ্যত্ব, গর্ভকালীন জটিলতা ও নবজাতকের মানসিক-শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা গেছে। যদিও সর্বজনীন লবণ আয়োডিনকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে, তবু আয়োডিনের ঘাটতি এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।

বর্তমানে আয়োডিনের ঘাটতির অন্যতম কারণ আয়োডিনযুক্ত লবণের অনিয়মিত ব্যবহার ও মানগত সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে লবণে আয়োডিনের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকে। কখনো ভুলভাবে সংরক্ষণ ও রান্নার সময় আয়োডিন নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে খোলা বা অপরিশোধিত লবণ ব্যবহারের প্রবণতা এখনো রয়েছে। এ ছাড়া জনসচেতনতার অভাবে অনেকে আয়োডিনযুক্ত লবণের গুরুত্ব বুঝতে পারেন না।

এই প্রেক্ষাপটে আয়োডিনের ঘাটতি প্রতিরোধে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, সর্বজনীন লবণ আয়োডিনকরণ কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। বাজারে বিক্রি হওয়া সব ভোজ্য লবণে নির্ধারিত মাত্রায় আয়োডিন রয়েছে কি না, তা নিয়মিত নজরদারি ও মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। ভেজাল বা কম আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদন ও বিপণনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন।

বর্তমানে আয়োডিনের ঘাটতির অন্যতম কারণ আয়োডিনযুক্ত লবণের অনিয়মিত ব্যবহার ও মানগত সমস্যা
ছবি: পেক্সেলস

দ্বিতীয়ত, জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে আয়োডিনের উপকারিতা ও আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রচার চালাতে হবে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু-কিশোরীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কারণ, এই গোষ্ঠীগুলো আয়োডিনের ঘাটতির ঝুঁকিতে বেশি থাকে।

তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেতরে আয়োডিনের ঘাটতি শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় থাইরয়েড রোগ ও আয়োডিনের ঘাটতি সম্পর্কিত স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। গর্ভকালীন সেবার অংশ হিসেবে আয়োডিন গ্রহণের গুরুত্ব সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন

এ ছাড়া আয়োডিনযুক্ত লবণের সঠিক সংরক্ষণ ও ব্যবহার সম্পর্কে জনগণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। লবণ খোলা পাত্রে না রেখে ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখা ও রান্নার শেষের দিকে লবণ ব্যবহার করলে আয়োডিনের অপচয় কম হয়।

সবশেষে বলা যায়, আয়োডিনের ঘাটতি প্রতিরোধযোগ্য একটি সমস্যা। সরকার, স্বাস্থ্য খাত, খাদ্যশিল্প এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে আয়োডিনের ঘাটতি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা সম্ভব। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা যাবে।

ডা. শাহজাদা সেলিম, সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

আরও পড়ুন